SIR বিষয়ক নানা প্রশ্নের উত্তর
আবীর লাল
ভারতীয় গণতন্ত্রের মূল শক্তি তার জনগণ, আর জনগণের ক্ষমতার প্রতিফলন ঘটে ভোটের মাধ্যমে। তাই ভোটার তালিকা যে এদেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রাণভোমরা, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আবার এই তালিকা যাতে সঠিক থাকে, মৃত ব্যক্তির নাম মুছে যায়, অনুপ্রবেশকারীরা বাদ পড়ে, নতুন প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিকরা যুক্ত হয় — এই লক্ষ্যেই প্রতি বছর রুটিন মাফিক ভোটার তালিকা সংশোধন করা হয়। কিন্তু সম্প্রতি আসাম বাদে বিহার ও পশ্চিমবঙ্গ-সহ মোট ১৩টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে চালু হয়েছে এসআইআর নামক এক নতুন প্রক্রিয়া। এই উদ্যোগ ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্ক, সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপ — সব মিলিয়ে দেশজুড়ে উত্তাপ ছড়িয়েছে। তাই প্রশ্ন উঠেছে, এসআইআর-এর আড়ালে কি লুকিয়ে আছে কোনো রাজনৈতিক অভিসন্ধি?
ভোটার তালিকার রুটিন সংশোধন, আর এসআইআর-এর মধ্যে মৌলিক পার্থক্যটা কোথায়? রুটিন সংশোধনের ক্ষেত্রে ব্লক বা বুথ পর্যায়ে কর্মকর্তারা গিয়ে অফিসিয়াল ডেটা যাচাই করেন, নতুন ১৮ বছরোর্ধ্ব নাগরিক যুক্ত হচ্ছেন কি না, মৃত বা স্থানান্তরিত ব্যক্তিদের নাম মুছে ফেলা দরকার কি-না, কিংবা ঠিকানা পরিবর্তন বা ত্রুটি সংশোধনের প্রয়োজন আছে কি না। অন্যদিকে এসআইআর-এর ক্ষেত্রে প্রযুক্তি ও অফিসিয়াল ডেটা ব্যবহার করা হয়; আধার, প্যান, ভোটার কার্ড, এমনকি রেশন কার্ডের ডেটা পর্যন্ত মিলিয়ে দেখা হয়; ভোটার তালিকার সঙ্গে সরকারি তথ্যে গরমিল আছে কিনা খুঁজে বের করা হয়; সন্দেহজনক ভোটারদের পুনঃযাচাই করা হয়, প্রয়োজনে প্রমাণপত্র চাওয়া হয়।
এটি মূলত তথ্য যাচাই প্রক্রিয়া, যা উন্নত দেশগুলিতে দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত। যেমন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভোটার রোল মেনটেইন প্রোগ্রাম চলছে বহু বছর ধরে, যেখানে অঙ্গরাজ্যগুলি ভোটারদের মৃত্যুর রেকর্ড, স্থানান্তর রেকর্ড মিলিয়ে ভোটার তালিকা আপডেট রাখে। ব্রিটেনে ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশন আইন অনুযায়ী স্থানীয় কর্তৃপক্ষ প্রতি বছর ভোটারদের ঠিকানা যাচাই করে। অস্ট্রেলিয়ার কন্টিনিউয়াস রোল আপডেট পদ্ধতিও এসআইআর-এর মতোই এক ধরনের ডেটা-লিঙ্কড রিভিউ প্রক্রিয়া। তবে ভারতের প্রেক্ষাপটে এসআইআর রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল। কারণ, এখানে জাতিগত, ধর্মীয় ও অভিবাসন প্রশ্ন না চাইতেও যুক্ত হয়ে যায়। দ্বিতীয় প্রশ্নটি হল, কোটি কোটি টাকা খরচ করে এসআইআর হচ্ছে, কিন্তু ফল কী? বিহারের উদাহরণ সবচেয়ে বেশি আলোচিত। জানা গেছে, সেখানে এসআইআর করে মাত্র ৩ জন রোহিঙ্গা ও ৭৬ জন অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত হয়েছে। এই সংখ্যাটি তুচ্ছ মনে হলেও খরচ হয়েছে বহু কোটি টাকা।
প্রশ্ন উঠছে, মাত্র ৮০ জনের জন্য এমন ব্যয়বহুল অভিযান কি যুক্তিসঙ্গত?
