চর্মচক্ষু যাহা গোচরীভূত
কেন্দ্র সরকার এক দশক ধরে বলে আসছে ‘সবকা সাথ সবকা বিকাশ’। পরে আবার এর সঙ্গে যোগ করা হয় ‘সবকা বিশওয়াস’। কিন্তু বাস্তবে এই স্লোগানের নামগন্ধ দেখা যাচ্ছে না। গেরুয়া নেতা-মন্ত্রীরা বলছেন, নারী-পুরুষ সবাই সমান, উঁচুজাত-নিচুজাত বলে কিছু নেই, হিন্দি-অহিন্দি সব ভাষা সমান মর্যাদার। তাই সকলকে সমান নজরে দেখতে হবে। কারো প্রতি বিদ্বেষ বৈষম্য বরদাস্ত করা হবে না। গণতান্ত্রিক দেশে সব মানুষের অধিকার সমান। আইনের চোখে কেউ অসমান নয়। যেন ভূতের মুখে রামের নাম।
এসব গালভরা অমৃত-ভাষণ শুনে নিজের চোখ-কানকেই যেন বিশ্বাস হয় না। কারণ, এরা তো এতদিন খুল্লমখুল্লা ঘৃণার নিবিড় চাষ করে চলেছে, এরাই তো ধর্মীয় মেরুকরণ ও বিভাজনের তাল খেলছে, এরাই তো সাম্প্রদায়িকতার বেসাতি করে চলেছে। এরাই তো হিন্দুত্ববাদের নামে মনুবাদী রাষ্ট্র গড়ার ছক কষছে। এমনিতেই এক হিন্দুত্ববাদে রক্ষে নেই, তার ওপর সুগ্রীবের মতো দোসর হয়েছে নেতাগু-র যায়নবাদ। সরকার বাহাদুর বুক ফুলিয়ে দাবি করছে, তারা নাকি কৃষক-বন্ধু। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কৃষি ব্যবস্থাকে আগেকার দিনের মতো জোতদার, জমিদার, মহাজনদের হাতে তুলে দিতে কর্পোরেট বান্ধব কৃষিনীতি লাগু করছে। কৃষি বিজ্ঞানীদের সুপারিশ ডাস্টবিনে ফেলে দিচ্ছে। কর্পোরেট ঋণ খেলাপিদের বিপুল অংকের ঋণ মুকুব করে দেওয়া হচ্ছে। আর চাষিরা ঋণের জালে জড়িয়ে আত্মহত্যা করছে। ফি বছর কৃষকদের আত্মহত্যার সংখ্যা বাড়ছে।
শুরু থেকেই এই সরকার কেবল তেলা মাথায় তেল দিয়েই চলেছে। মুখে বলছে ‘মেক ইন ইন্ডিয়া’, ‘আত্মনির্ভরশীল ভারত’; আর কাজের বেলায় দেখা যাচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত সব সংস্থা জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। কৃষিতে নতুন করে সবুজ বিপ্লব আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হচ্ছে, অথচ গরিব চাষিদের জমি কেড়ে নিয়ে কর্পোরেট বন্ধু দ্বয়কে হাজার হাজার একর জমি ১ টাকা লিজে ভোটের ভেট দেওয়া হচ্ছে। যাতে, ভোটের আগে তারা বিজেপির ফান্ডে পাহাড় প্রমাণ অনুদান দেয়।
সবক্ষেত্রে সরকারের ব্যর্থতা ঢাকতে জাত-ধর্মের জিগির জিইয়ে রাখা হচ্ছে। সংঘ পরিবারের রাজনৈতিক পরিসরে হিন্দুত্ববাদের মৌলিক ভিত্তি হিসাবে মনের গভীরে গেঁথে দেওয়া হচ্ছে মনুবাদকে। এই মনুবাদী চেতনাই জাতি বিদ্বেষ, উঁচু-নিচু ভেদাভেদ, মানুষে মানুষে বিভাজনের হেতু। কিন্তু অধিকাংশ হিন্দু জানেই না যে, বিজেপি আদৌ হিন্দু রাষ্ট্র চায় না। তারা চায় মনুবাদী বা বর্ণবাদী রাষ্ট্র গড়তে। অর্থাৎ এরা দেশটাকে আবার কয়েক’শ বছর পিছিয়ে নিয়ে যেতে চায়। যেদেশে হিন্দুদের মধ্যে ফের ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র ইত্যাদি বিভাজন ফিরবে। তাই বিজেপির এজেন্ডা হল তপশিলী জাতি, উপজাতি, আদিবাসী, অনগ্রসর শ্রেণি ইত্যাদি কোটা বা সংরক্ষণ তুলে দেওয়া। অথচ এরা মুখে বলছে — এক দেশ এক আইন, এক দেশ এক ভোট ইত্যাদি।

কথাগুলো কর্ণকুহরে প্রবিষ্ট হলে শুনতে নেহাৎ মন্দ লাগে না। কিন্তু কয়েক হাজার ভাষা, কয়েক হাজার জাতি-গোষ্ঠী, কয়েক হাজার রকমের ঐতিহ্য, ইতিহাস, পরম্পরা, সংস্কৃতি নিয়ে বৈচিত্রময় ভারতই এ দেশের প্রাণবায়ু। তারা এই বৈচিত্র বা বহুত্ববাদ চায় না। তারা চায় কেবল মুনবাদী দর্শন বা মনুবাদী মতাদর্শে দেশ গড়তে। তাদের সেই স্বপ্নের দেশ চলবে গোলওয়ালকর, সাভারকর, হেডগেওয়ারদের লিখে যাওয়া নীতিমালা অনুযায়ী। আম্বেদকরের সংবিধান রিসাইকেল বিনে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। তাই তো ধাপে ধাপে সংবিধান সংশোধন করা হচ্ছে। সংবিধান থেকে ধর্মনিরপেক্ষ, সমাজতন্ত্র ইত্যাদিকে বিসর্জন দেওয়া হচ্ছে। সংবিধান সংশোধন করে নাম দেওয়া হচ্ছে সংহিতা। এভাবে হিন্দুত্ববাদী সুরসুড়ি দিয়ে মানুষকে মজিয়ে রাখা হচ্ছে। মাঝখান থেকে আদানি আম্বানির মতো নেপোর দল সব দই মেরে চলে যাচ্ছে।
