কমিউনিস্ট পার্টির ১০৫ বছরের ইতিহাস
মহম্মদ সেলিম
ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি তৈরি হয়েছিল ১৯২০ সালের ১৭ অক্টোবর তাসখন্দে। এবার পার্টির ১০৫ বছর পূর্তি। ভারত তথা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, অগ্রগতি, অভিজ্ঞতা উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেছে। এখনও তা করে চলেছে।
প্রেক্ষাপট: ১৯১৭ সালে সোভিয়েতে বিপ্লব হয়। ভি.আই লেনিন এবং বলশেভিক পার্টির পরিচালনায় সংগঠিত সেই বিপ্লবের প্রভাব পড়েছিল ভারত-সহ অনেক দেশে। দেশ তখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের অধীনে। মূলত কংগ্রেসের নেতৃত্বে ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলন চলছিল। ১৯১৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে দেশে ফিরে কিছুদিন পর থেকে কংগ্রেসের নেতৃত্ব দিতে শুরু করেন গান্ধীজি। ১৯১৯-এ জালিয়ানওয়ালাবাগে ব্রিটিশের বর্বরতার প্রতিবাদে গর্জে ওঠে গোটা দেশ। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ব্রিটিশের দেওয়া খেতাব পরিত্যাগ করেন। গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। সেই সময়েই খিলাফৎ আন্দোলন গড়ে ওঠে, যা হিন্দু-মুসলমান ঐক্যের বার্তা দিয়েছিল।
চৌরিচৌরার ঘটনার পর গান্ধীজী অসহযোগ আন্দোলন প্রত্যাহার করেন। এই সিদ্ধান্তে স্বাধীনতাকামী মানুষের মধ্যে তৈরি হয় নৈরাশ্য। হতাশা, নৈরাশ্য কাটিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের একাংশ সশস্ত্র সংগ্রামের পথে দেশের স্বাধীনতার লক্ষ্যে সংগঠিত হতে থাকেন। সেই পথেই গড়ে ওঠে ‘নও-জওয়ান ভারত সভা’। ভগৎ সিং, রাজগুরু, আসফাকউল্লাহ খান, চন্দ্রশেখর আজাদ প্রমুখ ছিলেন তার সংগঠক। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মীরা গান্ধীজীর নেতৃত্বাধীন অহিংস পথে আন্দোলনে অংশ নিয়েছেন। তাঁরা কংগ্রেসের মঞ্চে যুক্ত থেকেছেন। আবার সশস্ত্র সংগ্রামের পথে অগ্রণী স্বাধীনতা সংগ্রামীদের মধ্যেও সাম্যবাদের আদর্শ প্রচার করেছেন। হিন্দুস্তান সোশালিস্ট রিপাবলিকান আর্মির (পূর্বে ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মি) সদস্য বিপ্লবীদের মধ্যে সাম্যবাদী দর্শনের প্রভাব ছিল। পরবর্তীকালে সশস্ত্র বিপ্লবীদের অনেকেই আন্দামানের সেলুলার-সহ দেশের বিভিন্ন জেলে মার্কসবাদ অনুশীলনের মাধ্যমে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দেন।
১৯২১-এ কংগ্রেসের আমেদাবাদ অধিবেশনেই প্রথম ‘পূর্ণ স্বরাজ’-এর দাবি ওঠে। মৌলানা হসরৎ মোহানি এবং স্বামী কুমারানন্দ, দুই কমিউনিস্ট সেই দাবি তুলেছিলেন। প্রতিষ্ঠার সময় থেকেই কমিউনিস্ট পার্টিকে দমনের চেষ্টা চালিয়েছে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা। ১৯২০ থেকে ১৯২৪ কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে চারটি ‘ষড়যন্ত্র’ মামলা করে ব্রিটিশ। তারপর মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা। ১৯২৯-এর ১৯ মার্চ মাঝ রাতে জারি হল গ্রেপ্তারি পরোয়ানা। ২০ মার্চ ভোর থেকে শুরু হল দেশজুড়ে কমিউনিস্টদের গ্রেপ্তার। