বেলডাঙ্গায় বাবরি মসজিদ?
ড. মানাজাত আলী বিশ্বাস
ইসলামের আলোকে মসজিদ নির্মাণ: ইসলাম ধর্মে যে সকল কাজকে অত্যন্ত সম্মানজনক বলে গণ্য করা হয়, তার মধ্যে একটি হল মসজিদ নির্মাণ। হাদিসে এসেছে, “যে ব্যক্তি আল্লাহর (সন্তুষ্টির নিয়তে) উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি ঘর নির্মাণ করেন” (সহীহ বুখারি)। ইসলাম ধর্মের সমগ্র কর্মকাণ্ডই মসজিদকেন্দ্রিক। হযরত মুহাম্মদ (সা:) ও খোলাফায়ে রাশেদীনের আমলে রাষ্ট্রীয় পরামর্শসভা পরিচালিত হত মসজিদ থেকেই। মসজিদে সালাত আদায়ের পাশাপাশি থাকত পড়াশোনার ব্যবস্থা। বর্তমানে ইউরোপে মসজিদকেন্দ্রিক কমিউনিটি সেন্টারগুলি অনেক সামাজিক ও ধর্মীয় কার্যক্রমকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। তাই ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের কাছে মসজিদের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা অপরিসীম। মসজিদের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রত্যেক মুসলিমের জন্য আবশ্যিক। কিন্তু এই অত্যন্ত সাধারণ বিষয়টিকে নিয়ে এত কথা বলার দরকার কেন পড়ছে? এর উত্তর পেতে আমাদেরকে চোখ রাখতে হবে মুর্শিদাবাদের দিকে।
মুর্শিদাবাদের বেলডাঙ্গায় ‘বাবরি মসজিদ’ নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছেন বিধায়ক হুমায়ুন কবির। নতুন করে বাবরি মসজিদ মুর্শিদাবাদে নির্মাণ করা ঠিক না ভুল, এটাকে সমর্থন করা উচিত না পরিত্যাগ করা উচিত, এটা ধর্মীয় অধিকার নাকি বিশৃঙ্খলার ইঙ্গিতবাহী — এসব নিয়ে জোর চর্চা চলছে। যেহেতু বিধায়ক জানিয়ে দিয়েছেন, এটি সরকারি টাকায় হচ্ছে না, তাই ব্যক্তিগতভাবে এই মসজিদের নির্মাণ নিয়ে সরাসরি নিষেধ করার জায়গা নেই। আইনত একজন নাগরিক তার ধর্ম পালন করার জন্য ধর্মস্থান নির্মাণ করতে পারেন ও তার রক্ষণাবেক্ষণ করতে পারেন। এতটুকু পর্যন্ত ব্যাপারটা খুবই সাদামাটা। কিন্তু এই ঘটনার অন্তরালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বিষয়, যেটি সমাজ সচেতন নাগরিক হিসেবে সকলেরই নজরে থাকা আবশ্যক।

২০২২ সালের ২ আগস্ট মুর্শিদাবাদ বিধানসভার বিজেপি বিধায়ক গৌরীশংকর ঘোষ রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালকে চিঠি লিখেছিলেন, যাতে মুর্শিদাবাদ-মালদা ও এই সংলগ্ন অঞ্চলকে একটি আলাদা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হয়। বিধায়কের দাবি ছিল, এই অঞ্চল দিয়ে নাকি প্রচুর অবৈধ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী এসে চলেছে। তাই রাষ্ট্রের নিরাপত্তার স্বার্থে এটা করা দরকার। অর্থাৎ কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল হয়ে গেলে এই এলাকা সেন্ট্রাল ফোর্সের অধীনে চলে আসবে। তখন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। বিধায়কের বক্তব্যের আসল উদ্দেশ্য কী, তা যে কোন সচেতন মানুষ বুঝতে পারবেন।
