নেপালের কোনো স্বাধীনতা দিবস নেই
অনির্বাণ বন্দ্যোপাধ্যায়
নেপালের কোনো স্বাধীনতা দিবস নেই। কারণ, নেপাল কখনো বিদেশি শাসক দ্বারা শাসিত হয়নি। শুরু থেকেই নেপাল নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে রাখতে সক্ষম হয়েছে। যদিও সেই চতুর্দশ শতক থেকে বারবার আক্রমণের মুখে পড়েছে ভারতের নিকটতম প্রতিবেশী পর্বতবেষ্ঠিত এই ছোট্ট দেশটি। ১৩৪৯ সালে শামসুদ্দিন ইলিয়াস কাঠমান্ডু আক্রমণ করেন। কিন্তু গোর্খা সেনা সেই হামলা রুখে দেয়। অষ্টাদশ শতাব্দীতে মীর কাশিম নেপাল আক্রমণ করেন। কিন্তু এবারও গোর্খাদের সঙ্গে লড়াইয়ে রণে ভঙ্গ দেন তাঁরা। এমনকি নেপালের বাইরে ভারতীয় উপমহাদেশের কোনো হিন্দু রাজারও স্পর্ধা হয়নি নেপালকে কব্জা করতে। তথাকথিত ‘হিন্দুবীর’ শিবাজীরও স্পর্ধা হয়নি। এমনকী আওরঙ্গজেবও পারেনি।
১৭৫৭ সালে পলাশীর যুদ্ধে নবাব সিরাজুদ্দৌলার বাহিনী পরাজিত হলে ভারতের স্বাধীনতার সূর্য অস্ত যায়। বণিকের মানদণ্ড রাজদণ্ড রূপে দেখা দেয়। ব্রিটিশদের ‘টার্গেট’ ছিল নেপালের দিকেও। ১৮১৪ থেকে ১৮১৬ সাল পর্যন্ত দু-বছর ধরে চলে দুর্দান্ত লড়াই। কিন্তু গোর্খা যুদ্ধ নামে খ্যাত সেই যুদ্ধের সেই অর্থে কোনও নিষ্পত্তি হয়নি। তবে সুগৌলির চুক্তির মাধ্যমে কুমায়ূন ও গাড়োয়াল অঞ্চল ব্রিটিশদের হাতে তুলে দেয় নেপাল। তার বিনিময়ে ব্রিটিশরা প্রতিশ্রুতি দেয়, তারা আর নেপাল আক্রমণ করবে না। এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড দিতে হলেও শেষপর্যন্ত এভাবেই বাকি অংশের স্বাধীনতা রক্ষা করেছিল নেপালিরা। অমর সিংহ থাপা, বলভদ্র কানওয়ার, ভক্তি থাপা নামগুলি থেকে গিয়েছে নেপালের সেই সংগ্রামের তিন যোদ্ধা হিসেবে। কিন্তু সত্যিই কি কেবল নেপালিদের শৌর্যেই পিছু হটেছিল দুর্ধর্ষ ব্রিটিশ সেনা। তা বললে সত্যের অপলাপ করা হবে।
আসলে চীন ও ব্রিটিশদের অধীনস্থ ভারতের মাঝে নেপাল হয়ে উঠেছিল এক বাফার রাষ্ট্র। কাজেই আরেক সাম্রাজ্যবাদীর সংস্পর্শে না থেকে মাঝখানে নেপালকে রাখাই যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেছিল ব্রিটিশরা। তবে সেই সঙ্গেই তারা গোর্খা সৈন্যদের ব্রিটিশ বাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে। পাশাপাশি নেপালের প্রাকৃতিক সম্পদও ব্যবহার করেছিল। কিন্তু নেপালের কোনও বিশেষ অর্থনৈতিক সম্পদ ছিল না। ফলে ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ সিংহ বুঝতে পেরেছিল ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যা, তাতে নেপাল দখল না করাই তাদের জন্য সুবিধাজনক হবে।
ইতিহাসে কিন্তু ওই একটিই ব্রিটিশ-গোর্খা যুদ্ধ নয়। বরং আরও আগে, ১৭৬৭ সালেও তাদের মধ্যে লড়াই হয়। কাঠমান্ডুর রাজা ও ব্রিটিশদের মধ্যে বাণিজ্যিক সম্পর্ক স্থাপিত হওয়ার পর যখন গোর্খালিরা রাজার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে, তখন ব্রিটিশ সাহেবরা রাজা হয়ে লড়তে সম্মত হয়। ব্রিটিশ বাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন ক্যাপ্টেন কিনলক। যুদ্ধে গোর্খালিরা বিপুলভাবে জয়লাভ করে। হাজারেরও বেশি ব্রিটিশ সৈন্যের মৃত্যু হয়। বাকিরা পালিয়ে বাঁচে।
মনে রাখতে হবে, ঊনবিংশ শতাব্দীর সেই সময়টায় ভারতীয় উপমহাদেশে দু’টিই প্রধান শক্তি ছিল। একদিকে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি। অন্যদিকে নেপালের গোর্খালি সেনা। তবে দ্বিতীয়বারের যুদ্ধের ফলাফল যা হয়েছিল, তাতে শেষ পর্যন্ত ক্ষতি হয়েছিল গোর্খালিদেরই। স্বাধীনতা বজায় রাখতে পারলেও তাদের খোয়াতে হয়েছিল এক-তৃতীয়াংশ ভূখণ্ড।
নাগরিক হতে হলে নেপালের গোর্খাদের মতো হতে হবে, যারা নিজের দেশকে বিদেশি শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করতে পারে। তাই ভারতীয় সেনাবাহিনীর গোর্খা রেজিমেন্ট বিশেষ সমীহ আদায় করে নিয়েছে।