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলা হয়ে উঠল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের দমননীতি এবং কমিউনিস্টদের দেশপ্রেমিক চরিত্রের এক প্রমাণ। সম্প্রতি সীতারাম ইয়েচুরি স্মারক বক্তৃতায় প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ ইরফান হাবিব তাঁর বাবার সূত্রে একটা কথা বলেছেন। ইরফান হাবিবের বাবার কাছে পরবর্তীকালে মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার অন্যতম বিচারক বলেছিলেন তিনি সেই সময় রাতে ঘুমোতে পারেননি। এইভাবেই শাসকরা কমিউনিস্টদের বিরুদ্ধে বিচার ব্যবস্থাকে কুক্ষিগত করে ব্যবহার করে। ভারতে ব্রিটিশের গোয়েন্দা প্রধান এইচ উইলিয়ামসনের লেখা ‘ইন্ডিয়া অ্যান্ড কমিউনিজম’ বইটি প্রকাশিত হয় ১৯৩৩ সালে। বইটির ভূমিকায় লেখা ছিল ‘হোয়াট ইজ কমিউনিজম?’’ উত্তরে লেখা ছিল, ‘গ্রেটেস্ট ডেঞ্জার টু দ্য সিভিলাইজেশন অব দ্য মর্ডার্ন ওয়ার্ল্ড’।
একটি বিষয় এখানে তাৎপর্যপূর্ণ। ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি গঠনের আগে থেকেই দেশে সাম্প্রদায়িকতা দেখা গেছে। হিন্দু মহাসভা তৈরি হয়েছে। তারপর ১৯২৫ সালে আরএসএস তৈরি হয়েছে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদ কমিউনিস্টদের ‘গ্রেটেস্ট ডেঞ্জার’ মনে করেছে। অনেকগুলি মামলা করেছে। পার্টিকে নিষিদ্ধ করেছে একাধিকবার। কিন্তু কোনও সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি, নিষিদ্ধ ঘোষণা তো অনেক দূরের কথা।
প্রস্তুতি পর্ব: ১৯২০-তে তাসখন্দে পার্টি গড়ে তোলার সময়েই কলকাতা, বম্বে, লাহোর এবং মাদ্রাজ – এই চার জায়গায় কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার কাজ শুরু হয়। প্রথম থেকেই কমিউনিস্টরা শ্রমিক, কৃষক ও পিছিয়েপড়া, নিপীড়িত মানুষকে স্বাধীনতা সংগ্রামে সংগঠিত করার উদ্যোগ নিয়েছেন। ১৯২৮ সালে কলকাতার পার্ক সার্কাসে কংগ্রেসের অধিবেশন বসে। শহীদ মিনার, তৎকালীন মনুমেন্ট-এর সামনে থেকে হাজারো শ্রমিক মিছিল করে কংগ্রেসের অধিবেশনে পৌঁছান। তাঁদের মেজাজ দেখে অধিবেশনে তাঁদের প্রবেশের অনুমতি দিতে বাধ্য হন কংগ্রেস নেতৃত্ব।
চটকল, সুতাকল-সহ বিভিন্ন কারখানার শ্রমিকদের মুখে সেদিন স্লোগান ছিল ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’,‘পূর্ণ স্বরাজ চাই’ ইত্যাদি। সেই বিরাট মিছিলের নেতৃত্বে ছিলেন মুজফ্ফর আহ্মদ, আবদুল হালিম, বঙ্কিম মুখার্জি, রাধারমণ মিত্র প্রমুখ কমিউনিস্ট নেতা। সেই সময়ের আগেই শ্রমিকরা ধর্মঘট করেছেন কারখানাগুলিতে। কলকাতায় গাড়োয়ান ধর্মঘটের সংগঠকও ছিলেন কমিউনিস্টরা। মীরাট ষড়যন্ত্র মামলার সময় বোঝা যায় কমিউনিস্টরা বন্দর এলাকাকে মতাদর্শ প্রচারের মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করেছে। বন্দরে নজরদারি এড়িয়ে নানা দেশ থেকে সংবাদপত্র ও বইপত্র আনা নেওয়ার সুযোগ ছিল। সাথে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধরনের মানুষের মধ্যে মিশে থাকার সুবিধা। তাই বন্দর শ্রমিকদেরও বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে সংগঠিত করেছিলেন কমিউনিস্টরা।
