সংবিধান সম্পর্কে কিছু সাধারণ কথা
মজিবুর রহমান
সংবিধান (কনস্টিটিউশন) হল একটি দেশের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার জন্য নিয়ম-কানুন ও বিধি-বিধানের সমষ্টি। সকল ফৌজদারি অথবা দেওয়ানী আইনকে সংবিধানের অনুসারী হতে হয়। কোনো সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক সংস্থা বা সংগঠনের নিয়মাবলী সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে না। কোনো জাত বা সম্প্রদায়ের ধর্মীয় অনুশাসনও দেশের সংবিধানের পরিপন্থী হওয়া সম্ভব নয়। পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে সুলিখিত ও সুনির্দিষ্ট সংবিধান গ্রন্থ থাকলেও ব্রিটেন, ইসরাইল ও নিউজিল্যান্ডের মতো কিছু দেশে কোনো একক সম্পূর্ণ সংবিধান নেই। এই দেশগুলোর শাসনব্যবস্থা বিভিন্ন আইন, আদালতের রায় ও প্রচলিত রীতিনীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট রিচার্ড অ্যাটলি ১৯৪৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঘোষণা করেন, ১৯৪৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে ভারতীয় নেতৃবৃন্দের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। এবং এ বিষয়ে আলোচনা করার জন্য তিন ব্রিটিশ মন্ত্রী লর্ড পেথিক লরেন্স, স্যার স্ট্যাফোর্ড ক্রিপস ও এভি আলেকজান্ডারকে নিয়ে গঠিত ক্যাবিনেট মিশন ১৯৪৬ সালের ২৪ মার্চ ভারতে আসে। ক্যাবিনেট মিশন ভারতের সংবিধান রচনা করার জন্য একটি সংবিধানসভা বা গণপরিষদ (কনস্টিটুয়েন্ট অ্যাসেম্বলি) গঠনের প্রস্তাব করে। সংবিধানসভার মোট সদস্য সংখ্যা ঠিক হয় ৩৮৯। এর মধ্যে প্রাদেশিক আইনসভা থেকে ২৯৬ জন ও দেশীয় বা করদ রাজ্য (প্রিন্সলি স্টেট) থেকে ৯৩ জন। জুলাই-আগস্ট মাসে গণপরিষদ গঠন সম্পন্ন হয়। ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট দেশভাগ ও স্বাধীনতার পর ভারতে গণপরিষদের সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ২৯৯; প্রাদেশিক প্রতিনিধি ২২৯ ও দেশীয় প্রতিনিধি ৭০জন।
১৯৪৬ সালের ৯ ডিসেম্বর গণপরিষদের প্রবীণতম সদস্য সচ্চিদানন্দ সিনহার (১৮৭১-১৯৫০) সভাপতিত্বে গণপরিষদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়। ১১ ডিসেম্বর স্থায়ী সভাপতি বা রাষ্ট্রপতি (প্রেসিডেন্ট) নির্বাচিত হন ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ (১৮৮৪-১৯৬৩)। সাংবিধানিক উপদেষ্টা নিযুক্ত হন বি.এন রাউ (১৮৮৭-১৯৫৩)। ১৩ ডিসেম্বর পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু (১৮৮৯-১৯৬৪) ‘উদ্দেশ্যমূলক প্রস্তাব’ (অবজেক্টিভ রেজোল্যুশন) পেশ করেন। ১৯৪৭ সালের ২২ জানুয়ারি প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিতে গৃহীত হয় এবং পরবর্তীতে সংবিধানের প্রস্তাবনা (প্রিয়েম্বল) হিসেবে যুক্ত হয়। প্রস্তাবনা হল বৃহৎ সংবিধানের একটি সংক্ষিপ্তসার।

১৯৪৭ সালের ১৫ আগস্ট স্বাধীনতা লাভের দিন থেকে সংবিধানসভা ভারতের সংসদ (পার্লামেন্ট) হিসেবেও কাজ করতে শুরু করে। সংসদের কাজ পরিচালনা করার জন্য জি.ভি মবলঙ্কর স্পিকার নির্বাচিত হন।
