জহর সরকার, নজরুল ইসলাম, অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়রা বার্নি স্যান্ডার্স হওয়ার চেষ্টা করতে পারতেন
নবিউল ইসলাম: গণতন্ত্রে একজন মানুষের ভূমিকা কতখানি? একজন সৎ, আদর্শবাদী এবং জনকল্যাণে নিবেদিত ব্যক্তি কি একাই সমাজের পরিবর্তন ঘটাতে পারেন, নাকি সেই পরিবর্তনকে বাস্তবে রূপ দিতে রাজনৈতিক দলের সমর্থন ও সংগঠন অপরিহার্য? পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই প্রশ্ন অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কারণ, মানুষের মধ্যে আজও এমন নেতৃত্বের আকাঙ্ক্ষা রয়েছে, যিনি দলীয় সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে উঠে সাধারণ মানুষের কথা বলবেন, সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে দাঁড়াবেন এবং ক্ষমতার কেন্দ্রকে জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য করবেন। বর্তমান বিশ্বে যে ক’জন বিখ্যাত রাজনীতিবিদ আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন বার্নি স্যান্ডার্স তাঁদের অন্যতম। এখন ৮৩ বছর বয়স। ছাত্র-জীবনে কার্ল মার্কসের দর্শনের প্রতি আকৃষ্ট হন। আমেরিকায় কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ বলে কোনপ্রকার কমিউনিস্ট সংগঠন তৈরি করা সম্ভব হয়নি। কিন্তু মার্কসীয় দর্শনকে মন থেকে সরিয়ে রাখতেও পারেননি। শ্রমজীবী মানুষের পক্ষে, নাগরিকদের সমানাধিকারে পক্ষে, যেকোন ধর্মীয় বিদ্বেষের বিরুদ্ধে কাজ করে যাচ্ছেন। বার্নি স্যান্ডার্স নিজেকে ‘গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রী’ বলে পরিচয় দিতে স্বচ্ছন্দ বোধ করেন। নিজে ধর্মে ইহুদী, ফিলিস্তিনের পক্ষে মিছিলে হাঁটেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন, ইরাক ও আফগানিস্তান যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন। আমেরিকার বিশাল অংশের মানুষের কাছে তাঁর কাজের জন্য জনপ্রিয় হয়ে আছেন।

বার্নি স্যান্ডার্স প্রমাণ করেছেন, একজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন ধরে জনগণের স্বার্থে ধারাবাহিকভাবে লড়াই করলে এবং একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক দর্শনের প্রতিনিধিত্ব করলে তিনি প্রচলিত রাজনৈতিক কাঠামোর মধ্যেও একটি স্বতন্ত্র অবস্থান তৈরি করতে পারেন। কিন্তু একই সঙ্গে তাঁর জীবন আরেকটি সত্যও সামনে আনে — ব্যক্তি যতই জনপ্রিয় হোন না কেন, গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হলে কোনো না কোনো রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন হয়। বার্নি স্যান্ডার্সের জনপ্রিয়তার মূল ভিত্তি ছিল তাঁর ধারাবাহিকতা। তিনি ক্ষমতা অর্জনের জন্য আদর্শ বদলাননি; বরং আদর্শের কারণেই মানুষের আস্থা অর্জন করেছিলেন। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষার অধিকার, শ্রমিকের মর্যাদা, অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাস এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের প্রশ্নে তিনি কয়েক দশক ধরে একই অবস্থানে থেকেছেন। ফলে তিনি শুধু একজন রাজনীতিক নন, একটি রাজনৈতিক ধারণার প্রতীক হয়ে উঠেছেন। