প্রসঙ্গ ওয়াকফ
ওয়াকফ মানে কেবল মসজিদ, মাদ্রাসা, খানকাহ, এতিমখানা, কবরস্থান নয়; ওয়াকফ সম্পত্তি থেকে সারা দেশে অসংখ্য স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা ইত্যাদি বহুমুখী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য কেন্দ্র, ক্লিনিক, হাসপাতাল ইত্যাদি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়। সেসব থেকে শুধু মুসলিমরাই নন, বহু সংখ্যক অমুসলিম নাগরিকও বিভিন্নভাবে উপকৃত হন। জাতির মেরুদণ্ড শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো প্রধান দুটো মৌলিক প্রয়োজনীয় পরিষেবা পেয়ে থাকেন জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে সব সম্প্রদায়ের মানুষ।
দ্বিতীয় কথা হল, কেবলমাত্র মুসলিমদের ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়েই কেন কেন্দ্র সরকার এর এত মাথাব্যথা? শিখ, পাঞ্জাবি, খ্রিষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, পারসিদের ধর্মীয় সম্পত্তি নিয়ে কেন মোদি সরকার উদাসীন? এদের ধর্মীয় সম্পত্তি পরিচালনায় কেন মুসলিম বা ভিন্ন ধর্মীদেরকে রাখার বন্দোবস্ত করা হয়নি? কারণ, মোদি সরকার শুরু থেকেই কেবলমাত্র মুসলিম বিদ্বেষী এজেন্ডা নিয়ে চলেছে। এটাই তাদের এবং আরএসএস এর পুঁজি।
যদি ওয়াকফ এর নামে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ভুল পথে পরিচালিত হয় বা দুর্নীতি হয়ে থাকে, তাহলে বলতে হয় চিন আমাদের দেশের অন্তত ৪০০০ বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে নিয়েছে। কই সেখানে মোদি শাহ জুটি কী করছে?
দুর্নীতি তো সব রাজ্যে, সব রাজনৈতিক দল এবং নেতা মন্ত্রী, আমলা করেই থাকে। রাজ্য থেকে কেন্দ্র সবাই না হলেও অধিকাংশই দুর্নীতিতে আকন্ঠ নিমজ্জিত। কোভিড কালে পিএম কেয়ার্স ফান্ড থেকে শুরু করে রাফাল কেলেঙ্কারি, ব্যাপম কেলেঙ্কারি, নিট কেলেঙ্কারি, ইলেক্টোরাল বন্ড সর্ব ক্ষেত্রেই তো দুর্নীতিতে বিজেপি সবার থেকে এগিয়ে আছে। তাহলে তো সব রাজ্য এবং কেন্দ্র সরকার ও বিজেপি সহ সব রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করা উচিত।
বলা হয়, দেশে ওয়াকফ সম্পত্তি পরিমাণ নাকি রেল এবং প্রতিরক্ষা মন্ত্রকের পরেই। অমুসলিমদের উস্কানি দিতে এটা বিজেপির আইটি সেল এর হিন্দুত্ববাদী ন্যারেটিভ। তারা প্রচার করে দেশে ওয়াকফ সম্পত্তি পরিমাণ ৯.৪ লক্ষ একর। তর্কের খাতিরে এই বানোয়াট তথ্য মেনে নিলেও বলতে হয়, শুধুমাত্র তামিলনাড়ু, অন্ধ্র প্রদেশ এবং তেলেঙ্গানার হিন্দু দেবোত্তর সম্পত্তির পরিমাণ ১০ লক্ষ একরেরও বেশি। এ তো হিমশৈলের চূড়া মাত্র। কেরল, কর্ণাটক থেকে গোবলয় তথা আসমুদ্র হিমাচল বাদ।
মনে রাখতে হবে, ওয়াকফ সংশোধনী বিল শুধু মুসলমানদের জন্যই নয়; শিখ, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ এমনকি দলিত, আদিবাসীদের জন্যও বিপজ্জনক। একে রুখতে না পারলে সব সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্বের প্রশ্ন দেখা দেবে। এই বিল মূলত ওয়াকফ সম্পত্তি কুক্ষিগত করার দূরভিসন্ধি। করতে পাঁয়তারা করছে বিজেপি। ওয়াকফ সম্পত্তি মুসলিমদের হাতছাড়া হলে বা কেন্দ্র সরকার এর পরিচালনায় নাক গলালে মসজিদ, মাদ্রাসা, ঈদগাহ, গোরস্থান সবই বে-দখল হয়ে যাবে। এমনকি ইন্তেকাল হলে দাফনের জন্য কবরস্থানও অবশিষ্ট থাকবে না। তাই তো মুসলিমদের কফিনে শেষ পেরেক পুঁততে সবকা সাথ সবকা বিকাশ এর প্রবক্তা, নন-বায়োলজিক্যাল প্রধানমন্ত্রী আদা-পানি খেয়ে লেগেছেন।
ওয়াকফ এমন একটি বিষয়, যা মুসলমানদের ঈমান-অক্কীদার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাই টার্গেট হল, ওয়াকফ সম্পত্তি কেড়ে নিয়ে মুসলিম সম্প্রদায়ের স্বতন্ত্র আইডেন্টিটি খতম করা। তাই এই বিল সংবিধান প্রদত্ত মৌলিক অধিকারের পরিপন্থী। সংবিধান ধর্ম পালন, ধর্মীয় সম্পত্তির রক্ষণাবেক্ষণ ও নিজ নিজ প্রতিষ্ঠান পরিচালনার নিশ্চয়তা দিয়েছে। এই বিল সংখ্যালঘুর অধিকার বিরোধী, যার গ্যারান্টি সংবিধান দিয়েছে। অন্য কোন ধর্মীয় গোষ্ঠীর দান করা সম্পত্তিতে হস্তক্ষেপ করা হচ্ছে না; অথচ মুসলমানদের ক্ষেত্রে এহেন কুকর্মে উদ্যত কেন্দ্রীয় সরকার। সব বিরোধী দল এই বিলের বিরোধিতা করলেও কেন্দ্র সরকার তাতে কর্ণপাত করছে না।








