২০২৬-এর ভোট সরকার বদলের লড়াই নয়, তৃতীয় শক্তির অস্তিত্বের পরীক্ষা
নিজাম পারভেজ:পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন কেবল একটি সরকার পরিবর্তনের লড়াই নয়; বরং এটি অস্তিত্ব রক্ষার এক চরম পরীক্ষা, বিশেষত বাম-কংগ্রেস এবং আইএসএফ-এর মতো ‘তৃতীয় শক্তি’র কাছে। গত এক দশকের বেশি সময় ধরে রাজ্যের রাজনীতি প্রধানত তৃণমূল বনাম বিজেপি-র দ্বিমেরু লড়াইয়ে পর্যবসিত হয়েছে। কিন্তু এই বাইনারি বা দ্বৈত লড়াই বাংলার দীর্ঘমেয়াদী গণতান্ত্রিক স্বার্থের জন্য কতটা ইতিবাচক, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সময় এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতির গাণিতিক এবং কৌশলগত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, একটি পরিকল্পিত ‘আসন সমঝোতা’ এবং ‘রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট’ ছাড়া এই তৃতীয় শক্তির পুনরুত্থান অসম্ভব।
২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের ফলাফলকে বিধানসভা ভিত্তিক ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যাবে, বাম-কংগ্রেস জোটের অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। সারা রাজ্যে ২৯৪টি বিধানসভা আসনের মধ্যে এই জোট মাত্র ১২টি আসনে এগিয়ে ছিল। মালদা দক্ষিণ লোকসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত কিছু এলাকা ছাড়া রাজ্যের অন্যত্র তাদের লিড প্রায় শূন্যের কাছাকাছি।
বিশেষত সিপিআইএম-এর ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, কলকাতা সংলগ্ন কিছু শিল্পাঞ্চল বা শহুরে এলাকা (যেমন- যাদবপুর বা দমদম সংলগ্ন কিছু পকেট) ছাড়া তাদের পুরনো দুর্গগুলো এখন ধূলিসাৎ। অন্যদিকে, কংগ্রেসের প্রভাব কেবল মালদা, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তর দিনাজপুরের নির্দিষ্ট কিছু ব্লকে সীমাবদ্ধ। এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে বার্তা দিচ্ছে যে, সারা রাজ্যের সব আসনে প্রার্থী দিয়ে শক্তিক্ষয় করার দিন শেষ। এখন সময় এসেছে Quality over Quantity বা সংখ্যার চেয়ে গুণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার। ২০২৬ নির্বাচনে যদি বাম-কংগ্রেস নেতৃত্ব সত্যিই বিধানসভায় প্রবেশের লক্ষ্য রাখে, তবে তাদের আবেগের ঊর্ধ্বে উঠে বাস্তবের জমিতে পা রাখতে হবে।
কংগ্রেসের ভূমিকা:
কংগ্রেসের উচিত মূলত ৭০টি আসনে নিজেদের সীমাবদ্ধ রাখা। এই ৭০টি আসনের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ বা প্রায় ৩০-৩৫টি আসন হওয়া উচিত মালদা এবং মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে। কারণ, এই জেলাগুলিতে কংগ্রেসের বুথ স্তরের সংগঠন এবং একনিষ্ঠ ভোটার আজও বর্তমান। এছাড়া উত্তরবঙ্গের চোপড়া বা ফাঁসিদেওয়ার মতো কিছু পকেট, যেখানে তাদের সাংগঠনিক শক্তি মজবুত, সেখানে পূর্ণ শক্তি নিয়োগ করা প্রয়োজন।
বামফ্রন্টের কৌশল:
সিপিআইএম তথা বামফ্রন্টকে বুঝতে হবে, তারা এখন আর রাজ্যের শাসক দল বা প্রধান বিরোধী দল নয়। তাই ২৯৪টি আসনে লড়াই করার মানসিকতা ত্যাগ করে ৫০টির কম আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা উচিত। এই ৫০টি আসন এমন হতে হবে, যেখানে বিগত নির্বাচনেও তাদের ভোটের হার সম্মানজনক ছিল। সমস্ত আর্থিক এবং সাংগঠনিক শক্তি যদি নির্দিষ্ট বাছাই করা গুটিকতক আসনে কেন্দ্রীভূত করা যায়, তবে অন্তত ৫ থেকে ১০টি আসনে জয়লাভ করা অসম্ভব নয়।