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক পরিসরে তাকালে দেখা যায়, এখানে বহু জনপ্রিয় নেতা তৈরি হয়েছে। কিন্তু তাঁদের অধিকাংশই শক্তিশালী রাজনৈতিক সংগঠনের মাধ্যমে উঠে এসেছেন। জ্যোতি বসু, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কিংবা অন্যান্য প্রভাবশালী নেতাদের রাজনৈতিক শক্তির পেছনে ছিল সংগঠিত দলীয় কাঠামো। ব্যক্তি নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেই নেতৃত্বকে কার্যকর করার জন্য দল ছিল অপরিহার্য। এই প্রেক্ষাপটে একটি আকর্ষণীয় প্রশ্ন উঠে আসে। পশ্চিমবঙ্গে কি এমন কিছু ব্যক্তি ছিলেন বা আছেন, যাঁরা বার্নি স্যান্ডার্সের মতো এক ধরনের নৈতিক ও জনমুখী রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতীক হতে পারতেন? এই আলোচনায় তিনটি নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য — জহর সরকার, অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস ড. নজরুল ইসলাম এবং অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়।

জহর সরকার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে সক্রিয় ভূমিকা এবং বিভিন্ন নীতিগত প্রশ্নে স্পষ্ট অবস্থানের কারণে একটি স্বতন্ত্র জনপরিচিতি গড়ে তুলেছেন। প্রশাসনের ভেতর থেকে রাষ্ট্রের কার্যপ্রণালী সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। তিনি জনজীবনের নানা বিষয়ে নির্ভীক মতামত প্রকাশ করেছেন। ফলে তিনি এমন একজন ব্যক্তি, যাঁকে অনেকে বিকল্প রাজনৈতিক কণ্ঠস্বর হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত আইপিএস ড. নজরুল ইসলামের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সম্ভাবনা দেখা যায়। দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা, সমাজ-রাজনীতি নিয়ে তাঁর লেখালেখি এবং জনস্বার্থের বিভিন্ন প্রশ্নে সক্রিয় অবস্থান তাঁকে একটি আলাদা গ্রহণযোগ্যতা দিয়েছে। একজন পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে তিনি প্রশাসনের বাস্তব চিত্র দেখেছেন, আবার একজন লেখক ও চিন্তাবিদ হিসেবে সেই অভিজ্ঞতাকে জনপরিসরে তুলে ধরেছেন। ফলে তিনি কেবল প্রশাসনিক কর্মকর্তা নন; বরং জনজীবনের নানা প্রশ্নে হস্তক্ষেপকারী একজন বুদ্ধিজীবী হিসেবেও পরিচিতি লাভ করেছেন। অন্যদিকে, বিচারপতি অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের জনপ্রিয়তা গড়ে উঠেছে মূলত দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাঁর দৃঢ় অবস্থানের কারণে। বিচারপতি হিসেবে বিভিন্ন আলোচিত মামলায় তাঁর ভূমিকা তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত করে তোলে। অনেকের কাছে তিনি প্রতিষ্ঠানের ভেতরে থেকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে আবির্ভূত হন। ফলে তাঁর রাজনৈতিক সম্ভাবনা নিয়েও ব্যাপক আলোচনা তৈরি হয়।
তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। জনপ্রিয়তা কি রাজনৈতিক নেতৃত্বের সমার্থক? উত্তর হল — না। বার্নি স্যান্ডার্সের শক্তি ছিল কেবল ব্যক্তিগত সততা নয়; তাঁর শক্তি ছিল একটি সামাজিক আন্দোলনের প্রতিনিধিত্ব করা। তাঁর পেছনে ছিল সংগঠিত সমর্থকগোষ্ঠী, শ্রমিক সংগঠন, ছাত্র আন্দোলন এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক কর্মসূচি। পশ্চিমবঙ্গে জহর সরকার, ড. নজরুল ইসলাম বা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় — প্রত্যেকেই ব্যক্তিগতভাবে সম্মানিত এবং প্রভাবশালী হতে পারেন, কিন্তু তাঁদের কেউই এখনও একটি বৃহৎ, সুসংগঠিত ও দীর্ঘস্থায়ী গণআন্দোলনের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠেননি। এখানেই রাজনৈতিক দলের গুরুত্ব সামনে আসে। অনেকেই মনে করেন, একজন সৎ মানুষ রাজনীতিতে এলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। কিন্তু বাস্তবতা অনেক বেশি জটিল। একজন ব্যক্তি হয়ত কয়েকশো বা কয়েক হাজার মানুষের পাশে দাঁড়াতে পারেন। কিন্তু শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, কৃষি, শিল্প বা সামাজিক নিরাপত্তার মতো বৃহৎ প্রশ্নে কাজ করতে গেলে প্রশাসনিক ক্ষমতা দরকার। আর সেই ক্ষমতার প্রধান পথ রাজনৈতিক দল।