কমিউনিস্ট পার্টি গোড়া থেকেই সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী। শুধু তাই নয়, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী আন্দোলনে সমাজের সব শোষিত মানুষকে যুক্ত করার লক্ষ্যেই কমিউনিস্ট পার্টি পরিচালিত হয়েছে। সেই সময়ে সীমিত রসদ নিয়েও কমিউনিস্ট পার্টি পত্রিকা, বই, পুস্তিকা প্রকাশ, ছাপাখানা গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছে। প্রতিটি ঘটনায় পার্টি নিজস্ব অবস্থান নিয়েছে এবং তা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা করেছে।
সুমহান ঐতিহ্যের উত্তরাধিকার: এখনও পার্টি সেই ঐতিহ্য বহন করে চলেছে। ফিলিস্তিনে লাগাতার হামলা চালাচ্ছে ইসরাইলের যায়নবাদী, সাম্রাজ্যবাদী শাসকরা। তাদের মদত দিচ্ছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ এবং অন্যান্য পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলি। সেখানে শিশু, নারী-সহ সব মানুষকে গণহত্যা করছে এই অশুভ শক্তি। এমনকি শিক্ষক, চিকিৎসক, সাংবাদিকরাও রেহাই পাচ্ছেন না। ফিলিস্তিনিদের নিজভূমে পরবাসী করছে এই সাম্রাজ্যবাদী যায়নবাদী শক্তি। কমিউনিস্ট পার্টি বরাবর ফিলিস্তিনের স্বাধীনতা, তাদের অধিকারের পক্ষে থেকেছে। তাঁদের পক্ষে লড়াই করেছে।
সোভিয়েত রাশিয়া এবং পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের সাময়িক বিপর্যয়ের পর পৃথিবীতে দক্ষিণপন্থার আগ্রাসন বেড়েছে। এখনও তা জারি আছে। তবে এখন বিভিন্ন দেশে দক্ষিণপন্থী শাসকদের নীতির বিরুদ্ধে মানুষ আন্দোলনে সোচ্চার হচ্ছেন। কিন্তু সামগ্রিকভাবে দক্ষিণপন্থী আগ্রাসনের এই যুগেও পৃথিবীজুড়ে কমিউনিস্টরা ফিলিস্তিন-সহ বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী, গণতন্ত্রপ্রিয় মানুষের লড়াইয়ের পাশে থেকেছে। কিউবা, ভিয়েতনাম, দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষের মুক্তি সংগ্রামের সংহতিতে ভারতের কমিউনিস্টরা স্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। দক্ষিণপন্থী শক্তিগুলি নানাভাবে এর বিরুদ্ধে মিডিয়া-সহ নানা ডিজিটাল ও অনলাইন মাধ্যমকে ব্যবহার করে আমাদের বিরুদ্ধে বিরূপ ধারণা গড়ে তোলার চক্রান্ত চলছে।
কিন্তু আমাদের পার্টি সেই সব দেশের মানুষের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার কাজে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে এবং করছে। বিভিন্ন দেশে তা যতটা হচ্ছে, আমাদের দেশে হয়ত ততটা হয়নি। কারণ, সুপরিকল্পিতভাবে আমাদের দেশে কমিউনিস্ট-সহ বামপন্থীদের দুর্বল করা হয়েছে। তবু আমরা সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে, সমাজতন্ত্রের পক্ষে আমাদের সংগ্রাম জারি রেখেছি। চলবে








