এসআইআর নিয়ে দ্বন্দ্ব, বিতর্ক ও রাজনীতির অভিঘাত
মনিরুল ইসলাম তপন
ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় পরিমার্জন (SIR) ভারতের নির্বাচনী ব্যবস্থার এক পুরনো, স্বাভাবিক, রুটিন প্রক্রিয়া। এই তালিকা আপডেট করা হয়। নতুন ভোটার যুক্ত হয়, মৃতদের নাম বাদ পড়ে, পরিবর্তিত ঠিকানার সংশোধন হয়। মোট কথা, আগেও এসআইআর হয়েছে, কিন্তু তখন এটি ছিল নিছক নির্বাচন কমিশনের রুটিন কাজ। এবারই প্রথম এসআইআর-কে রাজনৈতিক হাতিয়ার বানানো হয়েছে, ‘অনুপ্রবেশকারী’আতঙ্ককে বড় করে দেখানো হয়েছে এবং ভোটের আগে এটিকে বড়সড় প্রচারের ইস্যু বানানো হয়েছে। এ কারণেই উত্তেজনা আকাশছোঁয়া।
এই প্রশাসনিক কাজটি ইতিপূর্বে কখনোই দেশে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করেনি। কিন্তু এ বছর চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। হঠাৎ করে Special Intensive Revision বা এসআইআর নামের বর্ধিত, ব্যয়বহুল ও ব্যাপক নজরদারিমূলক অপারেশন জুড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে প্রশ্ন জেগেছে, এটা কি কেবল ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধ করার কাজ, নাকি এর অন্তরালে রয়েছে আরও বড় রাজনৈতিক খেলা?
প্রথমত, রুটিন ভোটার তালিকা সংশোধন ও এসআইআর এই দুটির মধ্যে পার্থক্য গভীর। তালিকা সংশোধন সাধারণ প্রশাসনিক কাজ, কিন্তু এসআইআর–এর ক্ষেত্রে সেই কাজকে অস্বাভাবিকভাবে বৃহৎ, কঠোর ও নজরদারিমূলক করা হয়েছে। বাড়ি বাড়ি ভিজিট, সন্দেহভাজন নাগরিকদের তালিকা তৈরি, নথিপত্র খুঁটিয়ে দেখা — এসব যোগ হওয়ায় এটি আর ‘রিভিশন’নয়; বরং নাগরিকদের পরিচয় যাচাইয়ে বড়সড় তদন্তের অভিযান। স্বাভাবিক ভাবেই মানুষের মনে প্রশ্ন জাগছে — এটা কি শুধুই ভোটার তালিকা সংশোধন, নাকি নাগরিকত্ব নিয়ে ভয়ের পরিবেশ তৈরি করা?
দ্বিতীয়ত, এসআইআর–এর কর্মক্ষমতা নিয়ে দেশজুড়ে চলছে বিতর্ক। বিহারের উদাহরণ চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, বিপুল সরকারি অর্থ ব্যয় করে, হাজার হাজার কর্মীকে কাজে লাগিয়ে যতটা ঢাকঢোল পিটিয়ে এসআইআর চালানো হল, ফলস্বরূপ ধরা পড়ল মাত্র ৮০ জন সন্দেহভাজন। তিনজন রোহিঙ্গা, ছিয়াত্তর জন কথিত অনুপ্রবেশকারী। এটাই নাকি সেই “বিপদ”, যাকে কেন্দ্র করে কোটি কোটি টাকা উড়িয়ে দেওয়া হল!
তৃতীয়ত, এসআইআর–এর সময়কাল এবং রাজনৈতিক প্রভাব এই বিতর্ককে আরও ঘনীভূত করছে। যদি মূল লক্ষ্য সত্যিই মৃত ভোটার বা ভুয়ো নাম বাদ দেওয়া হয়, তবে কেন ১২টি গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল, যেখানে শিগগিরই নির্বাচন, সেখানেই এর অস্বাভাবিক তৎপরতা? বিরোধী দলগুলির অভিযোগ, এটি ভোটের আগে পরিচিত “অনুপ্রবেশকারী” তত্ত্বকে সামনে এনে জনগণের মধ্যে ভয় তৈরি করা, বিভাজন ঘটানো এবং শেষ পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক শিবিরের ভোটব্যাঙ্ক পাকাপোক্ত করার অপচেষ্টা। “মানুষকে ভয় দেখাও, নিজে রক্ষাকর্তা সাজো”— এই কৌশলই যেন এসআইআর–এর নেপথ্যে মূল সুর।
চতুর্থত, সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার নির্বাচন কমিশনকে সতর্ক, তিরষ্কার ও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। কমিশনকে বলা হয়েছে, “প্রক্রিয়াজাত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে।”বিরোধী শিবির আরও সরাসরি অভিযোগ তুলেছে —“কমিশন এখন বিজেপির বি-টিম।”তবে এত বড় বিতর্কের মধ্যেও বিজেপি একবারও এসআইআর–এর সমালোচনা করেনি। কেন? রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, যদি এসআইআর–এর কাঠামো ও বাস্তবায়ন বিজেপির নির্বাচনী স্বার্থে সহায়ক হয়, তবে শাসকদলের নীরব সমর্থনই স্বাভাবিক। ফলে কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহ আরও গভীর হচ্ছে।
পঞ্চমত, রাহুল গান্ধী ও ইন্ডিয়া জোটের শরিকরা ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যগুলিতে ভোট চুরির গুরুতর অভিযোগ করেছেন। অভিযোগ — ইভিএম, ভোট গণনা, ভোটার তালিকা — সব ক্ষেত্রেই কারচুপি, গরমিল ও অনিয়মের ছাপ রয়েছে। এমন বিস্ফোরক অভিযোগের তদন্ত করার কথা নির্বাচন কমিশনের। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, কমিশন উল্টে অভিযোগকারী নেতাদেরকেই ক্ষমা চাইতে বলছে বা হলফনামা দিতে চাপ দিচ্ছে। এভাবে কি গণতান্ত্রিক স্বর দমন করা হচ্ছে?
সারকথা হল, এসআইআর আতঙ্কের কারণ নয়, তবে নাগরিকদের সচেতন থাকাও জরুরি। ইতিমধ্যে অনেক মানুষ আতঙ্কে প্রাণ দিয়েছেন বা প্রাণ হারিয়েছেন। এমন অবস্থায় সকল নাগরিকের দায়িত্ব হল, নিজের নথিপত্র ঠিক রাখা। প্রশাসনিক স্বচ্ছতা দাবি করা। ভুলভাবে “সন্দেহভাজন” করা হলে তৎক্ষণাৎ আপত্তি জানানো। আইন আমাদের সে অধিকার দিয়েছে। গণতন্ত্রে সবচেয়ে বড় শক্তি নাগরিকদের সচেতনতা। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভ্রান্তি ছড়ানো হতে পারে, কিন্তু নাগরিকের সতর্ক দৃষ্টি সেই অশুভ প্রয়াসকে ব্যর্থ করতে পারে। এসআইআর নিয়ে বিতর্ক তাই শুধু তালিকা সংশোধনের প্রশ্ন নয়, এটি দেশের গণতান্ত্রিক ভবিষ্যতের অগ্নিপরীক্ষাও।








