মানব জীবনের চাহিদা
মুহাম্মদ শামসুদ্দোহা কাসেমী
‘জীবন’ একটি ছোট্ট শব্দ, অথচ এর অর্থ ব্যাপক। আকাশের মতো বিশাল, সাগরের চেয়েও গভীর। এর রয়েছে নানাবিধ চাহিদা। সে চাহিদা পূরণ করার জন্য সবাই ব্যস্ত. কেউ সামান্য, কেউ প্রবলভাবে। জীবনের চাহিদা প্রধানত দু’প্রকার — শারীরিক ও মানসিক। মানুষের বয়স অনুপাতে এই চাহিদার তারতম্য ঘটে। শৈশবকালের চাহিদা একরকম, কৈশোরে তা বদলে যায়, যৌবনে ভিন্ন রূপ নেয়, বার্ধক্যে আবার পরিবর্তিত হয়। জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাহিদাও পরিবর্তিত এবং রূপান্তরিত হয়।
শারীরিক চাহিদা:
শারীরিক চাহিদা মোটামুটি দুই রকম — (১) খাদ্য, বস্ত্র ও বাসস্থান সম্পর্কিত। (২) পরবর্তী বংশধারা সংরক্ষণ সম্পর্কিত। অন্যভাবে বললে, একটিকে বলা যায় পেটের চাহিদা, আরেকটি হল জৈবিক চাহিদা। পেটের চাহিদা নিবারণের জন্য মানুষ জীবিকা নির্বাহ করে, বস্ত্র দ্বারা শরীর আচ্ছাদিত করে, আর বসবাসের উপযোগী সুন্দর একটি আশ্রয়স্থল নির্মাণ করে। জৈবিক বা যৌন চাহিদা পূরণের বৈধ উপায় হল বিবাহ।
কেউ সৎ পথে উপার্জন করে, কেউ অসৎ পথে; কেউ বৈধভাবে জৈবিক চাহিদা মেটায়, কেউ-বা অবৈধভাবে। ইসলাম যাবতীয় অসৎ ও অবৈধ পথ নিষিদ্ধ করেছে। বরং যেসব উপকরণ মানুষকে সে পথে টেনে নেয়, ইসলাম সেগুলোকেও বন্ধ করেছে।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “তোমরা ব্যভিচারের কাছেও যেও না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা আল-ইসরা: ৩২)। অতএব, চোখ বা দৃষ্টিশক্তি হেফাযত করা, সতর ঢেকে রাখা, নারীদের হিজাব পালন — সবই এই নিষিদ্ধ পথ থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়।
মানসিক চাহিদা:
মানুষের মানসিক চাহিদা বিভিন্ন রকম। প্রত্যেকেই চায় মনের শান্তি, প্রশান্তি। এর প্রধান উপকরণ হল জ্ঞান। তাই কুরআনের প্রথম শব্দ ‘ইকরা’ (পড়ো)। জ্ঞান ব্যতীত মনের সুষম বিকাশ ঘটে না, বিবেক জাগ্রত হয় না। জ্ঞান দুই প্রকার — জাগতিক এবং আধ্যাত্মিক। একটির শিক্ষা দেয় স্কুল-কলেজ, অন্যটির শিক্ষা দেয় মাদরাসা। একটিতে যুক্তি, অন্যটিতে ভক্তি। যখন যুক্তি ও ভক্তি একত্র হয় — তখন জন্ম নেয় মুক্তি, যাবতীয় কষ্ট ও অনাচার থেকে।
মানসিক চাহিদাও দু’প্রকার — ইহলৌকিক ও পারলৌকিক। ইহলৌকিকভাবে মানুষ সম্মানজনক জীবন, সামাজিক মর্যাদা, ক্ষমতা, নাম-যশ ইত্যাদি কামনা করে। কিন্তু অনেকে হিংসা, অহংকার ও লোভে পড়ে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। ইসলাম মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য দিয়েছে আত্মশুদ্ধির বিধান, যাকে বলে ইসলাহে নফস। অন্তর যখন যাবতীয় রোগ থেকে মুক্ত হয়, তখন মানুষ সহজেই আল্লাহর ইবাদত করতে পারে। আর পারলৌকিক চাহিদা হল মৃত্যুর পর শান্তিতে থাকা। কবরে, হাশরে ও জান্নাতে। এর জন্য প্রয়োজন শরীয়তের বিধান মেনে চলা এবং আল্লাহর নির্দেশ অনুসরণ করে আল্লাহকে সব কাজে সন্তুষ্ট করা।
উপসংহার:
জীবনে চাহিদার শেষ নেই — তা শারীরিক হোক বা মানসিক। তবে প্রকৃত বুদ্ধিমান তারা-ই, যারা আল্লাহ তাআলার দেখানো পথে উভয় চাহিদা পূরণ করে এবং তাঁর সন্তুষ্টি কামনা করে। মহান আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে জীবনের প্রকৃত চাহিদা অনুধাবন করার ও বৈধ পথে তা পূরণের তাওফীক দান করুন। সীরাতে মুস্তাকীম ধরে ইহলৌকিক জীবন অতিক্রম করে পারলৌকিক জীবনে পৌঁছানোর সুযোগ দিন। বিনিময়ে আমাদের দান করুন এক নিরাপদ, শান্তিপূর্ণ ও জান্নাতি জীবন, যেখানে নেই মৃত্যু, নেই বার্ধক্য, নেই কষ্ট; আছে শুধু স্রষ্টার সঙ্গে চিরন্তন মিলন।








