সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকার ৫৩ বছর পদার্পণ
মাওলানা মঈনুদ্দিন খান ফালাহী
কলকাতা থেকে প্রকাশিত ইসলামী ঐতিহ্যবাহী সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকা ৫২ বছর অতিক্রম করে ৫৩ বর্ষে পদার্পণ করল। পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে এত প্রাচীন আর কোনো পত্রিকা নেই। স্মৃতির সরণী বিয়ে মীযান পত্রিকার সেই গৌরবময় ইতিহাস রোমন্থন করলেন মাওলানা মঈনুদ্দিন খান ফালাহী।
‘দাওয়াত’ পত্রিকার সম্পাদক জনাব মুসলিম সাহেবকে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে আমীরে জামাআত তথা মারকাযী নেতৃবৃন্দ কলকাতায় পাঠান একটি ট্রাস্ট গঠনের উদ্দেশ্যে। তিনি কলকাতা এসে মাসাধিককাল অবস্থান করে এ বিষয়ে তৎপরতা চালিয়ে জামাআত ছাড়া অন্যান্য মুসলিম নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করে একটি ট্রাস্ট গঠন করেন। যার নাম রাখা হয় ‘বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্ট’ বা ‘বি.আই.পি.টি’। এই ট্রাস্ট সমস্ত মিল্লাতের সম্পদ। তাই এর নাম ‘জামাআতে ইসলামী’ রাখা হয়নি। এরপর বিআইপিটি-র নামে একটি ডিড করে তার সদস্যদের মধ্যে জামাআতে ইসলামী হিন্দের বাইরের মিল্লাতের বিশেষ ব্যক্তিদেরকে শামিল করা হয়। জামাআতে ইসলামীর পশ্চিমবঙ্গ হালকা বা রাজ্য শাখা তার সকল পুস্তকাদি ও নগদ অর্থ সমেত প্রায় ৩৩ হাজার টাকার সম্পদ ওই ট্রাস্টকে দান করে। ১৯৭৩ সালের ৩ মে এই দলিল রেজিস্ট্রি হয়। বিআইপিটি-র প্রতিষ্ঠাতা কর্মকর্তা ও সদস্যদের নাম নিম্নে দেওয়া হল:-
১। মাওলানা ইউসুফ সাহেব (আমীরে জামাআত): চেয়ারম্যান
২। আব্দুল ফাত্তাহ সাহেব (আমীরে হালকা): ভাইস চেয়ারম্যান
৩। মাওলানা ইয়াকুব ঘোলায়ী সাহেব (সহকারী আমীরে হালকা): ভাইস চেয়ারম্যান
৪। সাইয়েদ আলি সাহেব (কলিকাতা): সেক্রেটারি
৫। মৌলবী সা’দ আলি খান সাহেব (শিবনগর, ২৪ পরগনা): সদস্য
৬। নূরুল ইসলাম খান সাহেব (চণ্ডীপুর, ২৪ পরগনা): সদস্য
৭। সেখ নাসীর আহমেদ সাহেব (হাওড়া): সদস্য
৮। মাওলানা সীরাজুল ইসলাম সাহেব (হাওড়া): সদস্য
৯। সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেব (কলকাতা): সদস্য
১০। মাওলানা আতিকুর রহমান সাহেব (জমিয়তে উলেমা): সদস্য
১১। ইউসুফ সাহেব (সম্পাদক: রেডিয়ান্স, দিল্লি): সদস্য
১২। মুসলিম সাহেব (সম্পাদক: দাওয়াত পত্রিকা, দিল্লি): সদস্য
১৩। অধ্যাপক নিয়াজ সাহেব (কলকাতা): সদস্য

জনাব নাসির আহমেদ, প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক, মীযান পত্রিকা।
সাপ্তাহিক মীযান প্রচার অভিযান:
বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্ট বা বিআইপিটি গঠন হওয়ার পর তার প্রকাশনী সাপ্তাহিক ‘মীযান’ পত্রিকা প্রকাশনার জন্য ৩ লক্ষ টাকা সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা সামনে রেখে সারা বাংলায় প্রচার অভিযান চালানো হয়। এই কাজে সহায়তার জন্য সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেব ও অন্যান্য বাংলার বিশিষ্ট নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের আবেদন-সহ প্রচার অভিযান চালানো হয়। এই প্রচার অভিযানে নাসীর আহমেদ সাহেবের লেখা একটি কবিতা খুবই কাজে আসে, যাতে তিনি মীযান ও বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্টের কথা লিখেছিলেন। জামাআত আশা করেছিল, এই গুরুত্বপূর্ণ অভিযানে দল-মত নির্বিশেষে পশ্চিমবাংলার সকল মুসলিম জামাআত ও সংগঠন সর্বতোভাবে সাহায্য সহযোগিতা করবে। কারণ, এটা মিল্লাতের কাজ হিসেবে জামাআতের বাইরের বাংলার নেতৃস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিদের ট্রাস্টে শামিল করা হয়েছিল। বহুদিন পূর্বে যে কাজ আরম্ভ হওয়ার কথা ছিল, সে কাজ সবেমাত্র আরম্ভ হচ্ছে। তাই সবাইকে এ কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার প্রয়োজন ছিল। আর সত্য কথা বলতে কী, সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এ বিষয়ে আগ্রহ বা উৎসাহ ছিল প্রচুর। কিন্তু সেই তুলনায় মুসলিম জামাআত বা সংগঠনের নেতৃস্থানীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ কোনপ্রকার সাহায্য সহযোগিতা করলেনই না। বরং ভিতরে ভিতরে প্রচুর বিরোধিতা আরম্ভ করে নিজ নিজ পরিসরে তাদের অনুগামীদের মাঝে প্রচার করতে থাকে যে, বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্ট সমগ্র মিল্লাতের কোনো সংস্থা নয়; এটা কেবলমাত্র জামাআতে ইসলামী হিন্দ ও তার মুখপত্র হল ‘মীযান’। তাই এসব বিষয়ে সকলের সহযোগিতার প্রয়োজন নেই। তাদের ধারণা ছিল জামাআতে ইসলামীর পশ্চিমবঙ্গে যে জনশক্তি আছে, তার দ্বারা এতবড় কাজ করা সম্ভব হবে না। তাই তারা প্রথম প্রথম এটাকে খুব একটা গুরুত্ব দেয়নি ও জোরালোভাবে বিরোধিতা করেনি। কিন্তু ধীরে ধীরে তা প্রকাশ পায়।
জামাআতে ইসলামী হিন্দ রাজ্য শাখা সর্বতোভাবে এই অভিযান সফল করার মানসিকতা নিয়ে সর্বস্তরের কর্মীরা ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ে। অন্যান্য জামাত বা সংগঠনের অসহযোগিতা ও বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রায় ৭০ হাজার টাকা সংগৃহীত হয়, যা ট্রাস্টের লক্ষ্যমাত্রা থেকে অনেক অনেক নীচে ছিল। এতদসত্ত্বেও জামাআতে ইসলামীর কর্মীরা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে একাজে আরও তৎপরতা চালিয়ে যায়। জামাআতে ইসলামী রাজ্য শাখা সিদ্ধান্ত নেয়, যতই আর্থিক সমস্যার সম্মুখীন হতে হোক না কেন, পত্রিকা ও প্রকাশনার কাজ অতি সত্ত্বর আরম্ভ করা হবে। পত্রিকা প্রকাশনার সাথে সাথে উন্নত মানের দ্বীনি পুস্তকাদি তৈরি, বিশেষ করে শিশুদের উপযোগী ইসলামী চিন্তাধারাকে সামনে রেখে বই-পুস্তক প্রণয়ন এবং প্রকাশের চেষ্টা করা হবে, যা সে সময় বাংলায় ছিল না বললেই চলে।
