জ্ঞান ও কাণ্ডজ্ঞান
শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা থেকে জ্ঞান অর্জন হয়। শিক্ষা থাকলে অভিজ্ঞতা, উপলব্ধি, অনুভূতি অন্য মাত্রা পায়। জ্ঞান হয় আমাদের বাহক। সঠিক পথ দেখায় জ্ঞান। ভাল-মন্দ, ঠিক-ভুল, উচিত-অনুচিত ইত্যাদির পার্থক্য করতে শেখায় জ্ঞান। কিন্তু অর্জিত বা আহরিত জ্ঞান কেবল আত্মকেন্দ্রিক না হয়ে বরং তা হওয়া উচিত সামাজিক উন্নয়ন ও মানব কল্যাণের হাতিয়ার। সময়ের সঙ্গে আমাদের সমাজে শিক্ষিত ও জ্ঞানী মানুষের সংখ্যা বাড়লেও সেই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে না নৈতিকতা, মানবিকতা, সহানুভূতি, পরোপকারিতা, সহিষ্ণুতা ইত্যাদি।
জ্ঞান যদি উপকারী বা উপাদেয় না হয়, তাহলে সেই ব্যক্তি যতই জ্ঞানের ভান্ডার হন না কেন, তাতে মানুষ বা সমাজের কোনো কল্যাণ সাধিত হয় না। জ্ঞান যদি মানুষকে বিবেচক না করে, মানবিক না করে, তাহলে সেই জ্ঞান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির জ্ঞানের বহর বা পরিধি বাড়ালেও সত্যিকার অর্থে তাকে জ্ঞানী করতে পারেনি। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মানুষ ক্রমেই যন্ত্র হয়ে উঠছে। অনুভূতিগুলো হ্রাস পাচ্ছে। অন্যের বিপদকে আপদ বলে মনে করি। অসহায় মানুষের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারি না। প্রয়োজনে মানুষের পাশে দাঁড়াতে বা সাধ্যমতো সাহায্যের হাত বাড়াতে মন চায় না।
কিন্তু আমরা অপরকে জ্ঞান দিতে খুব ভালবাসি। যেভাবে উপদেশ দিতে ওস্তাদ। কিন্তু সেই জ্ঞান নিজের জীবনে বা নিজের কাজে-কর্মে প্রয়োগ করি না। কারো উন্নতি হোক, কারো কল্যাণ হোক, বা কেউ বড় হোক, বা উপরে উঠুক – এসব আমরা খুব একটা সহ্য করতে পারি না। প্রশ্ন হল, এই জ্ঞান কি আমরা পড়াশোনা করে অর্জন করেছি? এর জন্য তো এত পড়াশোনা না করলেও হত। অশিক্ষিত বা মূর্খদেরও এই বিদ্যেটুকু থাকে। তাহলে আমরা পড়াশোনা করে কোন জ্ঞান অর্জন করলাম? সেই জ্ঞান কোথায় কীভাবে কাজে লাগাচ্ছি?
এর উত্তর পেতে খুব বেশি গবেষণা করতে হবে না, প্রশ্নগুলোর মধ্যে জটিল দার্শনিক তত্ত্বও লুকিয়ে নেই, তাই আমাদেরকে তাত্ত্বিক বা চিন্তক হওয়ারও প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন শুধু কাণ্ডজ্ঞান। বিবেক জাগ্রত থাকলে, ধরা পড়বে হেতু। ভবিতব্য জানতে পারব। পরিণতি বোধগম্য হবে। কিন্তু ডিজিটাল যুগে আমরাও ফাইভ-জি হয়ে গেছি। এখন আমাদের মন মস্তিষ্ক মগজ সবই হয়ে গেছে সুপার কম্পিউটার। আর বিবেক-বুদ্ধিকে পরিচালনা করছে এআই। প্রত্যক্ষ না হলেও পরোক্ষে হচ্ছে, অনেকখানি আমাদের অজান্তেই এসব হচ্ছে। আমরা ক্রমেই আপাদমস্তক যান্ত্রিক হয়ে উঠছি। আমাদের চিন্তা, ভাবনা, অনুভূতি, উপলব্ধি, সিদ্ধান্ত সব কিছুতেই অন্য কিছুর ছোঁয়া থাকছে। ফলে রক্ত-মাংসের মানুষ হলেও আমরা জড়বুদ্ধির হয়ে যাচ্ছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি-বিপ্লবের প্রভাব আমাদের সব অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের ওপরেই কমবেশি পড়ছে। এই নির্ভরতা অনেক ক্ষেত্রে আমাদের কাজ সহজ করে দেয়, সময় বাঁচায় – একথা সত্যি। কিন্তু আমাদের ভিতরের মানুষটাকে এরা বাঁচাতে পারছে না, বরং ক্রমেই তাকে কুৎসিত কদাকার করে দিচ্ছে।
আর আমাদের সৃজনশীলতা, সংবেদনশীলতার হানি করছে। আত্মিক সম্পর্কে দূরত্ব ক্রমেই বাড়ছে। সব জেনেবুঝেও এসব নিয়ে ভাবনা চিন্তা বা আত্মবিশ্লেষণ করার তাগিদ নেই, অবকাশও নেই। এই অগ্রগতির অভিমুখ কোনদিকে – সে নিয়ে চর্চা করা মানে যেন কল্পনা বিলাসিতা। বিজ্ঞান, প্রযুক্তির অগ্রগতি আমাদের কতটা মানবিক করছে? সে প্রশ্ন আমাদের রোজকার সিলেবাসে নেই। তাই আত্মজিজ্ঞাসা, আত্মবিশ্লেষণ, আত্মপর্যালোচনা কিংবা আত্মশুদ্ধির লেশমাত্র নেই। কারণ, আমরা সবাই জ্ঞানী। কেউ কেউ পণ্ডিত। কেউ কেউ আবার জ্ঞানপাপী। কিন্তু এত রকমের জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আমাদের কাণ্ডজ্ঞান নেই। তাই ক্ষেত্র বিশেষে প্রয়োজনে নিজেকে কিছুটা হয়ত এডিট করছি, কিয়দংশ ডিলিট করছি, কিন্তু আপডেট করছি না।
জীবনযাপনকে বলছি লাইফ স্টাইল। অনুভূতি হয়ে যাচ্ছে সীমিত, সহানুভূতি হারাচ্ছে প্রাসঙ্গিকতা, মানবিকতা ও নৈতিকতা হয়ে যাচ্ছে মেকী। আমাদের সহানুভূতি, সমবেদনা, সহমর্মিতা নেতিবাচক আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছে। আসলে আমাদের সার্কিট নষ্ট হয়ে গেছে। তাই মনুষ্যত্বের মন্বন্তর প্রকট।








