মহাবিচার দিবসের পাঁচটি প্রশ্ন: উত্তর দিতে পারব তো নাকি?
বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: প্রিয় দ্বীনি ভাই ও বোনেরা, কল্পনা করুন! এমন একটি দিনের কথা, যেদিন পৃথিবীর সব কিছু চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে যাবে। আকাশ ফেটে যাবে, সূর্য মাথার কাছে নেমে আসবে, পাহাড়গুলো তুলোর মতো উড়তে থাকবে। মানুষ নগ্ন, অনাহারী, আতঙ্কিত অবস্থায় দাঁড়াবে। বাবা-মায়েরা তাদের নিজের সন্তানকে চিনবে না, স্বামী-স্ত্রী একে অপরের দিকে ফিরেও তাকাবে না। সেই দিন প্রত্যেক মানুষ চিৎকার করে বলবে, “আমার প্রাণ! আমার প্রাণ!” কিন্তু হে মানুষ! সেই দিনে কারো পালানোর জায়গা থাকবে না। আল্লাহর সামনে দাঁড়িয়ে একে একে প্রশ্ন আসবে। আর রাসূল (সা.) আমাদেরকে জানিয়েছেন: পাঁচটি প্রশ্ন ছাড়া সেদিন কেউ এক পা-ও এগোতে পারবে না।
১) জীবন কোথায় কীভাবে কাটালে? হে মানুষ! তুমি ৫০ / ৬০ / ৭০ বছর বেঁচে ছিলে। কিন্তু এই দীর্ঘ জীবনটা কোথায় গেল? কীভাবে কাটালে সেই জীবন? তুমি কি আল্লাহর ইবাদতে কাটালে? নাকি দুনিয়ার রঙিন চোখ ধাঁধানো খেল-তামাশা, গুনাহ, আড্ডা, মস্তি, মোবাইল আসক্তিতে নষ্ট করলে?
ভেবে দেখো! প্রতিটি নিঃশ্বাস হল হীরার চেয়েও দামী। কিন্তু আমরা তা অমূল্য মনে করি না। আজ যদি তোমাকে এক কোটি টাকা দেওয়া হয়, আর বলি তোমার জীবন থেকে মাত্র এক মিনিট সময় কিনব, তুমি কি বিক্রি করতে পারবে? তোমার জন্য নির্ধারিত সময় অনকে হস্তান্তর করতে বা উপহার দিতে পারবে? মোটেই না! কিন্তু বাস্তবে আমরা প্রতিদিন কোটি টাকার সমান সময় হেলাফেলায় নষ্ট করে দিচ্ছি।
২) যৌবন কোথায় অতিবাহিত করলে?
হে যুবক! আল্লাহ তোমাকে দিয়েছেন শক্তি, সাহস, উচ্ছ্বাস, চিন্তা – এসব মূল্যবান নিয়ামত কোথায় ব্যয় করলে? মসজিদে? নাকি রাতভর মোবাইল গেম, ফেসবুক, টিকটক, হারাম সম্পর্কে? আজকের যুবকরা ভাবে, আরো কিছুদিন পর থেকে নামায পড়ব। কিন্তু মনে রেখো! কবর তোমার জন্য অপেক্ষা করবে না। যৌবনের প্রতিটি মুহূর্ত কেয়ামতের দিন জবাবদিহি করতে হবে।
৩) অর্থ কোথা থেকে কীভাবে উপার্জন করলে?
মানুষের বড় গর্ব, “আমার অনেক টাকা আছে।” কিন্তু কিয়ামতের দিন আল্লাহ জিজ্ঞেস করবেন, এই টাকা কোথা থেকে এল? হালাল পরিশ্রম, ঘাম ঝরিয়ে? নাকি সুদ, ঘুষ, মিথ্যা, প্রতারণা, হারাম পন্থার মধ্য দিয়ে? ভাই সকল! যদি হারাম টাকা দিয়ে তোমার সংসার চলে, তোমার সন্তান বড় হয়, তার শরীরের প্রতিটি কোষ জাহান্নামের জ্বালানি হবে। তখন তুমি কাঁদলেও বলবে “হায় হায়!” কিন্তু তখন চোখের পানি ফেলে কোনো লাভ হবে না।
৪) টাকা কোথায় খরচ করলে?
