স্মার্ট ফোনের কু-প্রভাব
স্মার্ট ফোনের কু-প্রভাব
পোস্ট এডিটোরিয়ালটি লিখেছেন ডা. সেখ নূর মহম্মদ
নতুন পয়গাম, কলকাতা:
আমাদের সন্তানরা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। বুদ্ধিদীপ্ত কর্মঠ প্রজন্ম ‘মনুষ্যত্বের অধিকারী সম্পন্ন নাগরিক হলে’ ভারত আবার জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে। বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানের শারীরিক ও মানসিক যে পরিবর্তন হয় এবং সেখানে সন্তানের মনে যে চাপ বা ডিপ্রেশন হয়, তা কমাতে হলে বাবা-মায়ের সাহচর্য একান্ত প্রয়োজন। অযথা সন্তানের চাহিদার কাছে বশ্যতা নয়; বরং সব সময় ওদের অন্যায্য চাহিদা বা আবদার মেনে নেওয়া ঠিক নয়। আমাদের সন্তানের সংখ্যা সবেধন নীলমণি, তাই ওরা বাৎসল্য স্নেহের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে বাবা-মা’কে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিংয়ের চেষ্টা করে। আমাদের উচিত ওদেরকে কোয়ালিটি সময় দেওয়া, ওদের সমস্যা সমাধানে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহার করা এবং সব সময় পাশে থাকা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্তানের হাতে অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোন দেওয়ার অর্থ হল তাদের হাতে এক বোতল মদ বা এক গ্রাম কোকেন তুলে দেওয়ার সমান। কারণ, স্মার্টফোনের প্রতি আসক্তি মাদকাসক্তির মতোই মারাত্মক ক্ষতিকারক। মাত্র কয়েক মিনিটের স্থায়ী একটি মোবাইল কল শিশুদের মস্তিষ্ককে হাইপার অ্যাক্টিভেট করে, যা শিশুর মস্তিষ্কে এক ঘণ্টা পর্যন্ত স্থায়ী হয়। মোবাইল স্ক্রিনের রেডিয়েশন শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে ব্যাঘাত ঘটায়, মাইক্রোওয়েভ রেডিয়েশন সরাসরি মস্তিষ্কে আঘাত করে। এই রেডিয়েশনকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধাস্ত্র তৈরি হচ্ছে। যেটা দূরের শত্রুকে বিনাশ করতে ওস্তাদ। কোয়ালিটি সময় না দিতে পারায় আমরা সবাই এখন শিশুদের মোবাইল গেম খেলায় ব্যস্ত রাখে।
এই প্রবণতা প্রসঙ্গে সানি’স স্কুল অব পাবলিক হেলথ-এর ডিন ডেভিড কার্পেন্টার বলেছেন,
‘শিগগিরই আমরা হয়ত এক মহামারী রোগের শিকার হতে পারি এবং সেটি হবে মস্তিষ্কের ক্যান্সার।’ অত্যধিক মোবাইল ব্যবহারে শিশুদের স্নায়ু দুর্বল হয়, মেজাজ খিটখিটে হয়, শরীর ধীরে ধীরে ক্লান্ত ও নিস্তেজ হয়ে পড়ে, এমনকি নিয়মিত ঘুমে ব্যাঘাত ঘটায় এবং শ্রবণশক্তি হ্রাস করে দেয়। মোবাইলে বেশিক্ষণ কথা বললে কান-মাথা গরম হয়, মাথার ভেতর দপদপ করে; হেডফোনে গান বা দীর্ঘক্ষণ কথা বললে ও শুনলে অনেকের মাথা ঘোরে, বমি বমি ভাব আসে, মাথা ও ঘাড়ের পেছন দিকে যন্ত্রণা অনুভূত হয়, মাইগ্রেনের ব্যথা বাড়ে।
সুইস গবেষকদের গবেষণা থেকে জানা যায়, তাঁরা ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সি সাতশো কিশোরের ওপর এক বছর ধরে মোবাইলের রেডিয়েশন নিয়ে গবেষণায় দেখেছেন, মস্তিষ্কের বিকাশে এটা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। যারা ডান কানে মোবাইল নিয়ে কথা বলেন, তাদের ক্ষতি বেশি। বাম কানে ফোন নিয়ে কথা বলায় ক্ষতি তুলনামূলক কম। কারণ, আমাদের মস্তিষ্কের স্মৃতি সম্পর্কিত অংশ ডান দিকে অবস্থান করে, তাই বাম কানে মোবাইল নিয়ে কথা বললে ক্ষতি কম হবে (সূত্র: ডয়চে ভেলে)।
আমেরিকার আরিজোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় প্রকাশ- একটি টয়লেট সিটের উপরিভাগে যে পরিমাণ ব্যাকটেরিয়া থাকে, তার দশ গুণ বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে স্মার্টফোনে। স্মার্টফোন থেকে নির্গত হাই ফ্রিকোয়েন্সি ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক তরঙ্গ মস্তিষ্কের ক্যান্সার ছাড়াও শুক্রানুর ঘনত্ব এবং শুক্রকীটের গঠন ও গুণগত মান ও পরিমাণ কমিয়ে দেয়।
