তিলোত্তমা উবাচ: অহেতুক একটি সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদী তকমা কেন?
ঝুমুর রায়
সম্প্রতি এবিপি আনন্দ টিভির “যুক্তি তক্কো” অনুষ্ঠানে সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর ও কুরুচিকর মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেন, মুসলিম সম্প্রদায় এমন একটি সন্ত্রাসবাদী সংগঠন গড়ে তুলেছে, যা সারা পৃথিবীতে মানুষ হত্যা করে। এই মন্তব্য কেবল বিভ্রান্তিকর নয়, বরং সমগ্র মুসলিম সম্প্রদায়কে অযৌক্তিকভাবে দোষারোপ করার অপচেষ্টা, যা সমাজে বিদ্বেষ এবং ধর্মীয় বিভাজন, মেরুকরণ তীব্র করে।
মন্তব্যের ভিত্তিহীনতা: তিলোত্তমা মজুমদারের বক্তব্য কোনো বাস্তব তথ্য বা পরিসংখ্যানের উপর ভিত্তি করে নয়। সারা বিশ্বে মুসলিম জনগোষ্ঠী বৈচিত্র্যময়; তারা চিকিৎসক, শিক্ষক, বিজ্ঞানী, শিল্পী, উদ্যোক্তা এবং সাধারণ নাগরিক হিসেবে শান্তিপ্রিয়ভাবে সমাজে অবদান রাখছে। একটি ছোট বিচ্ছিন্ন উগ্রপন্থী অংশের কর্মকাণ্ডকে সমগ্র সম্প্রদায়ের ওপর চাপানো সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক ও অযৌক্তিক। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও সন্ত্রাসবাদের প্রতিবেদনগুলি স্পষ্টভাবে দেখায় যে, সন্ত্রাসবাদ কোনো ধর্মের বৈশিষ্ট্য নয়।
সামাজিক প্রভাব: এই ধরনের মন্তব্য সাধারণ মানুষের কোমলমতি মনে ভুল ধারণা ও অপপ্রচার তথা বিদ্বেষ-বিষ সঞ্চার করে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের প্রতি নেতিবাচক ও বৈরি মনোভাব জন্মায়, যা সামাজিক সহনশীলতা, স্থিতিশীলতা ও সহাবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলে। মুসলিমদের নিরাপত্তা ও মানসিক শান্তি বিঘ্নিত হয় এবং সমাজে বিভাজন ও বৈষম্য বৃদ্ধি পায়।
গণমাধ্যম ও দায়িত্ব: গণমাধ্যমের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হল তথ্য যাচাই এবং সমতা বজায় রাখা। কোন সম্প্রদায়কে প্রমাণ ছাড়াই ভিত্তিহীনভাবে দোষারোপ বা অভিযোগ করে প্রচার করা অত্যন্ত ক্ষতিকর। আমাদের সমাজে সংবেদনশীল বা স্পর্শকাতর বিষয়ের ওপর বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, সমান দৃষ্টিভঙ্গি এবং ন্যায়সঙ্গত প্রতিবাদ অপরিহার্য।
প্রতিবাদ ও সচেতনতা: বিশেষ করে গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও চিন্তাবিদদের কাছে আহ্বান জানাই, যাতে এই ধরনের ভুলধারার মন্তব্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী প্রতিবাদ করা হয়। মুসলিম সম্প্রদায়ের অবদান, শান্তিপ্রিয় জীবনধারা ও সামাজিক ভূমিকা তুলে ধরে সমাজে সমতা, সহনশীলতা ও বাস্তব তথ্য প্রচার করা উচিত।
তিলোত্তমা মজুমদারের মন্তব্য স্পষ্টভাবে দেখায় যে, অসংবেদনশীল বক্তব্য সমাজে বিভাজন সৃষ্টির পাসওয়ার্ড। এটি শুধুমাত্র একটি সম্প্রদায়কে লক্ষ্য করে নয়, বরং সামাজিক সম্প্রীতি, সংহতি, সদভাবনা ও ন্যায়বিচারের জন্যও হুমকি। সমাজে শান্তি, সহনশীলতা ও বাস্তব তথ্য প্রতিষ্ঠা করতে এই ধরনের বিভ্রান্তিকর, কুরুচিকর ও অবমাননাকর মন্তব্যের বিরুদ্ধে সচেতন প্রতিবাদ করাটা অত্যন্ত জরুরি। নইলে সমাজ আরো কলুষিত হবে, আরো রসাতলে যাবে। বৈচিত্রের মধ্যে ঐক্যের আবহমান ছবিটা কলঙ্কিত হবে। রবীন্দ্র নজরুলের বাংলায় এসব হতে দেওয়া যাবে না। গর্জে উঠতে হবে শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষকে। নাহলে অনতিবিলম্বে সোনার বাংলা তার গরিমা ও অস্মিতা হারাবে। আমরা চাই, রূপসী বাংলা থাকুক বহুত্ববাদী স্বমহিমায়, স্বাতন্ত্রে, স্বকীয়তায়।