জামাআতে ইসলামীর পশ্চিমবঙ্গ প্রকাশনী হতে যে সমস্ত পুস্তকগুলি পূর্বে প্রকাশিত হচ্ছিল, সেগুলির সঙ্গে তাফহীমুল কুরআন ও হাদীস সংকলন বাংলায় ছাপানোর সিদ্ধান্ত হয়। জামাআতে ইসলামীর নয়, জামাআতের বাইরের ভাল ইসলামী পুস্তকাদি প্রকাশ করার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। যেমন মাওলানা সুলায়মান নাদবী ও মাওলানা আবুল হাসান নাদবী (আলীমিঞা) প্রমুখের লিখিত ইসলাম সম্পর্কে ভাল পুস্তকগুলি ছাপা হবে। এক বছরের মধ্যে শিশুদের জন্য ‘এসো জীবন গড়ি’, ‘প্রিয়নবীর প্রিয় কথা’, ‘ইসলামী শিক্ষার প্রথম ও দ্বিতীয় ভাগ’ ছাপা হল। সাধারণ মানুষের মধ্যে বিপুল উৎসাহ দেখা গেল। অনেক মুসলিম পরিচালিত বিদ্যালয় তাদের সিলেবাসে এই পুস্তকগুলি অন্তর্ভুক্ত করে পঠন-পাঠনের ব্যবস্থা করে।
সাপ্তাহিক মীযান প্রকাশ:
বিআইপিটি-র সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হল ‘সাপ্তাহিক মীযান’। ইতিপূর্বে ‘পশ্চিমবঙ্গ ইসলামী সাহিত্য সমিতি’ নামক যে প্রতিষ্ঠান গঠন করা হয়েছিল এবং যাদের প্রচেষ্টায় মাসিক মীযান প্রকাশিত হচ্ছিল, যার মালিকানা ছিল মূলত ‘পশ্চিমবঙ্গ ইসলামী সাহিত্য সমিতি’, ১৯৭৩ সালের মে মাসে ‘পশ্চিমবঙ্গ ইসলামী সাহিত্য সমিতি’ সর্বসম্মতিক্রমে মাসিক মীযান-এর স্বত্ত্ব বিআইপিটি-কে নিঃশর্তে দান করে। তারপর ওই বছর ৩ আগস্ট (১৯৭৩) সাপ্তাহিক ‘মীযান’ পত্রিকা প্রকাশনার দিন ঘোষণা করা হয়। এর পরপরই বাংলার অন্যান্য জামাআত প্রকাশ্যে জামাআতে ইসলামীর বিরোধিতা আরম্ভ করে, যা এতদিন অনেকটা গোপনে চলছিল। অনেকটা সরকারি সহযোগিতায় সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকা প্রকাশের এক সপ্তাহ পূর্বে অতি দ্রুততার সঙ্গে ‘সাপ্তাহিক ইনসানিয়াত’ পত্রিকা প্রকাশ করে। একথা মনে রাখতে হবে যেখানে পশ্চিমবঙ্গ হতে অমুসলমানদের হাজারেরও বেশি মাসিক, সাপ্তাহিক ও দৈনিক পত্র-পত্রিকা প্রকাশিত হয়, সেখানে মুসলমানদের দু-দশটা পত্রিকা বের হবে – এটা স্বাভাবিক ও ভাল দিক। কিন্তু যদি তার উদ্দেশ্য হয় একে অপরের বিরোধিতা করা, একে অপরের বিরুদ্ধে কুৎসা রটানো, তাহলে সেটা হবে ক্ষতিকর ও ভুল পদক্ষেপ; বরং উদ্দেশ্য হতে হবে একে অপরের সাহায্য ও সহযোগিতার মনোভাব। প্রতিযোগিতার মনোভাব পরিহার করে সহযোগিতার মাধ্যমে ইসলামের সুমহান দিকগুলি আপামর জনসাধারণের সামনে তুলে ধরতে হবে। এইভাবে ইসলামের খিদমত করা সকলের একান্ত লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। অচিরেই এদের ইসলামী খিদমতের স্বরূপ প্রকাশ পায়। তা হল জামাআতে ইসলামী ও মাওলানা মওদূদী মুহতারামের বিরোধিতা করা। পরবর্তীকালে এদের পরিণতি কী হয়েছিল তা বাংলার জনগণ মাত্র অবগত। এ বিষয়ে আমাদের কিছু বলার নেই।

