অবশেষে মণিপুর গচ্ছামি
নতুন পয়গাম, ১৪ সেপ্টেম্বর, রবিবার:
অবশেষে প্রায় আড়াই বছর পর জাতিদাঙ্গা কবলিত মণিপুরে পদার্পণ করলেন প্রধানমন্ত্রী। উত্তর-পূর্বের ‘মুকুট’ বলে পরিচিত মণিপুরে শেষবার ২০২২ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি গিয়েছিলেন তিনি। তার সাড়ে তিন বছর পর শনিবার দ্বিতীয়বার মণিপুর গেলেন প্রধানমন্ত্রী। আড়াই বছরে মণিপুরের রক্তক্ষয়ী জাতিদাঙ্গায় অন্তত ৩০০ মানুষের প্রাণহানি হয়েছে বলে অভিযোগ। গত ২৮ মাসে প্রধানমন্ত্রী ৪৬টা দেশ সফর করেছেন। কিন্তু মণিপুরে যাওয়ার সময় পাননি। যদিও বা প্রায় আড়াই বছর পর শনিবার ঝটিকা সফরে গেলেন, থাকলেন মেরেকেটে আড়াই-তিন ঘণ্টা।
সাড়ে তিন বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেষবার মণিপুর গিয়েছিলেন বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারে। সেই নির্বাচনে জিতে বিজেপি মণিপুরে ক্ষমতায় আসার এক বছরের মাথায় জাতিদাঙ্গায় অশান্ত হয়ে উঠে পর্বতবেষ্ঠিত এই রাজ্য। ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে শুরু হওয়া রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা আজও থামাতে পারেনি ডাবল ইঞ্জিন সরকার। ইতিমধ্যে ড্যামেজ কন্ট্রোলে মুখ্যমন্ত্রী এন বীরেণ সিংকে সরিয়ে রাষ্ট্রপতি শাসন জারি হয়েছে মণিপুরে। এদিকে শনিবার যে তিনি মণিপুর যাচ্ছেন, তাও শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত গোপন রাখা হয়েছিল। আগের দিন শুক্রবার সরকারিভাবে এই সংবাদ জানিয়ে রাজ্যের মুখ্যসচিব পুনিত কুমার গোয়েল বলেন, ঘণ্টা তিনেক থেকে দুটো সভা করবেন এবং কয়েকটি সরকারি প্রকল্পের ঘোষণা ও শিলান্যাস করে দিল্লি ফিরে যাবেন প্রধানমন্ত্রী।
এদিন বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সংগঠন প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান বয়কটের ডাক দেয়। চুড়াচাঁদপুরে মোদীর সভায় খোদ বিজেপির মেইতেই বিধায়করা উপস্থিত থাকবেন না বলে হুমকি দেন। কুকি সম্প্রদায়ের বিজেপি বিধায়করা মোদীর মঞ্চে থাকবেন কিনা, তাও অনিশ্চিত ছিল। শেষমেষ কয়েকজনকে এনে মুখ রক্ষা করা হয়েছে। উল্লেখ্য, বিজেপির সাত জন কুকি বিধায়ক ছিলেন। তার মধ্যে দু’জন মন্ত্রী। গত আড়াই বছর ধরে তাঁরা রাজধানী ইম্ফলে যাননি বা বিধানসভা অধিবেশনেও যোগ দেননি। মন্ত্রীসভার বৈঠকেও তারা উপস্থিত হতেন না।
কংগ্রেসের অভিযোগ, বিজেপির বিভাজনের রাজনীতির কারণেই মণিপুর অগ্নিগর্ভ। আড়াই বছর ধরে হিংসার আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে উত্তর-পূর্বের এই ছোট্ট রাজ্য। আড়াই বছর পর প্রধানমন্ত্রী মাত্র আড়াই ঘণ্টার জন্য মণিপুর এলেন। স্রেফ বক্তৃতা শুনিয়ে চলে গেলেন। দেশের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, আড়াই বছর পর মণিপুরের কথা মনে পড়েছে মোদীজির। মণিপুরবাসীর কাছে এটাই আপাতত অনেক বড় প্রাপ্তি।