আজকের মানুষ ফূর্তি, আমোদ, আহ্লাদ, বিলাসিতার পেছনে হাজার হাজার টাকা ফুৎকারে উড়িয়ে দেয়, কিন্তু যাকাতের সময় গুনে গুনে হিসাব করে। একটা টাকাও যেন বেশি না চলে যায়। সে ভাবে, অনেক কষ্টে উপার্জন করা মাথার গাম পায়ে ফেলে রোজগার করা তার টাকা। সুতরাং টাকার ব্যাপারে সে খুব কদর করে। নতুন মোবাইল কিনতে লাখ টাকা খরচ করি, গানি বাড়ি করতে অগুণতি টাকা দেদার খরচ করি, কিচেন-টয়লেটকে মনের মতো বানাতে কতই না ফজুল টাকা খরচ করি। অকারণে নিত্যদিন ফ্লিপকাট, অ্যামাজনে, মেশোয় কত কিছু কেনাকাটা করি। কিন্তু গরীব, দুস্থ, অসহায় ভাইকে একশো টাকা দিতে গেলে হাত কাঁপে। শাড়ি, জামা-কাপড়, ফ্যাশন, পার্টি, বিভিন্ন ডে সেলিব্রেট করতে হাজারো টাকা উড়ে যায়, কিন্তু আল্লাহর রাস্তায় দান করার সময় বলি, আমার অত টাকা নেই। রোজ রোজ কত টাকা দেব? টাকা কি গাছে ফলে নাকি? কাল কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন: “আমি তোমাকে অর্থ বা টাকা দিয়েছিলাম, ধন-সম্পদ দিয়েছিলাম, তুমি কোথায় খরচ করলে, কোথায় উড়িয়ে দিলে?”
৫) জ্ঞান অনুযায়ী কতটুকু আমল করলে?
এটাই সবচেয়ে ভয়ংকর প্রশ্ন! তুমি জানলে নামায ফরয, কিন্তু তুমি পড়লে না কেন? তুমি জানলে রিয়া হারাম, কিন্তু তুমি ছাড়লে না কেন? তুমি জানলে কুরআন জীবনবিধান, কিন্তু তুমি কেবল তাকের উপর সাজিয়ে রাখলে কেন? নিজের ভাষায় কুরআনের তরজমা তাফসীর পড়ে জীবনবিধান আল কুরআনের মানে-মতলব বোঝার চেষ্টাই করলে না। কেবল সুর করে দুলে দুলে তিলাওয়াত করে সওয়াব পেতেই ব্যস্ত হয়েছিলে। হে মানুষ! তোমার জ্ঞান তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষী হয়ে দাঁড়াবে। কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন, “তুমি জানলে, কিন্তু মানলে না কেন?”
উপসংহার: প্রিয় ভাই ও বোনেরা, কিয়ামতের দিন মহাবিচার দিবসে এই পাঁচটি প্রশ্নের জবাব থেকে কেউ পালাতে পারবে না। তুমি ধনী হও বা গরীব, ডাক্তার হও বা কৃষক, রাজা হও বা সাধারণ মানুষ, তুমি থেমে যাবে আল্লাহর সামনে। এসব প্রশ্নের সহীহ জবাব না দেওয়া পর্যন্ত তোমার এক পাও আগাবে না। আজ যদি তুমি নিজেকে সংশোধন করতে পারো, আত্মশুদ্ধি করতে পারো, তোমার জীবনকে ঠিক পথে পরিচালিত করতে পারো, যৌবনকে সঠিক পথে আনতে পারো, আয়কে হালাল করতে পারো, খরচকে আল্লাহর পথে করতে পারো, আর জ্ঞানকে আমলে রূপ দাও, সব কাজে আল্লাহকে সন্তুষ্ট করতে সচেষ্ট হও, তাওবাহ ইস্তেগফার করে আল্লাহর দিকে আজ থেকেই যদি রুজু হতে চেষ্টা করো, তাহলে কিয়ামতের দিন তোমার মুখ উজ্জ্বল হবে।
কিন্তু যদি এখনও যদি গাফিলতি করো, সব জেনেবুঝেও আল্লাহর বিধি বিধানকে অমান্য করো, তাহলে সেই দিন তোমার বুক কাঁপবে, চোখ অশ্রু ঝরাবে, তুমি চিৎকার করে বলবে,
“হায়! যদি আমি আমার জীবনের হিসাবের জন্য কিছু (নেক আমল) পাঠিয়ে রাখতাম!” (সূরা ফজর: ২৪)। তাই আসুন, এখন থেকেই প্রতিদিন নিজের কাছে প্রশ্ন করি: আমার জীবন কেমন চলছে? আমার যৌবন কিসে যাচ্ছে? আমার রোজগার হালাল তো? আমার খরচ আল্লাহর রাস্তায় দ্বীনের খিদমতের কাজে লাগছে তো? আমি যতটুকু জানি, সেই মতো আমল করছি তো? আল্লাহ আমাদের সবাইকে কেয়ামতের দিন এই প্রশ্নগুলোর সহজ জবাব দেওয়ার তাওফিক দিন।








