দুর্গাপুরকান্ড এবং গণ হিস্টিরায়া
গৌতম রায়
দুর্গাপুর ধর্ষণ কান্ডের স্মৃতি সময়ের স্বাভাবিক নিয়মেই ক্রমশ ফিকে হতে শুরু করেছে। তবে এই ঘটনার অপরাধীদের নামের ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে যে প্রেক্ষিত তৈরি হল- তা এই রাজ্যের বুকে একটা স্থায়ী ক্ষত তৈরি করল- এ বিষয়ে সন্দেহের কোনও অবকাশ নেই।
খুন, নারী নিগ্রহ, ধর্ষণ ইত্যাদি অনভিপ্রেত ঘটনা বহু ঘটেছে এই রাজ্যে। বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় থাকাকালীন ঘটেছে । অনেক বর্বরতার আমরা সাক্ষী ।পাশবিকতার আমরা সাক্ষী। কিন্তু কোনওদিন এ ধরনের অপরাধ ঘিরে, অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় , জাতপাত ভিত্তিক পরিচয় — এমন বিষয় কিন্তু অতীতে উঠে আসেনি। ধর্ষকের জাত বিচার, ধর্ম বিচার — এসব করতে পারেনি বলেই হয়ত ক্ষমতায় থাকতে পারেনি বামফ্রন্ট। এসব করতে পেরেছেন আমাদের পুরাচ্চি থালাইভা, অর্থাৎ বিপ্লবী নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।তাই আজও তিনি ক্ষমতার গজদন্ত মিনারে সগৌরবে অবস্থান করছেন। হয়ত আরো অনেককালই কারণ, লোক চায় এখন গণহিস্টিরিয়া।
এই গণহিস্টিরিয়ার জেরেই দুর্গাপুরের ধর্ষণকান্ডে পুলিশের হাতে ধরা পড়া দুস্কৃতিদের জাত কূল মান নিয়ে এত মাথাব্যথা।মাথাব্যথা অবশ্য আমজনতার নয়। মাথাব্যথা তাদেরই, যাদের সত্যজিৎ রায়ের ‘হীরক রাজার দেশে’ র ‘মস্তিষ্ক প্রক্ষালন’ ঘরে ঘুরে আসবার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য ঘটেছে। সেই ঘটনাক্রম অর্থাৎ; ‘গজব’ বা ‘দোয়া’ র জেরে যারা এই দুর্গাপুরের ধর্ষণ জনিত নারকীয় ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপরাধের হিন্দু-মুসলমান করতে চাইল, তখন একটা অংশের লোক, না- তারা ‘লোক’, ‘মানুষ’ না। তারা চিল চিৎকারে পুলিশের হাতে ধরা পড়া কিছুলোকের জন্মগত ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে ‘শীবাকীর্তন’ অর্থাৎ; শিয়ালের মতো হুক্কা হুয়া জুড়ে দিল; বর্বরতায় ধরা পড়া সকলেই একটা বিশেষ ধর্মের লোক। মানে, এই বিশেষ ধর্ম বোঝাতে তারা পবিত্র ইসলামের অনুসারী, অনুগামী মুসলমানদের বোঝাতে চাইল।
বিরোধী দলনেতা প্রথম শুরু করলেন দুর্গাপুর কান্ড ঘিরে অপরাধীদের ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে শীবারব। আর তখনই বুঝতে পারা গেল, শিয়ালের ডেরায় কীভাবে কুমির লুকিয়ে আছে।
দুর্গাপুর ধর্ষণকাণ্ডে যে সমস্ত অপরাধী ধরা পড়েছে, তাদের ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে যখন একটা সামাজিক বিভাজন পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হচ্ছে, তার সঙ্গে সঙ্গে কেবলমাত্র মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষদের অপরাধী বলে দাগিয়ে দেওয়ার চিরকালীন একটা পরিকল্পনাকে স্থায়ী করে দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে, তখন ধর্ষকের ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে কোনও শব্দ লিখতে ঘৃণাবোধ করলেও বলতে হয়, ওই ধর্ষণকারীদের মধ্যে থাকা সন্দেহে পুলিশের জালে এক ব্যক্তি ধরা পড়েছে, যে ধর্মীয় পরিচয়ে হিন্দু। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে বিভাজনের উদ্দেশ্যে যারা এই মানবতাবিরোধী অপরাধটিকে ব্যবহার করছে, তারা এই ধৃত হিন্দু ব্যক্তিটির নাম, ধর্মীয় পরিচয় খুব স্বাভাবিকভাবে গোপন করে চলেছে।
