উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময় সামাজিকতার অঙ্গ
পাভেল আখতার
দুর্গাপূজা দুই বাংলায় ‘শারদোৎসব’ হিসেবেও চিহ্নিত। আকাশে পেঁজা কার্পাস তুলোর মতো মেঘ আর আনাচে কানাচে ফোটা গুচ্ছ গুচ্ছ শুভ্র কাশফুলের আগমনের সঙ্গে সঙ্গেই এই উৎসবের আবহ রচনা শুরু হয়ে যায়। প্রথমে আসে মহালয়া। তার কয়েকদিন পরেই আসে উৎসবের সেই আনন্দঘন মুহূর্ত। চারদিন পর অফুরন্ত আনন্দ বিজয়ার বিষাদের মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয়। চলে পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়।
এই পরিপ্রেক্ষিতে একটি বিষয়ের অবতারণা করতে হয়। মুসলিমদের একাংশের মধ্যে এখনও এই ‘দ্বিধা’ বর্তমান যে, বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময়ে তাদের অংশগ্রহণ করা উচিত কি-না। শুধু বিজয়া বলে নয়, দীপাবলি বা আরও যেসব অমুসলিম বা হিন্দু-পার্বন রয়েছে, তাদের একই ‘দ্বিধা’ সেগুলির ক্ষেত্রেও দেখা যায়। যদিও বলাই বাহুল্য যে, অনেক মুসলিমই স্বচ্ছন্দে বা সানন্দে এইসব শুভেচ্ছা বিনিময়ে অংশগ্রহণ করে থাকে। মুসলিমদের এই অংশটির ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মানুশীলনে অপূর্ণতা ও শিথিলতা আছে এবং সেজন্যেই তাদের এই শুভেচ্ছা বিনিময়ে অংশগ্রহণ বলে ‘দ্বিধান্বিত’ মুসলিমরা মনে করে থাকে। একথা ঠিক যে, বিশ্বাসের প্রতিফলন ব্যক্তির আচরণে ফুটে ওঠে। কিন্তু, উৎসবে শুভেচ্ছা বিনিময়ের সঙ্গে বিশ্বাসের দ্বান্দ্বিকতা খুঁজে পাওয়া দুর্বোধ্য।
‘ধর্ম’ বা ‘ধর্মীয় বিশ্বাস’ কোনও ঠুনকো জিনিস নয়। ধর্মের অবস্থান সত্তার গভীরে, নিহিত বিশ্বাসে। সেটা একান্ত নিভৃতির অন্তর্গত। শুভেচ্ছা বিনিময়ের মতো একটি সামাজিক বাহ্যিকতার ‘উপলক্ষ’ তাকে কীভাবে ধূসর করতে পারে? সকলের মনে রাখা উচিত, ধর্ম ও সামাজিকতার মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ফারাক আছে। এবং, সেই ফারাকটা মোটেই দ্বান্দ্বিক বা সাংঘর্ষিক নয়। ধর্ম সবসময় মানুষকে ‘সামাজিক’ হতে বলে। শুভ্র, সুন্দর প্রতিবেশিত্বের মরমী চেতনায় আলোকিত থাকতে বলে। সমাজ-বিচ্ছিন্নতার বোধ তৈরি করা কখনও কোনও ধর্মেরই অভিপ্রেত নয়। একটি মিশ্র সমাজে বসবাস করতে গিয়ে পরস্পরের সুখে ও দুঃখে, হাসি ও কান্নায়, আনন্দে ও বিষাদে কাছে আসা ও কাছে থাকা বাঞ্ছিত সামাজিকতার বা সামাজিক সৌজন্যের অঙ্গ। এর ফলে নিজের ধর্মীয় বিশ্বাস বা আত্মপরিচয়ের স্বতন্ত্র কাঠামো ‘কম্পমান’ হওয়ার কোনও পরিসর তৈরি হয় না। বরং ধর্ম যে মানুষকে সামাজিক হয়ে উঠতে বলে, এর ফলে তার গৌরবগাথাই রচিত হয়। এই আলোয় ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ – বিজয়ায় হোক, অথবা দীপাবলিতে, কিংবা অন্য কিছুতে, একজন মুসলিমের ‘ধর্মবিরোধী’ আচরণ বলে আখ্যায়িত করা অযৌক্তিক। ধর্ম ও সামাজিকতা যে দুটি পৃথক ও স্বতন্ত্র বিষয়, তা বুঝলে এই ‘দ্বিধা’র অনায়াস অবসান হয়।
একই কথা বলা যায় একজন হিন্দু বা অন্য যেকোনও ধর্মাবলম্বী সম্প্রদায়ের ক্ষেত্রেও। মুসলিমের ঈদে বা তার অন্য কোনও আনন্দের অনুষ্ঠানে তারাও অনায়াসেই এই শুভেচ্ছা বিনিময়ে অংশগ্রহণ করতে পারে, দ্বিধা ছাড়াই। বস্তুত, দুর্গাপূজা, ঈদ, বড়দিন যা-ই হোক, পারস্পরিক শুভেচ্ছা বিনিময়ে ‘দ্বিধা’ না-থাকার মধ্য দিয়ে যারা ধর্মবোধ ও সামাজিক চেতনাকে যথার্থই পৃথক পৃথক দৃষ্টিতে দেখতে সক্ষম হয়, তারা ‘সাধুবাদ’ পাওয়ারই অধিকারী। হয়ত তার্কিকে প্রশ্ন তুলবে যে, শুভেচ্ছা বিনিময়ে কি কোনও ‘মহৎ উদ্দেশ্য’ চরিতার্থ হয়? এ তো নিতান্তই একটি বাহ্যিক ব্যাপার! এর মাধ্যমে সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের ভাবধারা সত্যিই কি বিকশিত হওয়া সম্ভব?