এ প্রশ্নের উত্তর একরৈখিক নয়। একদিকে বলা যায়, গণতন্ত্রের শুদ্ধতা রক্ষায় এমন ব্যয় অবশ্যই যৌক্তিক। যেমন নিরাপত্তা বা সেনা বাজেটে হয়; এখানেও বিশুদ্ধ নির্বাচন প্রক্রিয়া গণতন্ত্রের রক্ষাকবচ। একটিও ভুয়ো ভোট গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। অন্যদিকে, সমালোচকেরা যুক্তি দিচ্ছেন; যখন দারিদ্র্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যখাতে পর্যাপ্ত অর্থ নেই, তখন এমন বিশাল প্রশাসনিক অভিযান শুধু রাজনৈতিক প্রদর্শন হিসেবেই ধরা যেতে পারে। সত্যিটা সম্ভবত মাঝামাঝি কোথাও। কারণ, আধুনিক গণতন্ত্রে তথ্যনির্ভর যাচাই অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। কিন্তু এর কার্যকারিতা, বিভিন্ন রাজ্যে বিধানসভা ভোটের ঠিক আগে এই প্রক্রিয়া শুরু হওয়ায় মানুষের মনে আতঙ্ক তৈরি হওয়া স্বাভাবিক।
তাহলে এসআইআর কি সত্যিই ভোটার তালিকা পরিশুদ্ধির উদ্দেশ্যে, না-কি রাজনৈতিক কৌশল?
কেন্দ্র সরকারের দাবি, এসআইআর-এর লক্ষ্য শুধু মৃত, স্থানান্তরিত বা ভুয়ো ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া। কিন্তু বিরোধী পক্ষ বলছে, এটি আসলে ভোটমুখী রাজ্যগুলিতে নির্বাচনী হিসাব মেলানোর একটি হাতিয়ার। আধার লিংকের মাধ্যমে ভুয়ো নাম বাদ দিলে নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়বে। বিদেশি অনুপ্রবেশকারীদের ভোটার তালিকা থেকে বাদ দিলে দেশের নিরাপত্তা শক্তিশালী হবে। আবার এসআইআর চালুর সময়কাল অবশ্যই সন্দেহজনক। কারণ, এটি চালু হচ্ছে ১২টি রাজ্যের নির্বাচনের প্রাক্কালে। ভোটার তালিকা যাচাইয়ের নামে নির্দিষ্ট সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট অঞ্চলকে টার্গেট করা হচ্ছে। পুনঃযাচাই প্রক্রিয়ায় দরিদ্র, অশিক্ষিত বা দলিল-নথি বিহীন নাগরিকদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা বেশি। তাছাড়া এদেশে নাগরিকত্ব ও নথিপত্রের প্রশ্ন খুবই জটিল। তাই এসআইআর প্রক্রিয়া যতই প্রযুক্তিনির্ভর হোক, গ্রাউন্ড পর্যায়ে সেটি যে রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট হবে না, সেকথা হলফ করে বলা যায় না। এসআইআর নিয়ে ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্ট একাধিকবার উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। আদালত নির্বাচন কমিশনকে প্রশ্ন করেছে, ”কীভাবে ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষিত থাকবে? এবং ঠিক কোন প্রক্রিয়ায় নাগরিককে ‘সন্দেহভাজন ভোটার’ঘোষণা করা হচ্ছে?” কোর্টের নির্দেশে কমিশনকে পদক্ষেপ নিতে হয়েছে, কিন্তু বিতর্ক প্রশমিত হয়নি।
বিরোধীরা অভিযোগ করছে, কমিশন এখন বিজেপির ‘বি-টিম’এ পরিণত হয়েছে। এই অভিযোগ কতটা যুক্তিসঙ্গত?