এখন আরএসএস-এর শতবর্ষ চলছে। এই উপলক্ষে অভিন্ন দেওয়িনি বিধি, হিন্দু রাষ্ট্র ইত্যাদি যে গুটিকয় এজেন্ডা বাকি আছে, সেগুলো এই চার বছরে পূরণ করার লক্ষ্যে কোমর বেঁধে নেমেছে গেরুয়া ব্রিগেড। মোদী ঢাক পিটিয়ে ঘোষণা করেন বেটি বাঁচাও, বেটি পড়াও। অথচ এদেশে প্রতিদিন গড়ে কয়েক’শ নারী ধর্ষিতা হচ্ছে। সরকার আছে, পুলিশ আছে, প্রশাসন আছে, আইন আছে, আদালত আছে, জেলখানাও আছে। নেই কেবল শাস্তি। তাই ধর্ষণ বেড়েই চলেছে। সংঘ পরিবারের ঘেরাটোপে থাকা উৎকট হিন্দুত্ববাদীরা প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু, দলিত, আদিবাসীদের অপমান-অসম্মান, নির্যাতন করেই চলেছে। বিনা অপরাধে টার্গেট করে এক শ্রেণির মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হচ্ছে।
অনেক ক্ষেত্রে অত্যাচারের মাত্রা এতটাই পৈশাচিক স্তরে নামানো হচ্ছে, যা দেখে-শুনে বিবেকবান মানুষের হাড় হিম হয়ে যাচ্ছে। যারা আরো কয়েক ধাপ এগিয়ে অত্যাচারীর খড়গ কৃপাণ কেড়ে নিতে প্রতিবাদী ভূমিকা নিয়ে লেখালিখি করেছেন, বক্তৃতা করেছেন, জনমত গঠনে আন্দোলন করেছেন, তারা হয় গরাদে আছেন, নয়ত ফটো হয়ে গিয়েছেন।
মনুবাদে মনুষ্যত্ববোধ নেই। তাই আজ দেশজুড়ে দেখা যাচ্ছে মনুষ্যত্বের মন্বন্তর। হিংসা, ঘৃণা, বিদ্বেষ, বৈষম্য, অসহিষ্ণুতা — এসবই আজ দেশের অহংকারের অলংকারে পর্যবসিত হয়েছে। ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলোতে এরাই বীর দর্পে দলিত, তপশিলী, আদিবাসী মহিলাদের ধর্ষণ করে, নৃশংস কায়দায় খুন করে। পদে পদে বুঝিয়ে দেয় উঁচুজাতের পদসেবাই তাদের কর্তব্য। আর এটাই মনুবাদী দর্শনের মূল কথা। এর অন্যথা হলে নির্যাতন, নিষ্পেষণের শিকার হওয়া ভবিতব্য। সরকার পক্ষের আইনজীবী অপরাধকে আড়াল করতে হরেক কিসিমের ছলনা করেন। অগত্যা আদালত বলে, উপযুক্ত তথ্য প্রমাণের অভাবে অভিযুক্তদের বেকসুর খালাস দেওয়া হল।

অন্যদিকে উমর খালিদ, শারজিল ইমাম ও তাদের ডজন খানেক সহপাঠীর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণ না হলেও বছরের পর বছর জেলে আটকে রাখা হচ্ছে। বিজেপির কথায়, এদেরকে নাকি এভাবে ‘উচিত শিক্ষা’ দেওয়া হচ্ছে। অথচ সব তথ্য প্রমাণ থাকতেও মালেগাঁও বিস্ফোরণ মামলার মূল চক্রী স্বাধ্বী প্রজ্ঞা, কর্নেল পুরোহিত ও তাদের ঘাতক বাহিনীকে মুক্তি দিয়েছে আদালত। এরা চূড়ান্ত মানবতাবিরোধী অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে।
প্রায় দিনই ঘটছে দলিতদের ওপর অত্যাচার। তাদের নিরাপত্তা বলে কিছু নেই। বেআইনি খনন কাজের প্রতিবাদ করায় মধ্যপ্রদেশের রাম-রাজত্বে দলিত যুবকের উপর নির্মম অত্যাচার করে মুখে প্রস্রাব করে উচ্চ বর্ণের লোকেরা। মুসলিম হলে গোমাংসের অজুহাতে, অথবা জোর করে জয় শ্রীরাম বলাতে না পেরে প্রকাশ্যে বেধড়ক প্রহার করা হচ্ছে, আর সেই ভিডিয়ো সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে ত্রাস সৃষ্টি করছে গেরুয়াবাহিনী। দলিত শিশু কলের জল পান করার অপরাধে শিক্ষকের প্রহারে মারা যাচ্ছে … আরো কত কী ঘটছে নিত্যদিন। আর কেন্দ্রীয় মন্ত্রী থেকে প্রধানমন্ত্রী সবাই শ্রুতিমধুর ভাষণ দিয়ে চলেছেন। দেশ নাকি কত আগে বাড়ছে। অথচ সব আন্তর্জাতিক সূচক চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে দেশ কোথায় নামছে। তবু ওদের কাছে জল উঁচু। সত্য সেলুকাস, এদেশের কী চিত্র!