জনাব ডা. রইসউদ্দীন, সাবেক সম্পাদক, মীযান পত্রিকা
পূর্ব ঘোষণা অনুযায়ী ১৯৭৩ সালের ৩ আগস্ট সাপ্তাহিক মীযান ১২ পৃষ্ঠার প্রকাশিত হয়। এর পূর্বে আইনগত কারণে আরও দুটি সংখ্যা বের করা হয়েছিল সীমিত সংখ্যায় ও সীমিত পরিসরে। প্রকৃতপক্ষে ৩ আগস্ট ১৯৭৩ সংখ্যাই হল সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকার সূচনাকাল, যা ছাপা হয়েছিল ৩ হাজার কপি। আশা করা হয়েছিল, অন্তত দু-হাজার কপি বিক্রি হয়ে যাবে। বাকি যে হাজার খানেক কপি থেকে যাবে, সেটা পরে প্রচারের কাজে লাগবে। কিন্তু আল্লাহ পাকের অপার রহমতে ৩ হাজার কপি মাত্র ৩-৪ ঘণ্টার মধ্যে বিক্রয় হয়ে যায়, যা ছিল কল্পনার অতীত। এ বিষয়ে আল্লাহ পাকের যতই শুকরিয়া আদায় করা যায়, তা কমই হবে।
ঘটনা হল এই যে, ঘোষণা করা হয়েছিল, ৩ আগস্ট ১৯৭৩ বেলা দু-ঘটিকা হতে সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকার বিক্রয় আরম্ভ হবে। যথাসময়ে তা বিক্রয় আরম্ভ হয় এবং সন্ধ্যার পূর্বেই তা শেষ হয়ে যায়। মাগরিবের নামাযের পর বেশকিছু সংখ্যক লোক পত্রিকা না পেয়ে হতাশ হয়ে ফিরে যান। পরে খবর পাওয়া গেল ওই পত্রিকা এক একটা কপি বাজারে ৫ টাকায় লোক কিনেছে। সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকার সম্পাদক নাসীর আহমেদ সাহেব আমার নিকট এক ইন্টারভিউয়ে তাঁর ওই সময়ের স্মৃতিচারণকালে সাপ্তাহিক মীযান সম্পর্কে বলেন, প্রত্যেক সপ্তাহে মীযান পত্রিকার সংখ্যা বাড়ানো হতে থাকে এবং প্রত্যেক সপ্তাহে তার চাহিদা পূরণ করতে আমরা পারিনি। সাপ্তাহিক পত্রিকার ইতিহাসে এ এক বিরল ঘটনা। মীযান পত্রিকা ছিল বাংলার মুসলমানের আশা, আকাঙ্খার প্রতীক। তাই মানুষের অধীর আগ্রহ থাকত এবং এই পত্রিকা বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তা সংগ্রহ করতে তৎপর হয়ে যেত। মীযান পত্রিকার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য ছিল ইসলামের সুমহান আদর্শকে মানুষের সামনে তুলে ধরা এবং ইসলামের আদর্শ ও নীতি নৈতিকতার আদলে মানব সমাজকে গড়ে তোলা মানুষের কল্যাণে। কারো বিরোধিতা করার হীন উদ্দেশ্য কখনোই নয়। প্রথম দিকে সাপ্তাহিক মীযান ১২ পৃষ্ঠা প্রকাশ হত। মূল্য ছিল ৩৫ পয়সা। মাসে একটা বিশেষ সংখ্যা বের হত ১৬ পৃষ্ঠার, মূল্য ছিল ৫০ পয়সা। পরে কাগজের মূল্য অতি মাত্রায় বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে (যে কাগজের মূল্য ছিল ৩০ টাকা মাত্র, তা একলাফে বেড়ে হয় ১১০ টাকা। তাও সময়মতো পাওয়া যেত না)। তখন পর্যন্ত মীযানের কাগজ বা নিউজপ্রিন্ট কোটা পাওয়া যায়নি। তাই বাধ্য হয়ে মীযানের কলেবর কমিয়ে ৮ পৃষ্ঠা করা হল, মূল্য ৪০ পয়সা।

জনাব রহমত আলী খান, সাবেক সম্পাদক, মীযান পত্রিকা।
