জন্মদিন ও আচ্ছে দিন
আজ ১৭ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির জন্ম দিন। ১৯৫০ সালের এই দিনে গুজরাটের মহেসানা জেলার বড়নগর এলাকায় তাঁর জন্ম। ক্যালেন্ডারের হিসেবে বুধবার ৭৫ বছর পূর্ণ করে ৭৬-এ পা রাখলেন তিনি। তাঁর জন্মদিনকে স্মরণীয় করে রাখতে দেশের ২৩টি বড় বড় শহরে প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে বিজেপি। এদিন মধ্যপ্রদেশে এক সরকারি অনুষ্ঠানে মান্যবর প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীর উদ্দেশ্যে বলেন, সবাই স্বদেশী পণ্য কিনুন। স্বদেশি জিনিসপত্র কেনার শপথ নিতে হবে ১৪৬ কোটি ভারতবাসীকে। স্বদেশে উৎপাদিত পণ্য ছাড়া দেশবাসী যেন বিদেশি জিনিসপত্র কেনাকাটা না করে। তাঁর নিদান মেনে এটা করতে পারলে ভারতবর্ষ হবে আত্মনির্ভরশীল এবং অক্ষরে অক্ষরে ফলবে মেক ইন ইন্ডিয়া প্রকল্প।
বিকিকিনি বিষয়ে আরো খুঁটিনাটি নিদান দিয়ে দোকানদারকে সাইনবোর্ডে লিখতে বলেন, ‘গর্ব সে কহো ইয়ে স্বদেশি হ্যায়’। তাঁর কথায়, মহাত্মা গান্ধী স্বদেশি আন্দোলন করেছিলেন দেশের স্বাধীনতার জন্য। এবার আমাদেরকে দ্বিতীয় স্বদেশি আন্দোলন করতে হবে ২০৪৭ সালে বিকশিত ভারত গড়ার লক্ষ্যে। যার পোশাকি নাম ‘আচ্ছে দিন’। তাহলে কি ২০৪৭ পর্যন্ত তিনি মসনদে থাকতে চান? সেটা হলে তখন মোদির বয়স হবে ৯৭ বছর। তখন বিকশিত ভারত কিংবা আচ্ছে দিনের রং তো ফিকে হয়ে যাবে, নাকি উজ্জ্বল যোজনা হয়েই থাকবে, তা সময়ই বলবে।
৭৫ বছর বয়স হওয়ার অপরাধে সঙ্ঘের নিয়ম দেখিয়ে আদবানি, যোশীদেরকে রাজনীতি থেকে সন্ন্যাসে পাঠিয়ে মার্গদর্শক বানিয়ে দিয়েছেন মোদি-শাহরা। আর এখন নিজেদের তৈরি নিয়ম নিজেরাই ভাঙছেন! বয়সের ব্যাপারে সংঘের পাটিগণিত মানলে তো এদিন তাঁর পদত্যাগ করার কথা ছিল। প্রসঙ্গ বদলে বলা যায়, দেশের বহু সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাই তো বিক্রি করে দিয়েছে মোদি সরকার, লাভজনক বহু সংস্থাকে রুগ্ন আখ্যা দিয়ে দুই গুজরাটি বন্ধুকে জলের দরে পাইয়ে দেওয়া হয়েছে গত ১১ বছরে। ইউরোপ, আমেরিকার সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি করতে মরিয়া কেন্দ্র সরকার। চীনা পণ্যে ছেয়ে গেছে দেশের বাজারঘাট। তথাপি প্রধানমন্ত্রী কীভাবে স্বদেশী পণ্য কেনার নিদান দিচ্ছেন! জন্মদিনে এ কি নতুন জুমলাবাজি!
বুধবার প্রধানমন্ত্রীর জন্মদিন উপলক্ষে দেশজুড়ে ‘বেকারত্ব দিবস’ পালন করেছে কংগ্রেস নেতা-কর্মীরা। বিরোধীরা মোদির জন্মদিন ঘিরে বিজেপির ব্যক্তিপুজো নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে। আবার মোদির জন্মদিনকে অরাজনৈতিক বলে রাজনৈতিক খোঁচা দিয়েছে বিজেপি। অন্যদিকে গেরুয়া শিবির যে কলকাতা-সহ দেশের দু-ডজন শহরে বিশেষ প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে, সেখানে তুলে ধরা হয়েছে কেন্দ্র সরকারের ৭৫টা সাফল্য এবং মোদির কর্মময় জীবনের নানা দিক। প্রবেশ দ্বারে বড় বড় কাটআউটে ফুটে উঠেছে বাল্যকালে নরেন্দ্রভাই দামোদর দাস মোদির হাতে চায়ের কাপ, চন্দ্রযানের ছবি, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক থেকে অপারেশন সিন্দুর, কোভিডকালে মোদী সরকারের সঙ্কট মোকাবিলার টোটকা ইত্যাদি।
গেরুয়া ব্রিগেড পাল্টা বলেছে, আজ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সাফল্যকে মানুষের সামনে তুলে ধরার দিন। কিন্তু এভাবে সরকারি জায়গায় কেন ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে এসব আয়োজন, সে প্রশ্নে সরব হয়েছে বিরোধীরা। সত্যিই তো, প্রধানমন্ত্রী তো একজন ব্যক্তি। তার জন্মদিন সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয়। সেটাকে সরকারি রূপ দেওয়া হচ্ছে কেন — এ প্রশ্ন নিশ্চিত অমূলক নয়। এর আগে কোন প্রধানমন্ত্রী এমনটা করেছেন বলে তো মনে হয় না।
ইন্দিরা আমলে জরুরি অবস্থার সময় কীভাবে উনি প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, এসবই লেখা হয়েছে হিন্দিতে। কলকাতার বুকে প্রদর্শনী হলেও কোথাও বাংলায় কিছু লেখা নেই। অগত্যা প্রশ্ন উঠছে। তৃণমূলের মুখপাত্র কুণাল ঘোষ কটাক্ষ করে বলেছেন, ‘জাদুঘরের মতো ঐতিহ্যপূর্ণ সরকারি স্থানকে অপব্যবহার করছে বিজেপি। কেন্দ্রে ক্ষমতায় আছে বলে যা ইচ্ছে তাই করছে। আসলে বিজেপি বাংলা থেকে বিদায়ের পর জাদুঘরেই স্থান পাবে, তাই আগে থেকে জায়গাটা চিহ্নিত করে নিয়েছে।’
সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম বলেছেন, ‘কলকাতা জাদুঘর সারা এশিয়ার গর্ব। এই সরকার সমস্ত প্রতিষ্ঠানকে কুক্ষিগত করার চেষ্টা করছে। নেতাজির জন্মদিন পালন করেছিল ভিক্টোরিয়া থেকে। এবার মিউজিয়ামে মোদির জন্মদিন। এরপর ধীরে ধীরে হনুমানজয়ন্তীতে চলে যাবে।’
যাহোক, রবিবার পর্যন্ত এই প্রদর্শনী চলবে। ছুটির দিন হওয়ায় অনেকেই দু-চোখ ভরে সেসব দেখার সুযোগ পাবেন। কিন্তু আচ্ছে দিন দেখতে হলে আরো ২২ বছর অপেক্ষা করতে হবে সবাইকে। তার আগে হেরে গেলে অবশ্য বিদায় নিতে হবে মোদিকে। অনেক আগেই তিনি বলে রেখেছেন, হাম তো ভিখারী আদমি, ঝোলা লেকে চাল পড়ুঙ্গা। কিন্তু দেশ ও দশের কী হবে, সে উত্তর কে দেবে বিশ্বগুরুজি?