প্রখ্যাত রাজনৈতিক বিজ্ঞানী ই.ই. শ্যাটসনাইডার মনে করেন, “আধুনিক গণতন্ত্রকে রাজনৈতিক দল ছাড়া কল্পনা করা যায় না।”কারণ, দলই জনগণের দাবি ও রাষ্ট্রক্ষমতার মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে। দল ছাড়া ব্যক্তির ভাবনা প্রায়শই ব্যক্তিগত অবস্থান হিসেবেই থেকে যায়; দল সেই ভাবনাকে নীতিতে, কর্মসূচিতে এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে রূপান্তরিত করে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি বৈশিষ্ট্য হল, এখানে সংগঠনের ভূমিকা ঐতিহাসিকভাবে অত্যন্ত শক্তিশালী। স্বাধীনতা আন্দোলন থেকে শুরু করে খাদ্য আন্দোলন, নকশালবাড়ি, বামপন্থী উত্থান কিংবা তৃণমূল কংগ্রেসের বিকাশ — সব ক্ষেত্রেই দেখা গেছে, সংগঠন ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক সাফল্য সম্ভব হয়নি। তাই জহর সরকার, ড. নজরুল ইসলাম বা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বরা যদি জনস্বার্থভিত্তিক একটি নতুন রাজনৈতিক ধারার নেতৃত্ব দিতে চাইতেন, তাহলে তাঁদেরও শেষ পর্যন্ত একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম, সংগঠন এবং গণভিত্তি গড়ে তুলতে হত। শুধু ব্যক্তিগত সততা বা জনপ্রিয়তা দিয়ে বৃহৎ রাজনৈতিক পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়।
অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে, ব্যক্তি গুরুত্বহীন। ইতিহাস দেখায়, বড় পরিবর্তন প্রায়শই একজন মানুষের স্বপ্ন, সাহস এবং উদ্যোগ থেকেই শুরু হয়েছে। কিন্তু সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিয়েছে সংগঠন। ব্যক্তি দিকনির্দেশনা দেন, দল সেই দিকনির্দেশনাকে সামাজিক শক্তিতে পরিণত করে। আজকের পশ্চিমবঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থার সংকট নিয়ে নানা আলোচনা রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে অনেকেই দলনিরপেক্ষ, নৈতিক এবং জনমুখী নেতৃত্বের সন্ধান করেন। জহর সরকার, ড. নজরুল ইসলাম বা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায়ের মতো ব্যক্তিত্বদের ঘিরে আগ্রহের কারণও সেখানেই। তাঁরা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থার বাইরে থেকে উঠে আসা কণ্ঠস্বর হিসেবে অনেকের কাছে গ্রহণযোগ্যতা পেয়েছেন। কিন্তু গণতন্ত্রের বাস্তবতা হল, শেষ পর্যন্ত জনগণের জন্য কাজ করতে হলে রাজনৈতিক সংগঠনের প্রয়োজন হয়। কারণ, রাজনীতি কেবল বক্তব্য বা জনপ্রিয়তার বিষয় নয়; এটি নীতি প্রণয়ন, প্রশাসন পরিচালনা এবং সামাজিক সম্পদের বণ্টনের প্রশ্নও। সুতরাং পশ্চিমবঙ্গে একজন ‘বার্নি স্যান্ডার্স’তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু তিনি কোনো একক ব্যক্তির জাদুতে তৈরি হবেন না। তাঁর প্রয়োজন হবে সুস্পষ্ট আদর্শ, দীর্ঘ সামাজিক সংগ্রাম, জনআন্দোলনের ভিত্তি এবং একটি কার্যকর রাজনৈতিক সংগঠন। জহর সরকার, ড. নজরুল ইসলাম কিংবা অভিজিৎ গঙ্গোপাধ্যায় — প্রত্যেকের মধ্যেই সেই সম্ভাবনার কিছু উপাদান দেখা যেতে পারে। কিন্তু সম্ভাবনা আর বাস্তবতার মধ্যে যে সেতু রয়েছে, তার নাম সংগঠন। গণতন্ত্রে ব্যক্তি এবং দল একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং পরিপূরক। ব্যক্তি স্বপ্ন দেখান, দল সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেয়। আর জনগণই শেষ পর্যন্ত নির্ধারণ করেন কোন স্বপ্ন তাঁদের ভবিষ্যৎ নির্মাণের জন্য সবচেয়ে উপযোগী।