সংবিধান প্রণয়নের বিভিন্ন কাজ পরিচালনার জন্য গণপরিষদ ২২টি কমিটি গঠন করে। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল খসড়া প্রণয়ন (ড্রাফটিং) কমিটি, যা গঠন করা হয় ১৯৪৭ সালের ২৯ আগস্ট। সাত সদস্যবিশিষ্ট এই কমিটির সভাপতি হন ভারত সরকারের তৎকালীন আইনমন্ত্রী ড. বি.আর আম্বেদকর (১৮৯১-১৯৫৬)। কমিটির বাকি ছয়জন ছিলেন কে.এম মুন্সি, বি.এল মিটার, ডি.পি খৈতান, এন গোপালস্বামী আয়েঙ্গার, আল্লাদি কৃষ্ণস্বামী আয়ার ও মোহাম্মদ সাদুল্লাহ। খসড়া কমিটি প্রতিবেদন পেশ করে ১৯৪৮ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি। খসড়া প্রতিবেদনের প্রতিটি বিষয় নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বহু সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপিত এবং বেশ কিছু গৃহীত হয়। শেষমেশ, ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর গণপরিষদে ৩৯৫টি ধারা (আর্টিকেল), ৮টি তফসিল ও ২২টি অংশ (পার্ট) সংবলিত সংবিধান চূড়ান্ত করা হয় এবং তাতে স্বাক্ষর করেন সভাপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ। গণপরিষদের অন্যান্য সদস্যরা স্বাক্ষর করেন ১৯৫০ সালের ২৪ জানুয়ারি। সংবিধান পুরোপুরি কার্যকর হয় ১৯৫০ এর ২৬ জানুয়ারি থেকে। ১৯৫১ সাল থেকে ২৬ জানুয়ারি প্রজাতন্ত্র বা সাধারণতন্ত্র হিসেবে উদযাপন করা হয়। কিন্তু ১৯৩০ থেকে ১৯৪৭ পর্যন্ত পরাধীন ভারতে ২৬ জানুয়ারি স্বাধীনতা দিবস হিসেবে উদযাপন করা হত। ২০১৫ সাল থেকে ২৬ নভেম্বর সংবিধান দিবস বা জাতীয় আইন দিবস হিসেবে উদযাপন করা হচ্ছে।
সংবিধানের প্রস্তাবনায় ২৬.১১.১৯৪৯ তারিখটির উল্লেখ রয়েছে- “আমরা ভারতের জনগণ, ভারতকে একটি সার্বভৌম, সমাজতান্ত্রিক, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক, সাধারণতন্ত্র হিসেবে গড়ে তুলতে সত্যনিষ্ঠার সঙ্গে শপথ গ্রহণ করছি এবং তার নাগরিকদের জন্য: সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ন্যায়বিচার, চিন্তা, মতপ্রকাশ, বিশ্বাস, ধর্ম ও উপাসনার স্বাধীনতা, মর্যাদা ও সুযোগ সুবিধার সমতা সৃষ্টি এবং তাদের সকলের মধ্যে সৌভ্রাতৃত্বের ভাব গড়ে তুলে ব্যক্তির মর্যাদা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুনিশ্চিত করার জন্য গণপরিষদ আজ ১৯৪৯ সালের ২৬ নভেম্বর এই সংবিধান গ্রহণ ও বিধিবদ্ধ করছি এবং নিজেদের অর্পণ করছি।” প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, ‘সমাজতান্ত্রিক’ ও ‘ধর্মনিরপেক্ষ’ শব্দ দুটি ১৯৭৬ সালে সংযোজন করা হয়েছে।
ভারতের সংবিধানের মূল কপি লেখা হয় ইংরেজি ও হিন্দি ভাষায়। ইংরেজি কপির ক্যালিগ্রাফার ছিলেন প্রেমবিহারী নারায়ণ রায়জাদা। হিন্দি ক্যালিগ্রাফি করেন বসন্ত কুমার বৈদ্য। প্রস্তাবনা পৃষ্ঠার নকশা তৈরি করেন বিহার রাম মনোহর সিনহা এবং জাতীয় প্রতীক অশোক স্তম্ভ অঙ্কন করেন দীননাথ ভার্গব। সংবিধানের প্রতিটি অংশের প্রারম্ভে একটি করে চিত্রকর্ম রয়েছে। এগুলো সিন্ধু সভ্যতা থেকে শুরু করে স্বাধীনতা সংগ্রাম পর্যন্ত ভারতের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ঐতিহ্যকে চিত্রিত করে। চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে: মহেঞ্জোদারোর স্নানাগার, বৈদিক যুগের গুরুকুল ব্যবস্থা, রামায়ণ ও মহাভারতের দৃশ্য, গৌতম বুদ্ধ, ভগবান মহাবীর, সম্রাট অশোক, গুপ্ত আমলের শিল্প, বিক্রমাদিত্যের রাজসভা, নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজা ভরত, নটরাজের মূর্তি, ভাগীরথের তপস্যা, আকবরের দরবার, ছত্রপতি শিবাজী ও গুরু গোবিন্দ সিং, রানী লক্ষ্মী বাঈ ও টিপু সুলতান, মহাত্মা গান্ধীর ডাণ্ডি অভিযান, নোয়াখালীতে গান্ধীজি, আজাদ হিন্দ ফৌজের সঙ্গে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, হিমালয়ের দৃশ্য, থর মরুভূমির দৃশ্য, ভারত মহাসাগরের দৃশ্য। চিত্রগুলো কল্পনা ও সম্পাদনা করেন নন্দলাল বসু ও তাঁর সহযোগী শিল্পীবৃন্দ।
সংবিধান রাষ্ট্র পরিচালনার প্রধান তিন স্তম্ভ — আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে একটি ভারসাম্যযুক্ত এক্তিয়ার বণ্টন করে দিয়েছে। সাধারণত সেটা সবাই মেনে চলে। সংবিধানে দেশের সকল ধর্ম, বর্ণ, জাত, লিঙ্গ, সম্প্রদায় ও ভাষাভাষী মানুষের প্রতি মোটামুটিভাবে সমান দৃষ্টি দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। কোনো জনগোষ্ঠীর প্রতি বিমাতৃসুলভ আচরণ করা হয়নি। আমাদের দেশের সুবৃহৎ সংবিধানে রাষ্ট্রীয় জীবনের খুঁটিনাটি প্রায় সব বিষয়েই আলোকপাত করা হয়েছে।
যেখানে বৈচিত্র্য যত বেশি, সেখানে সমস্যা ও জটিলতাও তত বেশি। এব্যাপারে গোটা বিশ্বে আমাদের দেশের কোনো জুড়ি নেই। সংবিধান হল দেশের সর্বোচ্চ আইন। দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক পরিস্থিতির গুণগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গতি রেখে গুরুত্বপূর্ণ আইন তথা সংবিধান পরিবর্তন প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে। সংবিধানে সেই সংস্থান রাখা রয়েছে। সংবিধানের ৮০ শতাংশ ধারা সাধারণ আইন পাসের পদ্ধতিতে সংশোধন করা যায়। কিন্তু ২০ শতাংশ ক্ষেত্রে বিশেষ পদ্ধতি অবলম্বন করতে হয়। ২০২৩ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত ১০৬ বার সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে। আমাদের দেশে সংবিধান সংশোধনের প্রবণতা ও প্রয়োজনীয়তা তুলনামূলকভাবে বেশি। ১৭৮৯ সালে প্রবর্তনের পর থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান সংশোধন করা হয়েছে মাত্র ২৭ বার।
সম্প্রতি ভারতের আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের কর্মকাণ্ডে একটা গুরুতর অবক্ষয় পরিলক্ষিত হচ্ছে। মূল্যবোধ, সততা, নিষ্ঠা ও নিরপেক্ষতার মতো ইতিবাচক গুণাবলী অপসৃত হতে দেখা যাচ্ছে। বহুত্ববাদের বদলে একত্ববাদ বা সর্বগ্রাসীবাদের উত্থান ঘটছে। গণতন্ত্রের অঙ্গনে একনায়কতন্ত্র পুষ্ট হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার প্রতিপক্ষ হিসেবে সাম্প্রদায়িকতা শক্তিশালী হয়ে উঠছে। সংবিধানের ফাঁকফোকর ব্যবহার করেই সংবিধান বিরোধী কাজ করা হচ্ছে। আসলে সরকার আর সাধারণ মানুষের সদিচ্ছা ছাড়া সংবিধানের স্পিরিটকে রক্ষা করা সম্ভব নয়।
(লেখক: প্রধানশিক্ষক, কাবিলপুর হাইস্কুল, মুর্শিদাবাদ)।








