ভাবতে হবে বৈকি
ব্যতিক্রম ব্যতিরেকে বলছি। কুরআন নিয়ে ছেলেখেলা বন্ধ হোক। ফেসবুকে মাঝে মধ্যেই একটা লেখা পায়চারি করে। সেখানে বলা হয়, অমুক সূরা এতবার পড়লে বা তিলাওয়াত করলে এতবার কুরআন খতমের সাওয়াব পাওয়া যায়। অথবা রাতে ঘুমানোর আগে অমুক সূরা এতবার পড়ে বিছানায় গেলে নাকি সারা রাত কুরআন তিলাওয়াতের সমান সওয়াব পাওয়া যায়। অমুক দুয়া, দরুদ এতবার পড়লে বিপদ বা বালা মুসিবত দূর হয়।
বন্ধুগণ, কুরআন এভাবে তিলাওয়াত বা খতম করার জন্য আসেনি। কুরআন তথাকথিত অর্থে আর পাঁচটার মতো তথাকথিত অর্থে কেবল ধর্মগ্রন্থ নয়। কুরআন হল পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। বিশ্ব মানবতার মুক্তির দিশা। কুরআন অধ্যয়ন করে তার মানে-মতলব উপলব্ধি করতে হবে, হৃদয়ঙ্গম করতে হবে এবং নিজেদের জীবনে সেইমতো আমল করতে হবে। অনুবাদ না পড়ে, মানে না বুঝে কেবলমাত্র তিলাওয়াত বা খতম করার মধ্যে হয়ত কিছু সওয়াব আছে, কিন্তু খুব বেশি কল্যাণ নেই। এভাবে কুরআনের হক আদায় হতে পারে না।
এই পদ্ধতি আসলে মুসলমানদেরকে কুরআন তথা সঠিক ইসলাম থেকে গাফেল বা গুমরাহ করে রাখার জন্য ইহুদি-খ্রিস্টানদের আমদানি করা টোটকা। দুঃখের হলেও সত্যি যে, কিছু মুরুব্বী, বুজুর্গ, আলেম, মাওলানা, ওয়াজিন, পীর-দরবেশ এই তত্ত্ব কায়মনোবাক্যে মেনে নিয়েছেন এবং তাদের অনুগামীদেরকে ভয় দেখাচ্ছেন যে, আল্লাহর কুরআন মাতৃভাষায় বুঝতে চেষ্টা করা ঠিক নয়। সহীহ উচ্চারণ-সহ আরবি কুরআন পড়তে হবে। নিজের ভাষায় পড়ে মানে বোঝার চেষ্টা করতে গিয়ে বিন্দুমাত্র ভুল-ত্রুটি হয়ে গেলে মারাত্মক গুনাহ হয়ে যাবে। তাই মানে না বুঝে দুলে দুলে কেবল তিলাওয়াত করতে থাকে, অক্ষরে অক্ষরে নেকী।
অথচ আল্লাহ বলেছেন, তিনি যুগে যুগে নবী-রাসুল পাঠিয়েছেন সেইসব জনজাতির মাতৃভাষায়, যাতে তারা আল্লাহর বাণী সহজে বুঝতে পারে। কুরআন ছাড়া আর যে তিনটি ঐশী কিতাবের নাম জানা যায় – তাওরাত, যাবুর, ইনজীল কোনোটাই আরবি ভাষায় নাযিল হয়নি। আসল কথা হল আমআদমি কুরআন বুঝে ফেললে ঘোড়া ডিঙিয়ে ঘাস খাওয়ার চেষ্টা করবে, হুজুরদের ভুল ধরবে। তখন আল্লাহওয়ালা সেজে থাকা এইসব বাবাজীদের কেরামতি বা ক্যারিশমা খতম হয়ে যাবে। ওনাদের বিনা পুঁজির কারবার লাটে উঠে যাবে।
তবে এটা অনস্বীকার্য যে, নিঃসন্দেহে ওনারা কুরআনকে খুবই সম্মান করেন, পবিত্র ঐশী গ্রন্থ বলে মনে করেন। তাই পাছে কেউ না-পাক অবস্থায় স্পর্শ না করে ফেলে, সেজন্য ঘরের উঁচু জায়গায় রেখে দেন মহাবিশ্বের মহাবিস্ময় আল কুরআনকে। মাঝে মধ্যে নিয়ম করে তিলাওয়াত করেন এবং রেহেলের ওপর রেখে সুন্দর গেলাফে মুড়ে বা বাক্সে ভরে স্নেহভরে চুম্বন করে রেখে দেন।
অনেকে বলেন, কুরআন হাতে নিলে সাওয়াব, স্পর্শ করলে সাওয়াব, চুমা দিলে সাওয়াব, দেখলে সাওয়াব, পড়লে সাওয়াব, প্রতিটা হরফে সাওয়াব বা নেকী আছে। অর্থাৎ কুরআনকে আমরা সওয়াবের খনি বা ভান্ডার হিসাবেই ভাবতে অভ্যস্ত। অথচ কুরআন নিজে দাবি করছে, আমি এসেছি হেদায়াতের জন্য। নেকী বা সাওয়াব তো এমনিতেই হবে। যেমন গরু পোষা হয় মূলত দুধের জন্য, গোবর বা ঘুঁটে তো এমনিই পাওয়া যাবে। ঘুঁটে বা জ্বালানির জন্য কেউ গরু পোষে না।