বিজ্ঞানীরা বলছেন, স্মার্টফোন হারানোর ভয় থেকে মানুষের মনে তৈরি হচ্ছে আতঙ্ক। তাঁরা মুঠোফোনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার অসুখের নাম দিয়েছেন ‘নোমোফোবিয়া’ অর্থাৎ
‘নো মোবাইল নো ফোবিয়া’। আমেরিকান ম্যাকিউলার ডিজেনারেশন অ্যাসোসিয়েশন তাঁদের সর্বশেষ গবেষণায় জানিয়েছে, মোবাইল থেকে নির্গত নীলাভ আলোর বিকিরণ চোখের রেটিনার স্থায়ী ক্ষতি করে, যা ধীরে ধীরে অন্ধত্বের দিকে নিয়ে যেতে পারে। এক্সরে রশ্মি, সূর্যের আল্ট্রা ভায়োলেট রশ্মি যেমন তেজস্ক্রিয় ছড়ায়, তেমনি স্মার্টফোন থেকে নির্গত রঞ্জন রশ্মি রক্তের অনুচক্রিকাকে ভেঙে দেয় এবং গামা রশ্মি সরাসরি শরীরের নানান কোষ ও কলায় আঘাত হানে, পরিণতিতে ক্যান্সার-সহ নানাবিধ বংশগত ত্রুটি বিচ্যুতি বা মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি করছে।
বৃটিশ একাডেমি এবং কলকাতার সল্টলেক ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ-এর যৌথ সমীক্ষায় জানা গিয়েছে, মারামারি, যৌন হেনস্থা-অত্যাচার, পর্ণগ্রাফি, সন্দেহবাতিক আচরণ, বিবাহ বর্হিভূত সম্পর্কের মতো কারণগুলির সঙ্গে গৃহকোণে হিংসা ছড়ানোর খেলায় স্মার্টফোনের ব্যবহার উত্তরোত্তর বাড়ছে। এখন অনেকেই ঘুম থেকে ওঠা থেকে গভীর রাতে ঘুমোতে যাওয়া পর্যন্ত তুচ্ছাতিতুচ্ছ, অগভীর সোশ্যাল মিডিয়া কনটেন্টে ডুবে থাকে। অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির গবেষকরা নাম দিয়েছেন ‘ব্রেন রট’, যার সহজ বাংলা হল ‘মস্তিষ্কে পচন’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা রিলস, শর্ট ভিডিও, টিকটক বা নিরন্তর সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রলিং করতে করতে মূলত জেন-জি’র পড়ুয়াদের মস্তিষ্কের বৌদ্ধিক ক্ষমতা, মননশীলতা, মানবিক প্রবৃত্তি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মের ছাত্র-ছাত্রীরা পচন ধরা মস্তিষ্ক নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করছে, স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো মাতাচ্ছে, সোশ্যাল মিডিয়াজাত ডিজিটাল ‘জাঙ্ক’ কনটেন্টে ডুবে থেকে নানারকম মানসিক বৈকল্য বা স্থবিরতা, যা ধীরে ধীরে মস্তিষ্ককে গ্রাস করছে। একে গভীরতর অসুখের ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছেন বিহেভেরিয়াল সায়েন্টিস্টদের একাংশ। তাই অহেতুক মোবাইলে বুঁদ না হয়ে বা ভিডিও গেম বা নেট দুনিয়ার হাতছানিতে ছাত্র-ছাত্রীরা যাতে পড়াশোনার ক্ষতি করে মোবাইলে ডুবে না থাকে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে।
মুঠোফোন ছাত্র জীবনে অনেক রকম ক্ষতি করলেও জেট-যুগে মোবাইলের গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এখন শিক্ষার্থীরা খুব সহজেই ইউটিউব থেকে তাদের অজানা অনেক রকম বিষয় জেনে নিতে পারে। আবার ক্লাসের বাইরেও শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক কিছু সমাধান করে নিতে পারে। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষিকা, বাবা-মা’কে বন্ধুর মতো মিশে ওদের অসুবিধার কথা জানতে হবে। সন্তানকে সহানুভূতিশীল ও মানবিক করে গড়ে তুলতে হবে, যাতে নানাবিধ সমস্যার সমাধান, সমন্বয় সাধন ও সামগ্রিক সংযোগ স্থাপনে সক্ষম হয়। তাতে সেল্ফ কনফিডেন্স, সাহস ও নেতৃত্ব দানের ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। তাতেই অহেতুক নেশাগ্রস্তের মতো মোবাইল ব্যবহারের কুফল নিজেই বুঝতে পারবে। পরিশেষে বলি, শুধু সন্তানদেরকে উপদেশ দিলেই হবে না। অভিভাবকদেরকেও মোবাইল আসক্তি থেকে দূরে থাকতে হবে। তাই তো বলা হয়, আপনি আচরি ধর্ম অপরে শেখাও।








