স্বাধীনতা সংগ্রামী আবুল হাশিম এক বিস্মৃত জননেতার জীবন-সংগ্রাম
পাশারুল আলম
ভারতীয় উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে অনেক নেতার নাম সোনার অক্ষরে লেখা আছে, কিন্তু কিছু মহান ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, যাঁদের অবদান প্রায়শই ছায়ায় থেকে যায়। আবুল হাশিম এমনই একজন অসাধারণ রাজনৈতিক চিন্তক ও সংগ্রামী, যিনি অবিভক্ত বাংলার মুসলিম রাজনীতিকে প্রগতিশীল দিকনির্দেশ দিয়েছিলেন এবং গণমানুষের অধিকারের জন্য নিরলস লড়াই করেছিলেন। তাঁর জীবন ছিল সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে অটল অবস্থান, সমাজতান্ত্রিক চেতনা এবং হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের স্বপ্নের এক অসাধারণ উদাহরণ। আজকের বিভাজনমুখী রাজনীতির যুগে আবুল হাশিমের চিন্তাধারা আরও প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, সত্যিকারের মুক্তি আসবে শুধুমাত্র সহাবস্থান ও ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গঠনের মাধ্যমে।
প্রারম্ভিক জীবন ও শিক্ষা:
আবুল হাশিমের জন্ম ১৯০৫ সালের ২৭ জানুয়ারি বর্ধমান জেলার কাশিয়াড়া গ্রামে। তাঁর পিতা আবুল কাসেম (১৮৭২-১৯৩৬) ছিলেন বর্ধমানের একজন প্রখ্যাত সমাজসেবী ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, যিনি মুসলিম লীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও আবুল হাশিমের মনে শৈশব থেকেই মানবতাবাদ, সমতা ও ন্যায়ের প্রতি গভীর আকর্ষণ জন্মায়। তিনি বর্ধমান মিউনিসিপ্যাল হাই স্কুল থেকে ১৯২২ সালে ম্যাট্রিক পাস করেন, তারপর বর্ধমান রাজ কলেজ থেকে ১৯২৮ সালে স্নাতক হন। ১৯৩১ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ডিগ্রি নিয়ে বর্ধমান জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে যোগ দেন। ছাত্রজীবনে তিনি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাধারা ও রাজনৈতিক তত্ত্বের প্রতি আকৃষ্ট হন, যা তাঁকে ভবিষ্যতের এক প্রখর চিন্তাবিদ হিসেবে গড়ে তোলে।
রাজনৈতিক জীবনে প্রবেশ:
পারিবারিক ঐতিহ্য অনুসরণ করে ১৯৩৬ সালে আবুল হাশিম বাংলা আইনসভায় বর্ধমান থেকে নির্বাচিত হন। পরবর্তীকালে তিনি মুসলিম লীগে যোগ দেন এবং দ্রুত উন্নতি করেন। ১৯৩৮ সালে এলাহাবাদে এবং ১৯৪০ সালে লাহোরে অল ইন্ডিয়া মুসলিম লীগের সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। বর্ধমান মুসলিম লীগের সভাপতি হিসেবে তাঁর নেতৃত্বে সংগঠনটি শক্তিশালী হয়। ১৯৪৩ সালের নভেম্বরে তিনি বাংলা প্রাদেশিক মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন এবং ফেব্রুয়ারি ১৯৪৭ পর্যন্ত এই পদে থাকেন। তাঁর নেতৃত্বে লীগ একটি গণভিত্তিক দলে পরিণত হয়, যেখানে তিনি মিলিয়নেরও বেশি সদস্য সংগ্রহ করেন। তাঁর রাজনীতি ছিল সাম্প্রদায়িকতার ঊর্ধ্বে — তিনি মুসলমান সমাজকে আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের দিকে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন, ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র না করে। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে লীগের সাফল্যে তাঁর ভূমিকা ছিল অপরিসীম।

দেশভাগের প্রাক্কালে ঐতিহাসিক ভূমিকা:
১৯৪৭ সালের শুরুতে যখন উপমহাদেশে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের আগুন জ্বলছিল, তখন আবুল হাশিম ‘ইউনাইটেড বেঙ্গল’ বা অবিভক্ত স্বাধীন বাংলার অন্যতম প্রধান স্থপতি ছিলেন। শরৎচন্দ্র বসু, হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী এবং অন্যান্য নেতাদের সঙ্গে মিলে তিনি একটি অ-সাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক ও স্বতন্ত্র বাংলা রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। তাঁর মতে, বাংলার শক্তি নিহিত রয়েছে হিন্দু-মুসলমানের সহাবস্থানে। তিনি ‘বাঙ্গালিস্তান’ ধারণা প্রচার করেন, যা একটি জাতীয়তাবাদী বাংলা রাষ্ট্রের কল্পনা করেছিল। কিন্তু কংগ্রেসের সংশয়, মুসলিম লীগের কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের অনমনীয়তা এবং ব্রিটিশ কূটনীতির কারণে এই পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়। দেশভাগের পর তিনি পশ্চিমবঙ্গ আইনসভায় বিরোধী দলের সংসদীয় নেতা নির্বাচিত হন।