মীযান-এর জন্য বরাদ্দ কাগজের কোটা:
বহু চেষ্টায় মীযানের কাগজের কোটা পাওয়া গেল। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল ৪০ হাজার টাকার কাগজ সরকার দেবে, ওই কোটার কাগজ সম্পূর্ণ তুলে নিতে হবে একসঙ্গে। সময় মাত্র এক মাস। যদি এক মাসের মধ্যে ওই টাকা জমা না করা হয় তাহলে কোটা বাতিল হয়ে যাবে। আবার সেই টাকা তোলার অভিযানে সবাই ঝাঁপিয়ে পড়ে। ঘোষণা করা হল এককালীন ঋণ বা দান উভয়ই গ্রহণ করা হবে। অতি কষ্টে যথা সময়ে কোটার অর্থ সংগ্রহ করা হল এবং সম্পূর্ণ কাগজ তোলার ব্যবস্থা করা হল। এ বিষয়ে কলকাতার উর্দূভাষী জামাআতকর্মী ও মুসলমানদের সাহায্য সহযোগিতা তুলনাহীন।
ওই কাগজ পাবার পর আরেক সমস্যা দেখা দেয়। ওই বিপুল পরিমাণ কাগজ রাখা ও সংরক্ষণ করা। অর্থ সংগ্রহ অভিযান ও কোটায় কাগজ পাওয়া এবং তারপর তার সংরক্ষণ বিষয়ে জামাআত কর্মীদের তৎপরতা, প্রচেষ্টা, আন্তরিকতা, ত্যাগ ও কুরবানীর ইতিহাস বেশ বড়। সেগুলো সম্পূর্ণ বর্ণনা করতে গেলে একটা পৃথক পুস্তকের প্রয়োজন। যাহোক, এই অভিযানে যাদের কাছ থেকে ঋণ নেওয়া হয়েছিল, যথাসময়ে তা হিসাব করে পরিশোধ করে দেওয়া হয়।
অচিরেই মীযান প্রকাশের সংখ্যা ৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। যা পশ্চিমবাংলা তথা ভারতের সীমা ছাড়িয়ে বাংলাদেশ, নেপাল, সৌদি আরব ও আরব বিশ্বের অন্যান্য দেশ লন্ডন, আমেরিকা যেতে থাকে। সাপ্তাহিক মীযানের সব কাজ ২২/১ ধর্মতলা স্ট্রীট, জামাআতে ইসলামী হিন্দের অফিস থেকেই চলত। যেখানে মীযান পত্রিকার স্থান ছিল খুবই অপ্রতুল। মীযান পত্রিকা তথা বিআইপিটি-র জন্য একটি স্বতন্ত্র অফিস খুব জরুরি হয়ে পড়ে। অর্থাভাবে উপযুক্ত জায়গা পাওয়া খুবই কঠিন। এমতাবস্থায় প্রতিষ্ঠাতা ট্রাস্ট সেক্রেটারি সৈয়দ আলি সাহেব নিজ ব্যবসা ও অন্যান্য কাজের চাপে পড়ে তার পক্ষে মীযান পত্রিকা ও ট্রাস্টের জন্য সময় দেওয়া খুব মুশকিল হয়ে দাঁড়ায়। ফলে তিনি সেক্রেটারি পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। এ বিষয়ে আমীরে হালকা ও জামাআতের কর্মকর্তাদের অবগত করেন তিনি।

মোহাম্মদ নূরউদ্দীন, সাবেক সম্পাদক, মীযান পত্রিকা।
ট্রাস্ট সেক্রেটারি পরিবর্তন:
আমীরে হালকা ও জামাআতের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি ও ট্রাস্টিরা মিলে সিদ্ধান্ত নেন, মুহাম্মদ জাফর সাহেবকে ট্রাস্টের সেক্রেটারি করা হোক। তিনি সেক্রেটারি হবার পর সাপ্তাহিক মীযান ও ট্রাস্টের অন্যান্য বিষয়গুলি খতিয়ে দেখে সমস্যাগুলি দূর করার চেষ্টা করেন। সর্বপ্রথম সবথেকে বড় যে সমস্যা তাঁর সামনে আসে তা হল, ট্রাস্ট ও মীযানের জন্য একটা পৃথক অফিস। এ জন্য যদি কোনো ভাল জায়গার ব্যবস্থা করা যায়, তাহলে সব সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে যাবে। তিনি এই বিষয়টি সর্বাধিক