বিধায়ক গৌরীশংকর ঘোষের দাবিকে আরো বিস্তারিত ও পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে পার্লামেন্টে উপস্থাপন করলেন বিজেপি সাংসদ নিশিকান্ত দুবে। ২০২৪ সালের ২৫ জুলাই নিশিকান্ত দুবে মিডিয়াকে জানালেন, “I demand that Malda, Murshidabad, Araria, Kishanganj, Katihar and the Santhal Parganas region be declared as a Union Territory and the National Register of Citizens (NRC) be implemented there,” সোজা বাংলায় বললে, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ, মালদা এবং বিহারের আরারিয়া, কাটিহার ও কিষানগঞ্জ, সাঁওতাল পরগনা এই অঞ্চলগুলিকে একত্রিত করে কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল করা হোক। এর মধ্যে প্রথম পাঁচটি এলাকাই মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। অর্থাৎ বিজেপির টার্গেট বুঝতে অসুবিধা হওয়ার কথা নয়। এই অঞ্চলকে কেন্দ্রশাসিত করে নিতে পারলে এখানে স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা সংকুচিত হবে। রাজনীতি থেকে শুরু করে সবকিছুই নিয়ন্ত্রিত হবে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের দ্বারা। তাতে মানুষের অধিকার সংকুচিত হবে। সুতরাং এই অঞ্চল নিয়ে বিজেপির নিজস্ব পরিকল্পনা আছে এবং সেটা অবশ্যই এই অঞ্চলের মুসলিম সমাজের পক্ষে কোনভাবেই ভাল হবে না, সেটা একটা শিশুও বোঝে।
এই পরিস্থিতিতে বিধায়ক হুমায়ুন কবীরের বেলডাঙ্গায় বাবরি মসজিদ নির্মাণের ঘোষণা ন্যাশনাল মিডিয়াতেও হইচই ফেলে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্বেষপন্থীদের অপর মহল থেকে ‘মাথা কাটার’ ঘোষণা এসে গেছে। উত্তেজনা তৈরি হচ্ছে। আগামীতে হয়ত পরিস্থিতির আরো অবনতি হতে পারে। অথচ মসজিদ তৈরি নিয়ে এমনটি হওয়া কীভাবে কাম্য হতে পারে? মসজিদ তৈরি হবে একমাত্র আল্লাহর এবাদতের জন্য, শিক্ষা প্রসারের জন্য, সমাজে ঐক্যবদ্ধতা তৈরির জন্য, ন্যায়ের আদর্শকে প্রসারিত করার জন্য। কোন জায়গায় যদি নামাজী থাকা সত্ত্বেও সেখানে মসজিদে স্থান সংকুলান না হয়, তাহলে অবশ্যই মসজিদের সম্প্রসারণ করা দরকার। যদি তা সম্ভব না হয়, তাহলে নতুন মসজিদ তৈরি করা যেতে পারে, এটাও একেবারেই যথাযথ। কিন্তু ঠিক ‘বাবরি মসজিদ’ নাম দিয়েই এবং ৬ ডিসেম্বরেই শিলান্যাস করতে হলে, সেই মসজিদ তৈরির উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তো উঠবেই। এ তো সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষতা তৈরি বা রেষারেষি। একে সত্যিই কি জাস্টিফাই করা যায়?
শিক্ষণীয় উদাহরণ: কিছু বছর আগে হাওড়া জেলার নিবড়ায় তাবলীগ জামাতের ইজতেমা হয়েছিল। সেখানে একটি মসজিদের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়। কালক্রমে সেটি নিবড়া মার্কাজ মসজিদ হিসেবে পরিচিত হয়। সাম্প্রতিক কালে পশ্চিমবঙ্গে তৈরি অন্যতম বৃহৎ মসজিদ এটা। অথচ কখনো দেখা যায়নি, এটা নিয়ে কোন বিরাট প্রচার বা হইহুল্লোড়ের পথে উদ্যোক্তারা গেছেন।
মসজিদে জিরার ও কুরআনের শিক্ষা:
হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় আবু আমির নামে এক ব্যক্তি প্রকাশ্য মুসলিমদের বিরোধিতা শুরু করে। বদর এবং ওহুদের ময়দানে সক্রিয়ভাবে মুসলিম নিধনের কাজে যুক্ত হয়। এতকিছুর পরেও যখন আস্তে আস্তে ইসলামের বাণী সমগ্র আরবে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছিল, তখন ক্ষিপ্ত হয়ে আবু আমির শেষ পর্যন্ত রোমান সম্রাট হিরাক্লিয়াসের সাহায্য প্রার্থনা করে। রোমান সম্রাট সামরিক সাহায্য দিতে সম্মত হন। ইতিমধ্যে আবু আমির নিজের গোত্রে খবর পাঠায় যে, অতি শীঘ্রই আমি এক বিরাট রোমান সেনাদল নিয়ে আসছি মুসলিমদের ধূলিসাৎ করে দেব। তাই তোমরা আমার জন্য একটি গোপন স্থান নির্মাণ কর এবং সেখানে যাতে থাকা যায়, তার ব্যবস্থা কর। সেই সময় কিছু মুনাফিক, যারা মুখে ইসলামের কথা বলত, কিন্তু বাস্তবে ইসলামের শত্রুদের সাথে হাত মিলিয়ে ছিল, তারা একটি মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেয়। তাদের উদ্দেশ্য ছিল, যেন কোনভাবেই কেউ সন্দেহ না করে। অর্থাৎ এই মসজিদের ভিত্তি তাকওয়া বা আল্লাহ-ভীরুতা ছিল না; বরং এই মসজিদ তৈরি হয়েছিল জাগতিক লক্ষ্য-উদ্দেশ্যে। ইতিমধ্যে তবুকের যুদ্ধের পরিস্থিতি তৈরি হয়। মসজিদ তৈরির উদ্যোক্তারা হযরত মুহাম্মদ (সা.) এর কাছে এসে তাকে এই মসজিদে নামায পড়ার জন্য আমন্ত্রণ জানান। উদ্দেশ্য ছিল, যদি নবী (সা.) এই মসজিদে নামায পড়েন, তাহলে এই মসজিদ একপ্রকার স্বীকৃতি লাভ করবে। তবে স্রষ্টা সবকিছুই দেখছিলেন উপর থেকে। নবী (সা.) চলে গেলেন তাবুকের প্রাঙ্গণে। যখন তিনি ফিরে আসছিলেন, তখন আর মাত্র এক অথবা দুই দিনের পথ বাকি ছিল। এমন সময় স্রষ্টার তরফ থেকে ওহী (ঐশী বাণী) নাযিল বা অবতীর্ণ হল। আসলে স্রষ্টা নিজেও চাননি এমন মসজিদে তার প্রিয় রাসূল নামায পড়ুন, যে মসজিদ আদতে তার উপাসনার লক্ষ্যে নির্মিতই হয়নি। অবতীর্ণ হল সূরা তাওবা-র ১০৭ ও ১০৮ নম্বর আয়াত: “আর যারা মসজিদ তৈরী করেছে ক্ষতিসাধন, কুফুরী আর মু’মিনদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির উদ্দেশ্যে, আর যে ব্যক্তি ইতিপূর্বে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছে তার ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহারের নিমিত্তে, তারা অবশ্য অবশ্যই শপথ করবে যে, আমাদের উদ্দেশ্য সৎ ব্যতীত নয়। আল্লাহ সাক্ষ্য দিচ্ছেন যে, তারা অবশ্যই মিথ্যাবাদী। তুমি ওর ভিতরে কক্ষনো দাঁড়াবে না। প্রথম দিন থেকেই যে মাসজিদের ভিত্তি তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত, তোমার দাঁড়ানোর জন্য সেটাই অধিক উপযুক্ত, সেখানে এমন সব লোক আছে, যারা পবিত্রতা লাভ করতে ভালবাসে, আর আল্লাহ পবিত্রতা লাভকারীদের ভালবাসেন।” এইভাবে সেই মসজিদে নামায আদায় করা থেকে নবী (সা.)-কে বিরত রাখেন স্বয়ং মহা প্রতিপালক আল্লাহ।
সংবাদে প্রকাশ ইতিমধ্যে অপরপক্ষ বহরমপুরে রাম মন্দির তৈরীর ঘোষণাও দিয়েছে। অর্থাৎ তারাও চাইছে এটা নিয়ে একটা বড় রেষারেষি অথবা অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হোক। আমরা চাই, দক্ষিণপন্থীদের কু-চক্রান্ত ব্যর্থ হোক। সমগ্র বিষয়টি পড়ে-বুঝে যেটা ন্যায়, যেটা সত্য, তার পক্ষ নিন। কোনরকম উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরির পথ পরিহার করাই বাঞ্ছনীয়। নিঃসন্দেহে স্রষ্টা আমাদের অন্তরের প্রত্যেকটি খেয়াল সম্পর্কে অবগত।
(সভাপতি: প্রগ্রেসিভেন্টেলেকচুয়াল অফ বেঙ্গল)