মণিপুরে ২০২৩ সালের ৩ মে থেকে শুরু হয় রক্তক্ষয়ী দাঙ্গা। তারপর দেখতে দেখতে দীর্ঘ প্রায় ২৮ মাস হয়ে গিয়েছে। কুকি বনাম মেইতেই জনগোষ্ঠীর মধ্যে চলা জাতিদাঙ্গা আজো পুরোপুরি থামেনি। ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, হিংসা, প্রাণহানিতে মণিপুরে এখনও ছাইচাপা আগুন ধিকিধিকি জ্বলেছে।
নারী নির্যাতন থেকে শুরু করে ধর্ষণ করে প্রকাশ্য রাস্তায় নগ্ন করে ধর্ষিতা মহিলাদের ঘোরানো হয়েছে। এসব দেখে শিউরে উঠেছে গোটা দেশ তথা বিশ্ব। এমতাবস্থায় অবশেষে শনিবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি মণিপুর গিয়ে দাবি করলেন, ‘অশান্তির আগুন আমরাই নিভিয়েছি। মণিপুরে আমরাই শান্তি ফিরিয়েছি। উত্তর-পূর্ব ভারতের মাথার উজ্জ্বল মণি হবে মণিপুর।’ যদিও নৃশংসতা ও রক্তক্ষয়ী জাতিদাঙ্গা কিংবা এত মানুষের প্রাণহানি নিয়ে দুঃখ প্রকাশের মতো কিছু শোনা যায়নি তাঁর মুখে।
সহিংসতার মূল কেন্দ্র চূড়াচাঁদপুরের সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘অতীতে উত্তর-পূর্ব ভারত ছিল অশান্ত এবং হিংসায় পরিপূর্ণ। গত ১১ বছরে আমরা মণিপুরের সব রকমের সংঘাত ও সমস্যা দূর করে শান্তি ফিরিয়ে এনেছি। আমরা মণিপুরকে শান্তি ও সমৃদ্ধির প্রতীকে পরিণত করেছি। মণিপুরের উন্নয়নে আমরা যা করেছি, স্বাধীনতার পর থেকে আর কোনও সরকার করেনি।’ প্রতিশ্রুতি দেন, গৃহহীনদের জন্য ৭ হাজার পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দিচ্ছি। ৫০০ কোটি টাকা এজন্য বরাদ্দ করেছে তাঁর সরকার। এছাড়াও দেওয়া হবে স্পেশাল ৩ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ। কিন্তু এতদিনেও এসব কেন করা হয়নি? আজ কেন গালভরা ঘোষণা করা হচ্ছে? কবে এসব বাস্তবায়িত হবে, তা কেউ জানে না।
মণিপুরে মোদির সংক্ষিপ্ত সফরকে ‘বিলম্বিত প্রহসন’ বলে কটাক্ষ করলেন কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। তিনি এও বলেন, মাত্র তিন ঘণ্টার এই সফর রাজ্যবাসীকে অপমান ছাড়া কিছু নয়। সবটাই প্রহসন, দেখনদারি। অশান্ত মণিপুরে প্রধানমন্ত্রীর রোড-শো আসলে মণিপুরবাসীর কান্না ও যন্ত্রণা এড়ানোর ভীরু কৌশল। অশান্ত মণিপুরে গিয়ে রোড-শো করা শোভনীয় নয়। প্রায় ৩০০ মানুষের প্রাণ গিয়েছে, ৬৭ হাজার মানুষ ঘরছাড়া। ১৫০০ আহত। এসব সরকারি তথ্যের বাইরেও ক্ষয়ক্ষতির আরও দীর্ঘ খতিয়ান রয়েছে। সেসব নিয়ে দুঃখ প্রকাশ পর্যন্ত করেননি প্রধানমন্ত্রী। এতো সারা দেশের জন্য লজ্জার। যাহোক, মণিপুর সফর করে বিরোধীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ নস্যাৎ করে এক ঢিলে দুই পাখি মারলেন প্রধানমন্ত্রী।