গুরুত্ব দিয়ে প্রচেষ্টা চালান। তাঁর আন্তরিক তৎপরতা ও প্রচেষ্টা আল্লাহপাক কবুল করুন। তাই তিনি ২২/১ ধর্মতলা স্ট্রীট বর্তমান লেনিন সরণী, যেখানে রাজ্য জামাআত অফিস অবস্থিত, তার অতি নিকটে ওই চত্ত্বরে একটি বাড়ির সন্ধান পান। যা বর্তমান মীযান অফিস এবং বিআইপিটি-র অফিসও বটে। ২৭-বি লেনিন সরণী, বাংলা ইসলামী ট্রাস্ট ও প্রকাশনালয় অবস্থিত। এই বাড়িটি ট্রাস্ট ও মীযানের জন্য লিজ নেন। বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্ট ও মীযান পত্রিকার জন্য এটা সবথেকে বড় পদক্ষেপ। (সেইসঙ্গে বাংলা ইসলামী প্রকাশনী ট্রাস্টের জন্য একটি প্রেস বা ছাপাখানা, বাইন্ডিংখানা তৈরি করেছিলেন এই বিল্ডিংয়েই। এই প্রেসের নাম ছিল বিআইপিটি প্রেস। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, বিশেষ কারণে সেই প্রেস ও বাইন্ডিংখানা পরে বন্ধ হয়ে যায়)। তার এই কাজের জন্য আল্লাহ তায়ালার নিকট দোওয়া জানাই। আল্লাহ তাঁকে জাযায়ে খায়ের দান করুন। বর্তমানে ওই বাড়িটিকে আরও সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে সর্বাঙ্গীন সুন্দর করার চেষ্টা করেছেন প্রাক্তন আমীরে হালকা মাওলানা আব্দুর রফিক সাহেব, তাঁর শূরার সদস্যগণ, ট্রাস্টিগণ ও মীযান তথা বিআইপিটি-র কর্মীবৃন্দ। তাঁদের সবাইকে মুবারকবাদ জানাই ও জাযায়ে খায়েরের দোওয়া করি। মীযান একটি অতি উচ্চ মানের সাপ্তাহিক পত্রিকা, যা সকল মানুষকে কল্যাণের পথে দিশারী। তাই এই পত্রিকাটি পাঠ করার জন্য সর্বস্তরের মানুষকে আহ্বান জানাই। মুহাম্মদ জাফর সাহেব ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন না। ১৯৭৪ সালে ট্রাস্টের অন্যতম সদস্য সৈয়দ বদরুদ্দোজা সাহেব ইন্তেকাল করেন। বদরুদ্দোজা সাহেব ও জাফর সাহেব কলকাতার তালতলা অঞ্চলে একই এলাকায় থাকতেন। বৃদ্ধ অবস্থায় বদরুদ্দোজা সাহেবকে প্রভুত সাহায্য সহযোগিতা করেন তিনি। বদরুদ্দোজা সাহেবের ইন্তেকালে তাঁর কাফন-দাফনের সকল দায়-দায়িত্ব মুহাম্মদ জাফর সাহেব গ্রহণ করেন ও তাঁকে সর্বতোভাবে সাহায্য করেন জামাআত কর্মীগণ। বদরুদ্দোজা সাহেবের পুত্রগণ বিদেশে থাকায় অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়। তাঁর ইন্তেকালে বিআইপিটি-র একটা সদস্যপদ শূন্য হয়। ওই পদে মুহাম্মদ জাফর সাহেবকে ট্রাস্টের সদস্য করা হয়। পরে তিনি ট্রাস্টের সেক্রেটারিও হন।

ডা. মসিহুর রহমান, বর্তমান সম্পাদক, মীযান পত্রিকা।
১৯৭৩ সালে সাপ্তাহিক মীযান পত্রিকা ধারাবাহিকভাবে বের হওয়ায় জামাআতে ইসলামী হিন্দ পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য শাখার প্রচার-প্রসার ব্যাপক বৃদ্ধি পায়। ফলে সারা বাংলায় জামাআতে ইসলামী হিন্দ এর নাম প্রচার হয়ে যায়। রাজ্যের সব জেলায় সংগঠন গড়ে ওঠে। রুকনের সংখ্যাও অনেকগুণ বেড়ে যায়।








