ট্রাম্পের বায়না কে মেটাবে?
২০১৬ সালে প্রথমবার ক্ষমতায় এসে ট্রাম্প মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা-কে বলেছিলেন, চাঁদে পরমাণু হামলা করলে কেমন হয়। সেবার আফগানিস্তানে তাঁর নির্দেশেই ফেলা হয়েছিল ‘মাদার অব অল বম্বস’। নিজে চালুনি হয়ে সূঁচের ছিদ্রান্বেষণ করতে গিয়ে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রপ্রধান কিম জং উনের সঙ্গে দু-দফা বৈঠক করে বলেছিলেন, পরমাণু-মুক্ত দেশ বানাতে। নাহলে গাদ্দাফির মতো গর্দান চলে যাবে কিমেরও। আর তাঁর কথা শুনলে মালামাল হয়ে যাবে উত্তর কোরিয়া। এবার দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় ফিরে আরো বাড় বেড়েছে ট্রাম্পের।
এবার শুরু থেকেই তিনি একের পর এক দেশকে হুমকি দিয়ে চলেছেন। প্রথমে বললেন, গ্রীনল্যান্ডকে কিনে নেব। ডেনমার্ক সরকার পত্রপাঠ সেই বায়না খারিজ করে দিয়ে জানাল, গ্রীনল্যান্ড নট ফর সেন। তারপর গোঁ ধরলেন, পানামা খাল দখল করে নেব। তাও হল না। তখন বললেন, কানাডাকে আমেরিকার সঙ্গে যুক্ত করে নিয়ে দেশটিকে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য বানাব। কানাডার প্রধানমন্ত্রী ম্যাক কার্নি বললেন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সম্পর্কে ট্রাম্পের কোনো ধারণা নেই। কানাডা একটা দেশ। সেটা কীভাবে আমেরিকার অঙ্গরাজ্য হতে পারে? এরপর বললেন, ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা দখল করে নেব। তারপর কিছুটা পিছু হটে গাজায় শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করলেন।
উত্তর মেরুর অন্তর্গত বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রীনল্যান্ড। ১৮৬৭ সালে রাশিয়ার থেকে আলাস্কা কিনেছিল আমেরিকা। ১৫৮ বছর আগে আলাস্কা কিনতে লেগেছিল ৭২ লক্ষ ডলার। আলাস্কার থেকে গ্রীনল্যান্ডের আয়তন অনেক বেশি। তাছাড়া দেড় শতাব্দী পর গ্রীনল্যান্ড কিনতে হলে ট্রাম্পকে অন্তত ১৫০গুণ বেশি দাম দিতে হবে। কানাডার পশ্চিমে অবস্থিত আলাস্কার আয়তন ৫ লক্ষ ৮৬ হাজার ৪১২ বর্গমাইল। তবুও তা কিনেছিল আমেরিকা। কারণ, আলাস্কায় রয়েছে বিশাল খনিজ তেলের ভাণ্ডার। বর্তমানে আলাস্কার দাম ১৫ কোটি ৩৫ লক্ষ ডলার।
গ্রীনল্যান্ডের আয়তন ৮ লক্ষ ৩৬ হাজার বর্গমাইল। যার দাম আনুমানিক ১৬০ কোটি ডলার বলে জানিয়েছে এক সমীক্ষক সংস্থা। জানা যায়, সাড়ে সাত দশক আগে ১৯৪৬ সালেও একবার গ্রীনল্যান্ড কেনার প্রস্তাব দিয়েছিল আমেরিকা। দিতে চেয়েছিল ১০ কোটি ডলার। ৭ জানুয়াররি ২০২৫ ট্রাম্প প্রথমবার গ্রীনল্যান্ড কেনার কথা বলেন। এও বলেন, কৌশলগত কারণে গ্রীনল্যান্ড আমেরিকার জন্য খুব প্রয়োজনীয়। বিক্রি না করলে দখল করে নেব, এজন্য সেনাবাহিনী নামানোর হুমকিও দেন ট্রাম্প। ২০১৬ সালে প্রথম বার মার্কিন প্রেসিডেন্ট হয়ে ট্রাম্প গ্রীনল্যান্ড কেনার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন ২০১৯ সালে। উল্লেখ্য, গ্রীনল্যান্ডে রয়েছে স্বশাসিত সরকার। যদিও আন্তর্জাতিকভাবে গ্রীনল্যান্ডের ওপর ডেনমার্কের সার্বভৌমত্ব রয়েছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডরিক্সন এবং গ্রীনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী মুট এগেডে একযোগে ট্রাম্পের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। যদিও গ্রীনল্যান্ডে একটা মার্কিন সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এটি পরিচালনা করে ন্যাটো জোট। তাই গ্রীনল্যান্ড কেনা-বেচা নিয়ে কোপেনহেগেন-এর সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্কে আড়াআড়ি বিভাজন দেখা দিয়েছে।
উল্লেখ্য, ১৯১৭ সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে আড়াই কোটি ডলারে ভার্জিন আইল্যান্ড কিনেছিল আমেরিকা। এখন এর বাজারমূল্য প্রায় ৬২ কোটি ডলার। ১৮০৩ সালে দেড় কোটি ডলারে ফ্রান্সের থেকে লুসিয়ানা কিনেছিল আমেরিকা। এখন যার দাম প্রায় ৪২ কোটি ডলার। এখন গ্রীনল্যান্ড, পানামা, কানাডা ইস্যুতে ট্রাম্পকে ভর্ৎসনা করেছে ফ্রান্স, জার্মানির মতো ইউরোপের দেশগুলো। তাদের মতে, একবিংশ শতাব্দীতে এভাবে জোর করে কিনে নেওয়া, দখল করা যায় না। কিন্তু ট্রাম্পকে বোঝাবে কে? তিনি নিজেকে সারা বিশ্বের রাজা মনে করেন। বাজেট পাস না হওয়ায় একমাস ধরে শাটডাউন চলছে, ২০ লক্ষ সরকারি কর্মচারী বেতন পাচ্ছেন না। সেদিকে ওনার হুঁশ নেই। উনি লাটসাহেবের মতো পরমাণু পরীক্ষার নির্দেশ দিচ্ছেন। একের পর এক দেশের ওপর দফায় দফায় আমদানি শুল্ক বাড়িয়ে চলেছেন।
গত শতাব্দীর প্রথম দিকে প্রশান্ত ও আটলান্টিক মহাসাগরের সংযোগ রক্ষাকারী পানামা খাল খনন করেছিল আমেরিকা। ১৯৯৯ সালে মধ্য আমেরিকার দেশ পানামা সেই খালের দায়িত্বভার হাতে পায়। ২৫ বছর পর আবার সেই খালকে ফিরে পেতে মরিয়া ট্রাম্প। পানামার প্রেসিডেন্ট হ্যাভিয়ের মার্টিনেজ সাফ বলেছেন, পানামা খাল তাদের হাতেই থাকবে। তারা কাউকে ছাড়বে না। এটা তাদের সার্বভৌম অধিকার। কিন্তু ট্রাম্প এসব ব্যাপারে আইন-কানুনের তোয়াক্কা করেন না। কূটনৈতিক সৌজন্যের ধার ধারেন না। যুক্তির পরোয়া করেন না। পৃথিবীটাকে তিনি মগের মুলুক মনে করেন। সব দেশকে লিলিপুট মনে করেন। তিনি চান, বিশ্ব চলবে একমাত্র তাঁরই অঙ্গুলিহেলনে।