এমন অজস্র ‘বাহ্যিকতা’র সঙ্গে আমাদের নিত্যদিনের সম্পর্ক বর্তমান। ‘ভাল থাকবেন’, ‘শ্রদ্ধা ও ভালবাসা নেবেন’, ‘আপনাকে শুভেচ্ছা জানাই’ ইত্যাদি কুশল বার্তাগুলি আমরা সবসময় আদান-প্রদান করে থাকি। কিন্তু, আপন-হৃদয়ে কখনও কি তাকিয়ে দেখেছি যে, কথাগুলিতে সত্যিই কতটা আন্তরিকতার স্পর্শ থাকে আর কতটা বাহ্যিকতার? যদি বাহ্যিক হয়ও তবুও সেখান থেকেই যে ক্রমান্বয়ে অন্তরের দিকে যাত্রা শুরু হতে পারে, সেই সম্ভাবনা কি উড়িয়ে দেওয়া যায়? কিন্তু, বিনিময়ের চর্চা থেকেই যদি দূরে থাকা হয়, তাহলে সেই সম্ভাবনাও আর থাকে না। মানুষের কাছে মানুষের পৌঁছনোর প্রত্যেকটি ‘সাঁকো’ কিংবা ‘সেতু’কেই বাঁচিয়ে রাখা, তাতে হেঁটে যাওয়া সামাজিক শুভবোধসম্পন্ন মানুষের কর্তব্য, ঠুনকো অজুহাতে দেওয়াল তোলা নয়!
যে-কোনও উৎসব মহামিলনের পটভূমি রচনা করে। ধর্মীয় দর্শন বা ভাবধারা উৎসবের মধ্যে প্রচ্ছন্ন হয়ে থাকলেও তা যখন মসজিদ, মন্দির বা গির্জার চার দেয়ালের বাইরে উন্মুক্ত বা অবারিত আবহ রচনা করে দেয় সেখান থেকেই তো বুঝতে হবে যে, এখানে ধর্ম যতটা থাকে, ঠিক ততটাই থাকে আনন্দের অনন্ত ধারা। আর, ‘আনন্দ’ জিনিসটাই তো সকলের মধ্যে বিতরিত হওয়ার জিনিস। একা একা ‘আনন্দ’ উপভোগে তার পূর্ণ দীপ্তি বা সৌন্দর্য ফুটে উঠে না। সামাজিক সত্তার, সামাজিকতার স্বতঃস্ফূর্ত স্ফুরণ একে অপরের সঙ্গে মিলিত হওয়ার, দুঃখ ও আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই নিহিত আছে।
উৎসবে পারস্পরিক ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ আঙ্গিকে ক্ষুদ্র, কিন্তু তাৎপর্যে বৃহৎ তারই অন্তর্গত একটি অনুষঙ্গ মাত্র। যত বেশি আদান-প্রদান হয় – মনের, ভাবের, অনুভূতির, অভিব্যক্তির–মোটকথা ভালবাসার, তত বেশি সম্পর্ক নিকটতর, গভীর ও দৃঢ় হয়। একথা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির ক্ষেত্রে যেমন সত্য, তেমনই সত্য সমষ্টির সঙ্গে সমষ্টির ক্ষেত্রেও। ‘শুভেচ্ছা বিনিময়’ থেকে দূরে থাকাটা তাই কোনও কাজের কথা নয়, কারও ক্ষেত্রেই!








