সুপ্রিম স্থগিতাদেশ
সম্পাদকীয়, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫, মঙ্গলবার
সংশোধিত ওয়াকফ আইনের কয়েকটি ধারায় স্থগিতাদেশ জারি করেছে সুপ্রিম কোর্ট। সোমবার ওয়াকফ মামলার শুনানিতে প্রধান বিচারপতি বি.আর গাভাইয়ের বেঞ্চ নতুন আইনের ৩-সি (৪) ধারার ওপর এই স্থগিতাদেশ দিয়েছেন। এই ধারায় জেলা শাসককে ক্ষমতা দেওয়া হয়েছিল ওয়াকফ সম্পত্তি নির্ধারণ করার জন্য। বলা ছিল, জেলা শাসককের ক্ষমতা থাকবে কোনটা ওয়াকফ সম্পত্তি এবং কোনটা নয়, তা নির্ধারণ করা। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, ওয়াকফ বিতর্ক মেটাতে পারবেন না জেলা শাসক। এই সমস্যা মেটাতে হবে ট্রাইবুন্যালে।
শীর্ষ আদালতের পর্যবেক্ষণে সরকারি আধিকারিকের হাতে এই ক্ষমতা তুলে দেওয়া ক্ষমতা বিকেন্দ্রীকরণ নীতির বিরোধী। ওয়াকফ বাই ইউজার বা ব্যবহারকারী দ্বারা ওয়াকফ আইনের নিরিখে ওয়াকফ সম্পত্তি হিসেবে পরিগণিত বিষয়গুলিতে অনেক রকম প্রশ্ন রয়েছে। আইনে এ ধরনের সম্পত্তিগুলিকে সরকারি দখলদারির মুখে ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ জানান আবেদন কারীরা। প্রধান বিচারপতি এদিন শুনানিতে বলেন, ‘আমরা দেখেছি পুরো আইনটিকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ ছিল ধারা ৩ (আর), ৩-সি এবং ১৪ ধারায়। যে ধারাগুলি চ্যালেঞ্জের অধীন রয়েছে, আমরা তার ওপর স্থগিতাদেশ দিয়েছি।’
অবশ্য ওয়াকফ মামলার শুনানি এখানেই শেষ নয়।কেন্দ্র সরকারের সংশোধিত আইনে বলা হয়েছিল ওয়াকফ তৈরি করার আগে ওই ব্যক্তিকে অন্তত পাঁচ বছর প্র্যাকটিসিং মুসলিম বা ইসলাম ধর্ম পালন করতে হবে। এই ধারার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেছে শীর্ষ আদালত। সুপ্রিম কোর্ট বলেছে, একজন ব্যক্তি ইসলাম ধর্ম পালনকারী কিনা, তা নির্ধারণের জন্য আইন তৈরি না হওয়া পর্যন্ত এই নিয়ম স্থগিত থাকবে।
উল্লেখ্য, সংশোধিত ওয়াকফ আইনে বলা হয়েছিল, কেন্দ্রীয় ওয়াকফ কাউন্সিল বা রাজ্য ওয়াকফ বোর্ডে অ-মুসলিম সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক। এই ধারায় কোন বদল না এনে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ওয়াকফ সংক্রান্ত সংস্থার মাথায় সংখ্যালঘু প্রতিনিধি রাখার চেষ্টা করতে হবে। এছাড়াও ওয়াকফ বিল পর্যালোচনায় জেপিসি তৈরি হলেও বিরোধীদের সংশোধনী তার রিপোর্টে স্থান পায়নি। একতরফা বিল পাশের কৌশলেরও প্রতিবাদ জানান বিরোধীরা।
গত ৫ আগস্ট সংশোধিত ওয়াকফ আইনে রাষ্ট্রপতির সম্মতির পর ৮ এপ্রিল নির্দেশিকা জারি করে কেন্দ্র সরকার। নতুন এই বিতর্কিত ওয়াকফ আইনের বিরোধিতায় দেশজুড়ে পথে নামেন মুসলিম, শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, জৈন প্রভৃতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষজন। স্বভাবতই এ রাজ্যেও প্রতিবাদ বিক্ষোভ মিছিল হলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী এক পর্যায়ে বলেন, দিল্লিতে গিয়ে এসব আন্দোলন করুন। রাজ্য সরকার ওয়াকফ আইন করেনি। এখানে আমরা ক্ষমতায় আছি, এরাজ্যে আমরা ওয়াকফ আইন লাগু হতে দেব না। তাঁর এহেন মন্তব্যে সংখ্যালঘু সমাজ ক্ষুব্ধ হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মোদী সরকারের ওয়াকফ সংশোধনী আইন দেশের ধর্মনিরপেক্ষতা ও সংবিধানের বিরোধী এবং অভিসন্ধিমূলক। আসলে এই আইনের বদৌলতে বকলমে ওয়াকফ বিষয়ক ক্ষমতা কেন্দ্র সরকার কুক্ষিগত করতে প্রয়াস চালাচ্ছে। সুপ্রিম কোর্ট এর ওপরে স্থগিতাদেশ দিয়েছে। সরকার সব জমি সম্পদ কেড়ে নিয়ে বেসরকারি হাতে দিয়ে মানিটাইজেশন করতে চাইছে। কেন্দ্র সরকার রেল, বিমানবন্দর চালাতে পারছে না। তাই সবকিছু জলের দরে বেসরকারি কোম্পানির হাতে তুলে দিচ্ছে। এভাবে যেগুলো সরকারের চালানোর কথা, সেগুলো বেসরকারি হাতে তুলে দিচ্ছে, আর ধর্মীয় বিষয় যেগুলি বেসরকারি পরিচালনায় থাকার কথা, সেগুলিকে সরকার চালাতে চাইছে? ওয়াকফ সম্পত্তি পরিচালনার বদলে সরকার শিক্ষা, স্বাস্থ্য পরিচালনায় নজর দিক। সংবিধান নাগরিকদের ধর্মবিশ্বাস অনুসারে যেগুলো পরিচালনার অধিকার দিয়েছে তাতে হস্তক্ষেপ চলবে না। কারণ, সব ধর্মের নিজস্ব প্রতিষ্ঠান পরিচালনার অধিকার দিয়েছে সংবিধান। সেই সাংবিধানিক অধিকার বিজেপি সরকার কেড়ে নিতে পারে না। আজকে মুসলিমদের ধর্মীয় অধিকার কেড়ে নেওয়ার কাজে সফল হলে কাল শিখ, বৌদ্ধ, জৈন, খ্রিস্টান ইত্যাদি অন্যান্য সংখ্যালঘুদের অধিকার হরণের চেষ্টা হবে। ———
ওয়াকফ বিল সংসদে পাশ হওয়ার সময়ে তৃণমূল কংগ্রেস নিজের দলের সব সাংসদকে বিলের বিরুদ্ধে ভোটদানের জন্য হাজির করায়নি। এমনকি ওয়াকফ সংশোধনী আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হিসেবে শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরোধিতা করে মমতা ব্যানার্জী কার্যত হুমকি দিয়ে দিল্লি গিয়ে আন্দোলন করার নিদান দিয়েছিলেন। আবার তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় আসার আগে রাজ্যে ১০ হাজার মাদ্রাসা করার এবং ওয়াকফ দুর্নীতি নির্মূলের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। গত ১৫ বছরে সে সব বিশ বাঁও জলে।








