এনআরসি, সিএএ, এসআইআর ইত্যাদির নেপথ্য রহস্য
সেখ বসির আলী
এনআরসি, সিএএ, এসআইআর ইত্যাদির মাধ্যমে দেশের মুসলমানদের ভয় দেখিয়ে দাবিয়ে রাখার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। নাগরিক অধিকার হরণের জন্য সক্রিয় রয়েছে নানা প্রশাসনিক যন্ত্র। লক্ষ্য একটাই, বর্ণবাদীদের স্বার্থ প্রজন্মের পর প্রজন্ম সুরক্ষিত রাখা। বাস্তবে মুসলমানরা কেবল বাহানা; নিশানা দেশের দলিত ও পিছিয়েপড়া শ্রেণী, যারা আসলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।
ইতিহাসের দিকে একটু ফিরে দেখা যাক। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগ হয়েছিল — এ কথা সর্বৈব সত্য। আবার এও সত্য যে, পাকিস্তান নিজেকে ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব পাকিস্তান’ ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ভারতের সামনে একই অপশন থাকা সত্ত্বেও ভারত নিজেকে ‘হিন্দু রাষ্ট্র’ ঘোষণা করেনি, বরং সংবিধান অনুযায়ী নিজেকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। ভারতও যদি পাকিস্তানের মতো রাষ্ট্রধর্ম নির্ধারণ করত, তবে এখানে একজন মুসলমানও থাকার সাহস পেত না। কিন্তু ভারত তা করেনি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, ভারত স্বেচ্ছায় নিজেকে একটি সেকুলার রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তুলেছে।
এই ধর্মনিরপেক্ষতা ও নাগরিক অধিকারের গ্যারান্টি পাওয়ায় মাওলানা আজাদ, মাদানী, বুখারী-সহ কোটি কোটি মুসলমান দেশত্যাগ করেননি। দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের সাধারণ মানুষ তখন দেশভাগের রাজনৈতিক জটিলতা বোঝার সুযোগও পাননি। তাই তারাও রয়ে গিয়েছিলেন নিজের মাটিতে।
দেশভাগ-পরবর্তী বাস্তবতা:
১৯৪৭-এর পর নানা কারণে বহু মুসলমান পাকিস্তানে চলে গেছেন বা থেকে গেছেন। আবার বহু অমুসলিম পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে এসেছেন। বিপরীতমুখী অভিবাসন ছিল খুবই সীমিত। আজ যারা মুসলমানদের সংখ্যা নিয়ে আতঙ্ক ছড়াচ্ছে, তাদের আসল উদ্দেশ্য হল নিজেদের বর্ণবাদী রাজনৈতিক স্বার্থ সুরক্ষিত করা। যদি সত্যিকার অর্থে সারাদেশে সঠিকভাবে NRC করা হয়, দেখা যাবে, পাকিস্তান থেকে ভারতে আসা মুসলমানের সংখ্যা পঞ্চাশ হাজারও নয়, অথচ কোটি কোটি হিন্দু পাকিস্তান থেকে ভারতে এসেছেন। একইভাবে, পাকিস্তানে কোটি কোটি মুসলমান আছেন, যারা ভারত ছেড়ে সেখানে গেছেন।
সমাধানের সম্ভাব্য পথ ও তার যৌক্তিকতা:
দেশভাগের সময় দুটি পথ খোলা ছিল। (১) ধর্মের ভিত্তিতে জনসংখ্যা বিনিময় (২) অথবা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র ঘোষণা করা। তদানীন্তন ভারতের কংগ্রেস সরকার দ্বিতীয় পথ বেছে নেয়নি। ফলে মুসলমানরা সেকুলার রাষ্ট্রের নাগরিক হিসেবে এদেশেই থেকে গিয়েছিলেন। কিন্তু সত্তর বছর পর এসে আবার সেই পুরোনো দাবিগুলো তোলা কতটা যৌক্তিক? এটা দেশের শান্ত পরিবেশ অশান্ত করারই প্রচেষ্টা।
অভিবাসন ও বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি:
যে কারণে কোনো ভারতীয় হিন্দু সচরাচর পাকিস্তান, বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, সৌদি আরব, তুরস্ক, মিশর বা ইন্দোনেশিয়ায় বসবাস করতে যায় না; ঠিক একই কারণে ওই দেশগুলোর মুসলমানও ভারতে এসে বসবাস করতে চায় না। যে কারণে লক্ষ লক্ষ হিন্দু বাংলাদেশ, মালয়েশিয়া বা আরব দেশগুলোতে কাজ করতে যায় এবং কর্মসূত্রে সেখানে থাকে, একই কারণে কিছু মুসলমানও ভারতে আসে এবং কাজ করে। এটাই পৃথিবীর স্বাভাবিক নিয়ম।
উপসংহার:
বাস্তবে CAA, NRC, SIR দিয়ে রাজনীতির বাজার গরম করে কিছুই অর্জন করা সম্ভব নয়। বরং এতে দেশের গরিব, অশিক্ষিত, পরিযায়ী মানুষ ও প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী আরও বড় বিপদের মুখে পড়বে। দেশের প্রকৃত শক্তি একতার মধ্যে, বিভাজনে নয়।