আমরা হতভাগার দল কুরআনকে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগের কথা ভাবি না। কুরআনকে আমরা পানি পড়া, তেল পড়া, জ্বীন-ভূত তাড়াতে, ভিটের দোষ কাটাতে, ঘর বন্দনা করতে, জাদু টোনা, বশীকরণ, ঝাড়ফুঁক তুকতাক, তাবিজ-তুমার, কবজ করতে ব্যবহার করছি। এসব নিয়ে রীতিমত রমরমা ধান্দা ফেঁদে বসছেন অনেকে। তাদের এলাহী ব্যাপার। অথচ কুরআনকে নিয়ে এমন বিজনেস করার ছাড়পত্র আল্লাহ দেননি। তাই কুরআনকে নিয়ে এমন ব্যবসা কোনো নবী, রাসূল বা সাহাবা করেননি। ওনারা ছিলেন চলমান কুরআন। কুরআনের গাইডলাইন মেনে চলে দেখিয়ে দিয়ে গেছেন। কুরআনকে তাঁরা রোডম্যাপ হিসাবে ব্যবহার করেছেন।
কুরআনকে ব্যবসার পুঁজি হিসেবে ব্যবহার করা হতে থাকলে আল্লাহ যে উদ্যেশ্যে কুরআন পাঠিয়েছেন, সেই লক্ষ্য কস্মিনকালেও পূরণ হবে না। আর এই ব্যর্থতার জন্য আমরা মুসলমানরাই দায়ী। কাল কেয়ামতে এর জন্য আমাদেরকে কাঠগড়ায় তোলা হবে এবং কঠিনতম সাজা পেতে হবে।
আমাদের এত স্পর্ধা হয় কোথা থেকে? কুরআন যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য নিয়ে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন পাঠিয়েছেন, আমরা তাকে বাতিল বা খারিজ করে দিচ্ছি। তাহলে আমরা আল্লাহর কেমন বান্দাহ? আমরা কেমন মুসলমান? অবিলম্বে এই ধৃষ্টতার অবসান হওয়া উচিৎ।
পৃথিবীতে এমন কোনো বই, পুস্তক, পত্র-পত্রিকা, ম্যাগাজিন, সংবাদপত্র নেই – যেগুলো কোনো মানুষ না বুঝেই পড়ে। একমাত্র ব্যতিক্রম মহাগ্রন্থ কুরআন। এখানে ভাবার বিষয় হল, আমরা প্যান কার্ড, আধার কার্ড, রেশন কার্ড থেকে শুরু করে জমি বাড়ির দলিল, পর্চা, খতিয়ান, মিউটেশন, ব্যাংকের হিসাব-নিকাশ, ট্যাক্স, শেয়ার বাজার, সরকারি বাজেট ইত্যাদি কতকিছু জটিল বিষয় অক্ষরে অক্ষরে বুঝে নিই, অথচ কুরআনের ক্ষেত্রে অজুহাত দেখাই যে, আরবি একটা বিদেশী ভাষা, কীভাবে ব্যাকরণসম্মত উপায়ে মানে বুঝব? ভুল-ভ্রান্তি হলে তো আল্লাহর সঙ্গে বেয়াদপি হয়ে যাবে। নাউজুবিল্লাহ…। আল্লাহ কিন্তু এই অজুহাত শুনবেন না।
দেশ বিদেশের কোথাও কেউ কুরআন, ইসলাম বা মহানবীকে কটাক্ষ করলে বা অপমানজনক, কুরুচিকর, অবমাননাকর কথা বললে আমরা সোশ্যাল মিডিয়ায় খুব দাপাদাপি বা লম্ফঝম্ফ শুরু করি। কিন্তু আমরা মুসলমানরা অধিকাংশই কুরআন মেনে চলার চেষ্টা করি না, বা মহানবী (সা.)-এর শিক্ষা ও আদর্শ নিয়ে সেই মোতাবেক চলি না। তাহলে আমরাও তো পরোক্ষ অবমাননাকারী। নূপুর শর্মাকে দোষ দিয়ে কী লাভ?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমরা দুনিয়াবি স্বার্থ বা লাভ ক্ষতির অঙ্ক দেখি, কিন্তু কুরআন হাদীসের বিধান দেখি না। লোকে কী বলবে, এই ভেবে বাপ-দাদার আমল থেকে চলে আসা রশম রেওয়াজ অন্ধভাবে পালন করি। হোক সেগুলো শিরক, বিদআত – তবুও আপত্তি নেই। সওয়াবের আশায় আমরা সেগুলোই অবলীলায় করে চলেছি। তাহলে আমরা কোথায় মুসলমান? কতটুকু মুসলমান? আমরা তো মুসলমান হয়ে আল্লাহ, কুরআন, ইসলাম ও নবীজি (সা.)-কে সজ্ঞানে জিন্দেগিভর অবমাননা করেই চলেছি।
অথচ মুখে বলি আমরা মুসলমান, আমরা আল্লাহর বান্দা, আমরা শেষ নবীর উম্মত ইত্যাদি। এভাবে আমরা নিজেদের সঙ্গেই নিরন্তর গাদ্দারী বা বিশ্বাসঘাতকতা করে চলেছি। এখন কথা হল, কুরআন তিলাওয়াত বা খতম করা উচিত নয়, এতে কোনো কল্যাণ বা সাওয়াব নেই – এমনটা নয়। কথা হল, কুরআন আল্লাহর তরফ থেকে মানুষের জন্য পাঠানো হয়েছে পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান বা গাইড লাইন হিসাবে। জীবনে চলার পথে প্রতি পদক্ষেপ কুরআনকে পাথেয় করতে হবে।
কুরআন হল আমাদের লিখিত সংবিধান। এখান থেকে জীবনের সব ক্ষেত্রে ফয়সালা নিতে হবে। এই সংবিধানের আলোকেই চলবে আমাদের বিবেকের আদালত। আল্লাহ যেন আমাদের সকলকে কুরআন বুঝে পড়ার ও সেই মতো আমল করার তাওফীক দেন। আমীন।