দেশ ভাগোত্তর জীবন; নতুন সংগ্রাম:
১৯৪৭-এর দেশভাগের পর আবুল হাশিম প্রথমে পশ্চিমবঙ্গে থাকেন, কিন্তু ১৯৫০ সালে পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) চলে যান এবং ঢাকায় বসবাস শুরু করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রের একনায়কতান্ত্রিক চরিত্র, পশ্চিম পাকিস্তানকেন্দ্রিক অর্থনীতি এবং সাংস্কৃতিক দমন তাঁকে গভীরভাবে মর্মাহত করে। তিনি ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলির প্রতি হতাশ হয়ে ১৯৫২ সালে তিনি ‘খিলাফত-ই-রব্বানী পার্টি’ গঠন করেন, যা ইসলামী রাজনৈতিক আদর্শ প্রচারের লক্ষ্যে গঠিত হয় এবং ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত তিনি এর সভাপতি ছিলেন। তাঁর রাজনীতি ছিল ইসলামী সমাজতন্ত্রের প্রতি আকৃষ্ট — শ্রেণিহীন সমাজ, শোষণমুক্তি এবং মানুষের মৌলিক অধিকারের উপর জোর দিতেন।

চিন্তক ও লেখক আবুল হাশিম:
আবুল হাশিম শুধু রাজনীতিবিদ নন, একজন গভীর দার্শনিক ও লেখক ছিলেন। ১৯৪০-এর দশকের শেষভাগ থেকে তাঁর দৃষ্টিশক্তি হারাতে শুরু করে এবং ১৯৫০-এর দশকে তিনি সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যান। তবু তাঁর বুদ্ধিবৃত্তিক কার্যকলাপ অব্যাহত থাকে। ১৯৬০ সালে তিনি ইসলামিক অ্যাকাডেমির প্রথম পরিচালক নিযুক্ত হন। তাঁর রচনাগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘The creed of Islam’, ‘In retrospect’, ‘Let us go to war’ এবং ‘As I see It’ — এই রচনাগুলিতে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা, শ্রেণিভিত্তিক শোষণের নিন্দা, সমাজতান্ত্রিক চেতনা এবং মানবমুক্তির দাবি উঠে এসেছে। তাঁর চিন্তাধারা ছিল ডি-কোলোনিয়ালিজম বা ঔপনিবেশিক শোষণ থেকে মানুষকে মুক্ত করার লক্ষ্যে।
ব্যক্তিত্ব ও আদর্শ:
আবুল হাশিমের ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ; ধর্মপ্রাণ কিন্তু ধর্মকে রাজনৈতিক অস্ত্র করার বিরোধী; মুসলিম লীগের নেতা, কিন্তু সাম্প্রদায়িকতার সমালোচক; পাকিস্তানের সমর্থক, কিন্তু তার অভ্যন্তরীণ বৈষম্যের কড়া বিরোধী। তিনি বিশ্বাস করতেন, রাজনীতির লক্ষ্য হওয়া উচিত মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সম্প্রীতি। তাঁর আদর্শ ছিল সাম্য, ন্যায় ও মানবিকতা।
শেষ জীবন ও প্রয়াণ:
দীর্ঘ সংগ্রাম, দাঙ্গার বিভীষিকা এবং রাষ্ট্রীয় চাপ তাঁর স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে। অন্ধত্ব সত্ত্বেও তিনি সক্রিয় ছিলেন, কিন্তু শেষদিকে জনজীবন থেকে সরে আসেন। ১৯৭৪ সালের ৫ অক্টোবর তিনি প্রয়াত হন। জীবদ্দশায় তিনি যথাযথ স্বীকৃতি পাননি, কিন্তু তাঁর ত্যাগ আজও অনুপ্রেরণা।
পরিশেষে বলা যায়, আজকের বাংলাদেশ ও ভারতের সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আবুল হাশিমকে স্মরণ করা অত্যন্ত জরুরি। তাঁর স্বপ্ন ছিল একটি ঐক্যবদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক বাংলা, যেখানে বিভাজন নয়, সহাবস্থানই মূলমন্ত্র। তাঁর জীবন আমাদের শেখায়, সত্যিকারের নেতৃত্ব ক্ষমতার জন্য নয়, জনস্বার্থের জন্য। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাঁর চিন্তাধারা অনুসরণ করে এক বৈষম্যহীন আদর্শ ও সুসংহত সমাজ গড়ে তোলার অনুপ্রেরণা নিতে হবে।








