নতুন বয়সে পুরনো মদ
দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার নেতৃত্বে বিজেপি সরকার, রাজ্যে মদ কেনার বয়স কমাতে চাইছে। এতদিন ছিল ২৫ বছর, এবার মদ কেনার বয়সসীমা ৪ বছর কমিয়ে ২১ বছর করতে চলেছে রাজধানী সরকার। অর্থাৎ আর ২৫ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে না, ২১ বছর বয়স হলেই প্রকাশ্য দোকান থেকে মদ, বিয়ার ইত্যাদি কিনতে পারবে যুবকরা। এই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে। যদিও এই ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তা বলেছেন, এখনও সিদ্ধান্ত হয়নি, আলোচনা চলছে।
সম্প্রতি মুখ্যমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে ‘জনতার দরবার’ এক যুবক কিছু কাগজপত্র নিয়ে দাবি জানানোর অছিলায় খুব কাছে গিয়ে চড় মারে এবং চুলের মুঠি ধরে প্রহার করে শ্রীঘরে কাটাচ্ছে। পরে জানা যায়, মুখ্যমন্ত্রীকে মারধর করার নেপথ্য কারণ কারন-সুধা। পেটে রঙিন জল পড়ায় সাইড এফেক্ট ছিল ওই অনভিপ্রেত ঘটনা। যদিও সেই ঘটনা বা দুর্ঘটনা মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তার ওপর রেখাপাত করেনি। তাই তিনি এবার আরো কম বয়সিদের হাতে মদের বোতল তুলে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন। পশ্চিমবঙ্গ সরকার ‘দুয়ারে মদ’ প্রকল্পের কথা ঘোষণা করেছে অনেক আগেই। এবার দিল্লি সরকার নতুন হাতে পুরনো মদের বোতল তুলে দেওয়ার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করতে চলেছে।
প্রবাদ আছে, মদের টাকায় নাকি দেশ চলে। তাই সরকার বাহাদুরের কাছে মদ হল দুধেল গাই। তাই রাজ্যে রাজ্যে আবগারি দফতর আছে। তার মাথায় মন্ত্রী-আমলাও আছেন। যাদের কাজ হল রাজ্য তথা দেশে মদ সরবরাহ ঠিকঠাক হচ্ছে কিনা নজর রাখা, মদ বিক্রির জন্য লাইসেন্স দেওয়া, অবৈধ বা বেআইনি মদ বিক্রি হলে ধরপাকড় করা ইত্যাদি। যদিও মদের আবার বৈধ, অবৈধ কোন মানদণ্ডের নিরিখে হয়, তা বোধগম্য নয়। মনে হয় এই তত্ত্ব যেন গুয়ের এপিঠ আর ওপিঠ।
মদের কারণেই বচসা, ঝগড়া, মারামারি থেকে খুন-জখম, দাঙ্গা, পথ দুর্ঘটনা, বধূ নির্যাতন, পরকীয়া, বিবাহ বহির্ভূত যৌনাচার, ধর্ষণ ইত্যাদি যাবতীয় অনাচার, ব্যাভিচার, পাপাচার ও ফৌজদারী অপরাধ সংঘটিত হয়ে থাকে। অর্থাৎ অধিকাংশ অপরাধের মূল কারণ মদ বা মাদকদ্রব্য। তথাপি রাজ্য তথা দেশজুড়ে লাইসেন্স প্রাপ্ত মদের দোকানের সংখ্যা লাফিয়ে বাড়ছে। সংবিধানের নির্দেশমূলক নীতিমালায় মদ নিষিদ্ধের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার পর ৭৭ বছর কেটে গেলেও কোনো সরকার তা করেনি। সাফাই হল, মদ থেকে বিপুল রাজস্ব আদায় হয়। অর্থাৎ মদ হল অর্থনীতির চালিকাশক্তি। তাই মদ নিষিদ্ধ করা সম্ভব নয়। যদিও বিকল্প আয়ের কথা কোনো সরকারই ভাবেনি। অথচ মদের কারণে দেশে নিত্যদিন কত অঘটন, দুর্ঘটনা, অপরাধ ঘটে চলেছে, কত মানুষের প্রাণহানি হচ্ছে। তাতে সরকারের মাথাব্যথা বা হেলদোল নেই।
গতবছর দুর্গাপুজোয় ৩ থেকে ১৫ অক্টোবর শুধু কলকাতা শহরেই বিক্রি হয়েছিল ১৪৮ কোটি টাকার মদ। যা আগের বছরের তুলনায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি। এমনিতে পশ্চিমবঙ্গে প্রতি মাসে গড়ে ১৭০০ কোটি টাকা এবং কলকাতায় ৩০০ কোটি টাকার মদ বিক্রি হয়। সারা দেশে মাসে বিকোয় প্রায় ৫০ হাজার কোটির অমৃত সুধা। গতবছর দুর্গাপুজোয় মদ বিক্রিতে সেরা ছিল মালদা। পুজোর পাঁচ দিন শুধু এই জেলায় ৪ কোটি ১২ লক্ষ ১১ হাজার ৪১৪ টাকার দেশি ও বিদেশি মদ বিক্রি হয়।
২০২৩ সালের দুর্গাপুজোয় মদ বিক্রি থেকে রাজ্য প্রায় ৭০০ কোটি টাকা আয় করেছিল। সে বছর রাজ্যে মোট মদ বিক্রি হয় ২৩ হাজার কোটি টাকা। গত ১০ বছরে রাজ্যে মদ বিক্রি বেড়েছে প্রায় ৭-৮ গুণ। আবার হুইস্কি বিক্রিতে আমেরিকাকেও টেক্কা দিয়ে বিশ্বসেরা খেতাব পেয়েছে ভারতবর্ষ। দেশে সবথেকে বেশি মদ পান করে অরুণাচল প্রদেশের লোকেরা। এখানে ৫৩ শতাংশ মানুষ রীতিমতো মদ্যপায়ী। দ্বিতীয় তেলেঙ্গানা, ৪৪ শতাংশ। তৃতীয় সিকিম, ৪০ শতাংশ। উল্লেখ্য, দেদার মদ বিক্রি থেকে আসা বিপুল রাজস্ব দিয়ে তৈরি করা যেত বহু স্কুল, কলেজ, হাসপাতাল কিংবা এসবের পরিকাঠামোগত মানোন্নয়ন করা যেত। তা কিন্তু হচ্ছে না। এই টাকার সিংহভাগ ব্যয় হয় সরকারি মোচ্ছবে। এখন লক্ষ ডলারের প্রশ্ন হল, মদে ভেসে যাওয়া আমরা কীভাবে জগৎসভায় শ্রেষ্ঠ আসন লব?