আইএসএফ ও দক্ষিণবঙ্গ সমীকরণ:
দক্ষিণ ও উত্তর ২৪ পরগনার সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে আইএসএফ একটি বড় শক্তি হিসেবে উঠে এসেছে। কংগ্রেস যদি আইএসএফ-এর সাথে সম্মানজনক আসন সমঝোতা বা জোট করতে পারে, তবে এই দুই জেলায় তারা শাসক দল তৃণমূলের প্রধান মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়াবে।
হুমায়ুন কবীর ফ্যাক্টর ও বিজেপি-র পরোক্ষ সুবিধা:
মুর্শিদাবাদের রাজনীতির এক আলোচিত নাম হুমায়ুন কবীর এবং তাঁর নবগঠিত ‘জনতা উন্নয়ন পার্টি’ (JUP)। বিশ্লেষকদের অনুমান, হুমায়ুন কবীরের লড়াই সরাসরি তৃণমূলের ভোটব্যাঙ্কে থাবা বসাবে। বিশেষত সংখ্যালঘু ভোট বিভাজিত হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা তৈরি হবে। কিন্তু এর একটি অন্ধকার দিকও আছে।
হুমায়ুন কবীর অতীতে যে ধরনের আক্রমণাত্মক বা বিতর্কিত ভাষা প্রয়োগ করেছেন, তা যদি আসন্ন নির্বাচনী প্রচারেও বজায় থাকে, তবে তা রাজ্যে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণকে আরও তীব্র করবে। এই ধরনের Chaos বা বিশৃঙ্খলা সরাসরি বিজেপি-র পালে হাওয়া দেবে। যখনই সংখ্যালঘু ভোট কোনো নির্দিষ্ট দলের দিকে সংহত হওয়ার বদলে বিচ্ছিন্ন হয় এবং উস্কানিমূলক রাজনীতির অবতারণা ঘটে, তখনই সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট এককাট্টা হয়ে বিজেপি-র দিকে ঝুঁকে পড়ে। ফলে হুমায়ুন কবীরের উত্থান আপাতদৃষ্টিতে তৃণমূলের ক্ষতি করলেও, তা প্রকারান্তরে বিজেপি-র আসন সংখ্যা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে।
কেন একটি শক্তিশালী বিরোধী দল প্রয়োজন?
যদি ২০২৬-এর নির্বাচনে বাম-কংগ্রেস-আইএসএফ জোট অন্তত ২০-২৫টি আসন নিশ্চিত করতে পারে, তবে তার সুদূরপ্রসারী প্রভাব পড়বে বাংলার আগামীর রাজনীতিতে।
১) তৃণমূলের ওপর চাপ: তৃণমূল যদি পুনরায় ক্ষমতায় ফেরে, বিধানসভায় একটি বলিষ্ঠ বিরোধী পক্ষ থাকলে তারা জনমুখী কাজ করতে এবং দুর্নীতি কমাতে বাধ্য হবে।
২) বিজেপি-র গতিরোধ: বিজেপি যখন রাজ্য দখলের জন্য সর্বশক্তি দিয়ে ঝাঁপাবে, তখন এই তৃতীয় শক্তির হাতে থাকা আসনগুলোই ম্যাজিক ফিগার ছোঁয়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াবে।
৩) ভবিষ্যৎ রণকৌশল: ২০২৬-এ যদি কিছু বিধায়ক জেতানো সম্ভব হয়, তবে সেই আত্মবিশ্বাস ২০২৮-এর পঞ্চায়েত এবং ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচনে কর্মীদের উজ্জীবিত করবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত ২০৩১-এর বিধানসভায় একটি পূর্ণাঙ্গ বিকল্প শক্তি হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, ২০২৬-এর লড়াই বাম-কংগ্রেসের জন্য সরকার গড়ার লড়াই নয়; বরং বিধানসভায় ‘তৃতীয় শক্তি’ হিসেবে অস্তিত্ব বজায় রাখার লড়াই। নেতৃত্বকে বুঝতে হবে, বিজেপি-কে রুখতে বা তৃণমূলকে জবাব দিতে গেলে নিজেদের মধ্যে ভোট কাটাকাটি বন্ধ করে নির্দিষ্ট পকেটে শক্তি প্রয়োগ করতে হবে। যদি সমস্ত বিরোধী নেতৃত্বের মধ্যে এই শুভবুদ্ধির উদয় হয় যে, তৃতীয় বা চতুর্থ স্থান নয়; বরং বিধানসভার অলিন্দে পৌঁছানোই মূল লক্ষ্য, তবেই বাংলার রাজনীতিতে এক নতুন ভোরের সূচনা হবে। অন্যথায়, অদূর ভবিষ্যতে বাংলার রাজনীতিতে আঞ্চলিক বা বিকল্প শক্তির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হবে।