আমাদের স্কুল জীবনের বন্ধুদের একটি হোয়াটস অ্যাপ গ্রুপ আছে। এই বন্ধুদের কাউকে কাউকে একটা সময় চিনতাম কংগ্রেসের সমর্থক হিসেবে। পরবর্তীকালে রাজনৈতিক পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে তারা কেউ কেউ তৃণমূল কংগ্রেসের সমর্থক হয়ে গেলেন। গত এক বছর ধরে এই গ্রুপটি তৈরি হয়েছে। তারপর থেকে দেখতে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে অবস্থানরত আমাদের স্কুল জীবনের বন্ধুদের মধ্যে একটা বড় অংশ মুখে প্রগতিশীলতার কথা বলেও কার্যক্ষেত্রে বিভাজনের রাজনীতিকে প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে একেবারে আত্ম নিবেদিত।এই গ্রুপে একবার আমি ‘নাস্তা’ শব্দটি লিখে ফেলার কারণে ‘টুকরে টুকরে গ্যাঙে’র হয়ে কথা বলছি — এই অভিযোগ শুনতে হয়।
এই অভিযোগ যে করে, সে অতীতে কংগ্রেস করত। পরবর্তীকালে ছিল তীব্র তৃণমূল সমর্থক। এখন বুঝতে পারছি, সে হয়ে উঠেছে বিভাজনের রাজনীতির সমর্থক। একটা বৈশিষ্ট্যের ধারাবাহিকতা সে বয়ে নিয়ে চলেছে। সে কোনওদিন, কোনও অবস্থায় কোনওরকম প্রগতিশীল রাজনীতির সমর্থক ছিল না। সেই ধারাবাহিকতাকে সে আজও বয়ে নিয়ে চলেছে ।কোনও ধরনের প্রগতিশীল রাজনৈতিক চিন্তা চেতনার সঙ্গে তার বিন্দুমাত্র সম্পর্ক নেই।
দুর্গাপুর কাণ্ডের পরে সমাজমাধ্যমে যেভাবে বিধানসভার খাতা-কলমে বিরোধী দলনেতার অপরাধীদের ধর্ম বিচার ঘিরে মন্তব্যে শোরগোল পড়ে গেল, ঠিক সেভাবেই আমাদের ছোটবেলার বন্ধুদের এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপেও অপরাধীদের ধর্ম পরিচয় নিয়ে চলল তীব্র আক্রমণ মুসলমান সমাজকে। ধর্ষক মানেই মুসলমান। অপরাধী। এই সমস্ত বহুকালের বস্তাপচা মনগড়া কথায় হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ভরে উঠতে লাগল।
এখন এই গ্রুপে ওই দুর্গাপুর কান্ডে মুসলমান ব্যতীত অন্য ধর্মাবলম্বী, অর্থাৎ জন্ম পরিচয়ে হিন্দু, তার কথাটি লেখা হল তখন প্রথমে কয়েকজন মন্তব্য করলেন, ফেক নিউজ। যেখান থেকে এই খবরটি এসেছে, সেই সংবাদসূত্রের কোনও বিশ্বাসযোগ্যতা নেই। তারপরই যখন ‘দ্য হিন্দু’র মতো সর্বভারতীয় একটি ইংরেজি সংবাদপত্রের খবরের লিংক ওখানে দেওয়া হল, তখন আর কারো মুখে কোনও কথা নেই।
তার আগে অবশ্য ওই ফেক নিউজ দাবি করা খবরটিকে ঘিরে নানা ধরনের মন্তব্য উঠে আসতে শুরু করেছিল। যেসব মন্তব্যের ভেতর থেকে বুঝতে পারা যায়, অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয় ঘিরে মাথা ঘামানো একদল মানসিক রোগীর আস্ফালন আজ আমাদের সামাজিক প্রেক্ষিতকে কোন জায়গায় টেনে নামিয়ে এনেছে।
এই হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে যারা রয়েছেন, তারা প্রায় প্রত্যেকেই উচ্চশিক্ষিত।পেশাগতভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত। আর্থিকভাবেও যথেষ্ট শক্তিমান। এই অংশের মানুষ যখন অপরাধীর ধর্মীয় পরিচয়ের নিরিখে অপরাধকে পেছনে ফেলে, ধর্মকেই অপরাধের প্রধান নির্ণায়ক বলে মনে করে, তখন বুঝতে পারা যায়, ধর্মের নামে কিরকম গণহিষ্টিরিয়াতে আজ আমাদের এই বাংলাও দেশের হিন্দি বলয়ের মতো মেতে উঠতে শুরু করেছে।
মাত্র ১৫-১৮ বছর আগেও এভাবে ধর্মের নামে মাতাল হয়ে যাবার মতো অবস্থা আমাদের বাংলায় অন্তত ছিল না। বড় অংশের বাঙালির মধ্যে ছিল না। ধর্ম ঘিরে মানুষের আবেগ ছিল।ভালোবাসা ছিল। শ্রদ্ধা ছিল ।একটা ছোট অংশের মানুষ ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে বাংলায় তাদের দোসরদের রাজনৈতিক ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত করবার লক্ষ্যে যেভাবে এই রাজ্যের সামাজিক বন্ধন ও কাঠামোকে ভেঙে তছনছ করে দিল, জানি না আমার নাতির প্রজন্মের মানুষও সেই তছনছ করা অবস্থা কাটিয়ে, একটা সুন্দর অসাম্প্রদায়িক সুষম ও স্বাস্থ্যকর সমাজ, সুসংহত পরিবেশ, বিধি ব্যবস্থাকে দেখতে পাবে কিনা। তবে একটাই প্রত্যাশা — নতুন প্রজন্ম, আধুনিক প্রজন্ম হয়ত বা একদিন বুঝতে পারবে, ধর্মের রাজনৈতিক ব্যবহারের এই গণহিষ্টিরিয়া আমাদের কোন দীনতার আবর্জনায় টেনে এনেছে। তারাই হয়ত সেদিন এই গণহিস্টিরিয়াকে প্রতিরোধ করতে প্রতিরোধের প্রাচীর গড়ে তুলবে। সেদিন বোধহয় বোধোদয় হবে।








