কিন্তু নিজের বেলায়?
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পৃথিবীর সবকিছুই পরিবর্তনশীল। চিরস্থায়ী কিছু হয় না। সবকিছুই পরিবর্তনশীল। একমাত্র স্থায়ী হল পরিবর্তনশীলতা। সময়ের দাবি মেনে সব কিছুই বদলে যায়। তাই আমরা সবাই পরিবর্তন চাই, কিন্তু কেউ নিজেকে পরিবর্তন করতে চাই না। আমরা চাই আমাদের চারপাশের চেনা-জানা মানুষগুলো বদলে যাক, পরিবেশটা বদলে যাক, সমাজটা বদলে যাক, দেশটা বদলে যাক। কিন্তু নিজের বেলায় নট নড়ন চড়ন। যে তিমিরে ছিলাম, জগদ্দল পাথরের মতো সেখানেই আছি, আর এখানেই আজীবন থাকার ব্রত নিয়েছি। তিমির বদলাতে কেউ রাজি নই। চাই শুধু অন্যকে বদলাতে। কিন্তু নিজেকে নৈব নৈব চ। আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।
আমরা রাস্তায় নোংরা আবর্জনা ফেলি। আবার আমরাই বলি স্বচ্ছ ভারতের কথা। পাবলিক হিসেবে কাজ উদ্ধারের জন্য ঘুস দিই, চাকরিজীবী হলে আমরাই অম্লানবদনে ঘুস নিই। আবার আমরাই আক্ষেপ করে বলি, দেশটার আর কিছু হবে না। ঘুস আর দুর্নীতিতে ছেয়ে গেছে। ঘুস ছাড়া এক পা-ও চলা যায় না। ঘুস ছাড়া কোনো কাজ হয় না। অর্থাৎ আমরা সাপ হয়ে দংশাই, আবার ওঝা হয়ে ঝাড়ি। চোরকে বলি চুরি কর, আর গৃহস্থকে সাবধান হতে নিদান দিই।
বন্ধুগণ, পরিবর্তন বাইরে নয়, ভেতর থেকে শুরু হয়। প্রকৃত পরিবর্তন কখনো বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া যায় না। একটা সমাজ, একটা রাষ্ট্র, একটা সভ্যতা বদলে যায়, যখন পরিবর্তনটা সেই সমাজের মানুষদের ভিতর থেকে আসে। বাইরে থেকে লোকদেখানো নয়। মনীষীরা বলে গিয়েছেন, সবার আগে নিজেকে পরিবর্তন করো, দেখবে পৃথিবীটা বদলে যাবে। সবাই যদি আমার সঙ্গে খারাপ আচরণ করে, তাহলে বুঝতে হবে গলদটা আমার নিজের। এই সারকথা বোধগম্য হলে, প্রতিদিন নিজেকে একটু একটু করে বদলাতে সচেষ্ট হতে হবে। একদিনে হবে না, কিন্তু একদিন হবে।

আমরা সর্বদা অন্যের দোষ-ত্রুটি-খুঁত খুঁজে বেড়াই। ছিদ্রান্বেষণ আমাদের সহজাত প্রবৃত্তি। কিন্তু একবারও ভাবি না যে, আমারও অনেক দোষ-ত্রুটি আছে। ফুটো বালতিতে জল ঢাললে যেমন তা পূর্ণ হয় না, তেমনি নিজের ছিদ্র বন্ধ না করে কেবলই অন্যের ছিদ্র অনুসন্ধান করা বৃথা। তাই বলা হয়, চালুনি হয়ে সূঁচের বিচার করছে। কথাটা নেহাৎ অমূলক নয়। অন্যকে সহজে বিচার করি, কিন্তু নিজেকে নয়, আমরা সবাই আইনজীবী অথবা বিচারক হয়ে গেছি। আর সবাইকে আসামী বানিয়েছি। কিন্তু নিজেকে কখনো বিবেকের কাঠগড়ায় তুলে দেখিনি, আমার বিরুদ্ধে অন্যদের অভিযোগগুলো কেমন।
কথায় কথায় কেবলই সবার দোষ দেখতে পাই। কিন্তু নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে একবারও জিজ্ঞাসা করি না, আমি কতখানি সৎ, আমি কতটা নির্দোষ? কথায় কথায় বলি, আজকাল কেউ কারো ভাল দেখতে পারে না, কেউ কারো উপকার করে না, সাহায্য করে না। কিন্তু আমি নিজে কি এগুলো করি? বরং সুযোগ পেলে অন্যকে ঠকাই, কু-যুক্তি দিই। তাহলে অন্যজন কেন আমার উপকার বা সাহায্য করবে? আমাদের নীতি হল সুবিধাবাদী। শুধু নিজের সুবিধা দেখি, অন্যের অসুবিধা আমাদেরকে ভাবায় না। উঠতে বসতে আমরা কেবল অন্যের গীবত করি, পরের সমালোচনা করি। কিন্তু আত্মসমালোচনা করি না। আলোচনায় আলো থাকে না, থাকে কেবলই চোনা। পরনিন্দা-পরচর্চা হয়ে ওঠে মৃতপ্রায় মানুষের কাছে মৃত সঞ্জিবনী সুধা। অন্যকে কেবল পরিশুদ্ধ করতে চাই। কিন্তু আত্মশুদ্ধির কথা ভুলেও ভাবি না।

আমরা কাউকে বিশ্বাস করি না। নিজের ছায়াকেও না। তাহলে অন্যেরা কেন আমাকে বিশ্বাস করবে। অন্যের দিকে অভিযোগের আঙুল তুললে নিজের দিকে তিনটে আঙুল থাকে। এটা আমরা ভুলে যাই। যদিও ভুলে যাওয়াও অনেক ক্ষেত্রে উপকারী। জন্ম থেকে সবকিছু মনে থাকলে তো বালিশে মাথা ধরবে না। ইনপুট এবং আউটপুটের মধ্যে সাযুজ্য বা সামঞ্জস্য থাকা উচিত।
সবকিছু বদলাতে গেলে অকারণ মিথ্যা কথা, অসততা, অসাধুতা, হিংসা, অহংকার, দম্ভ, ঔদ্ধত্য, প্রতারণা ইত্যাদি থেকে নিজেকে মুক্ত করতে হবে। প্র্যাকটিস মেকস আ ম্যান পারফেক্ট। প্রকৃত ও পূর্ণাঙ্গ মানুষ হতে হলে সবক্ষেত্রে ইতিবাচক অনুশীলন করতে হবে। পরিবর্তনের অভিমুখ বদলাতে হবে। তাহলে দুধ আর পানি আপনা হতেই আলাদা হয়ে যাবে। হাজার বছরের পরিত্যক্ত গুহার অন্ধকার দূর করতে লাঠিসোঁটা নিয়ের ছোটাছুটি করতে হবে না; একটা দেশলাই কাঠিই যথেষ্ট। শেষ কথা হল, আসলে আমরা সবাই পাপী, আপন পাপের বাটখারা দিয়ে অন্যের পাপ মাপি!