সরাসরি বলা যায় ভারতের নির্বাচন কমিশন সংবিধানগতভাবে স্বাধীন বা স্বশাসিত। কিন্তু বাস্তবে সরকার-নিযুক্ত নির্বাচন কমিশনারদের নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে সংশয় আছে। অতীতে কংগ্রেস আমলেও একই অভিযোগ উঠেছিল। বিজেপিও এ বিষয়ে নীরব। কারণ, এসআইআর তাদের রাজনৈতিক এজেন্ডা অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভোটাধিকার রোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তাই শাসকদলের পক্ষে এসআইআর বিরোধিতা করা বিড়ম্বনাকর। তবে এও ঠিক যে, আদালত ও নাগরিক সমাজের চাপেই কমিশনকে স্বচ্ছ নীতি প্রণয়ন করতে হয়েছে। যেমন তথ্য যাচাইয়ের জন্য নাগরিককে নোটিশ ও উত্তর দেওয়ার সুযোগ দিতে হবে, ভুল হলে সংশোধনের সুযোগ থাকবে, কোনো নাগরিককে একতরফা ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়া যাবে না।
দেশের বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী ও ‘ইন্ডিয়া’ জোটের অভিযোগ, ডাবল ইঞ্জিন রাজ্যে বিজেপি প্রশাসনিক প্রভাব খাটিয়ে ভোটার তালিকা বদলাচ্ছে, লক্ষ লক্ষ ভোট চুরি করে বিজেপি সরকার গঠন করেছে। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের সাথে বিজেপির যোগসাজশের অভিযোগও এনেছেন রাহুল। তাদের দাবি, এসআইআর বা তথ্য যাচাই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে রাজনৈতিকভাবে বিরোধী ভোটারদের তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
নির্বাচন কমিশন অবশ্য এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং রাহুল গান্ধীর কাছ থেকেই প্রমাণ বা ক্ষমা প্রার্থনার দাবি করেছে। কিন্তু বিজেপির সাংসদ একই অভিযোগ নিয়ে এলে তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নির্বাচন কমিশন নেননি। কমিশনের এই দ্বিচারিতা সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ তৈরি করেছে।
এবার আসা যাক পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপটে। ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকারের আমলে নীরবে এসআইআর হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘটনার প্রায় ২৫ বছর পর আজ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বহুগুণে বদলে গেছে। দেশে এখন বিজেপি কেন্দ্রীয় সরকারে রয়েছে এবং সেই সঙ্গে সংখ্যালঘু, দলিত, তপশিলী, আদিবাসী ও নিম্নবর্ণের প্রতি সমাজের নানা অংশে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষ বহুগুণ বেড়েছে। বিজেপি নেতাদের ঘৃণামূলক ভাষণ, এনআরসি ও সিএএ-এর মতো উদ্যোগগুলোর ফলে সংখ্যালঘুদের মনে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি এক গভীর আশঙ্কা জন্ম নিয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়া সেই ভয়কে যেন বহুগুণ বাড়িয়ে তুলেছে। বিরোধী দলগুলো যদিও দাবি করছে, নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যে এক ধরনের সেটিং রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হল, এসআইআর একটি সাংবিধানিক প্রক্রিয়া। এটি দেশের আইনি কাঠামোর অংশ, তাই একে বন্ধ করার ক্ষমতা কোনো রাজ্য সরকারের নেই। রাজ্য সরকার ভোটব্যাংক রক্ষার্থে বার বার বলছে, এই প্রক্রিয়া তারা হতে দেবে না। কিন্তু সচেতন নাগরিকরা জানেন, সংবিধান অনুযায়ী এই প্রক্রিয়া অবশ্যম্ভাবী। সবচেয়ে বিস্ময়কর হল, রাজ্য সরকারই আবার এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে প্রায় ৯০ হাজার বিএলও নিয়োগে সহযোগিতা করেছে। তাই বলা যায়, কেন্দ্র ও রাজ্য, উভয়পক্ষই নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধার্থে এসআইআর নিয়ে রাজনীতি করছে।
কিন্তু এই রাজনৈতিক টানাপড়েনের মধ্যে সাধারণ মানুষকেই সবচেয়ে সচেতন হতে হবে। নিজের সমস্ত ব্যক্তিগত তথ্য ও প্রমাণপত্র; যেমন- ভোটার কার্ড, আধার, বার্থ সার্টিফিকেট ইত্যাদি ঠিকঠাকভাবে সংরক্ষণ করা এখন অত্যন্ত জরুরি। কারণ, প্রকৃত ভারতীয় নাগরিকের অধিকার কেউ কেড়ে নিতে পারে না, যদি সেই নাগরিক নিজের পরিচয় ও তথ্যের প্রতি সচেতন থাকে।








