সিনেমা সমাজের আয়না, নাকি বিনোদনের বাজার?
বিশ্বজিৎ বৈদ্য
বিশ্বসভ্যতার ইতিহাসে শিল্পের প্রতিটি রূপই সমাজকে বোঝার এক বিশেষ মাধ্যম হিসেবে কাজ করে থাকে। চিত্রকলা, ভাস্কর্য, সংগীত কিংবা সাহিত্য — সবই এক অর্থে সময়ের মানসিকতা, বিশ্বাস ও দ্বন্দ্বকে ধারণ করে। বিংশ শতাব্দীর সূচনায় আবির্ভূত সিনেমা বা চলচ্চিত্রও সেই একই ধারার উত্তরসূরি, তবে একে আধুনিকতার পরম প্রতীক বলা চলে। কারণ, সাহিত্য বা চিত্রকলার তুলনায় সিনেমা অনেক দ্রুত ও বহুমাত্রিক উপায়ে বৃহত্তর জনমানসে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম। জন্মলগ্ন থেকেই সিনেমাকে ঘিরে একটি দ্বন্দ্ব প্রবল হয়ে উঠেছে — এটি কি কেবলই বিনোদনের এক মোহময় দুনিয়া, নাকি সমাজের অন্তর্লীন স্রোতকে প্রতিফলিত করার আয়না? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার জন্য সিনেমার ইতিহাস, সমাজবিজ্ঞান, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতার দিকে সমান্তরালে দৃষ্টি দিতে হবে।
চলচ্চিত্রের জন্ম ১৮৯৫ সালে, যখন লুমিয়ের ভ্রাতৃদ্বয় ফ্রান্সে তাঁদের সংক্ষিপ্ত দৃশ্যচিত্র প্রদর্শন করেন। শুরুর সেই সময় সিনেমা ছিল নিছক চমকপ্রদ দৃশ্যাবলী প্রদর্শনের একটি প্রযুক্তি, যেখানে ট্রেনের আগমন বা কারখানার শ্রমিকদের বেরোনোই ছিল দর্শকের বিস্ময়ের কেন্দ্রবিন্দু। কিন্তু অচিরেই চলচ্চিত্রকারেরা উপলব্ধি করেন, ক্যামেরার এই যন্ত্র কেবল চিত্রধারণে সীমাবদ্ধ নয়, এটি মানুষের অভিজ্ঞতা, অনুভূতি, সংগ্রাম ও সামাজিক বাস্তবতার দলিল রচনাতেও সক্ষম। সেখান থেকেই ধীরে ধীরে সিনেমা হয়ে ওঠে গল্প বলার, বার্তা পৌঁছে দেওয়ার এবং সমাজের অন্তর্লীন অস্থিরতাকে প্রকাশ করার এক অন্যতম মাধ্যম।
ভারতে সিনেমার আগমন ১৯১৩ সালে দাদাসাহেব ফালকের রাজা হরিশচন্দ্র চলচ্চিত্রের মাধ্যমে। তখনকার দিনে ভারতের সামাজিক প্রেক্ষাপট ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের দমননীতি ও জাতীয়তাবাদের উত্থানের সংমিশ্রণে পূর্ণ। ফলে সিনেমাও ক্রমশ জাতীয় চেতনার এক বাহন হয়ে উঠতে শুরু করে। ফালকের পৌরাণিক কাহিনী নির্ভর চলচ্চিত্র দর্শককে কেবল বিনোদনই দেয়নি, বরং একদিকে ঐতিহ্যের প্রতি আস্থা জাগিয়েছে, অন্যদিকে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের বোধকে উসকে দিয়েছে। এই ধারা পরবর্তী কালে আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে যখন প্রমথেশ বড়ুয়া, হিমাংশু রায়, ঋত্বিক ঘটক কিংবা সত্যজিৎ রায় তাঁদের সিনেমার মাধ্যমে সমকালীন সমাজের সংকটকে পর্দায় ফুটিয়ে তোলেন।
আসলে সিনেমাকে সমাজের আয়না বলার প্রমাণ খুঁজতে গেলে আমাদের দেখতে হবে কিভাবে চলচ্চিত্র সময়ের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে আত্মস্থ করেছে। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫০–৬০-এর দশকে ভারতীয় সমাজ ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন, বিভাজনের যন্ত্রণা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের দ্বন্দ্বে ভরপুর। এই সময়ের সিনেমা যেমন রাজ কাপুরের আওয়ারা বা শ্রী ৪২০—শহুরে দারিদ্র্য, বেকারত্ব ও নৈতিক দ্বন্দ্বের প্রতিচ্ছবি তুলে ধরে। অন্যদিকে সত্যজিৎ রায়ের অপু ত্রয়ী (পথের পাঁচালি, অপরাজিত, অপুর সংসার) গ্রামীণ দারিদ্র্য, স্বপ্ন ও বাস্তবতার সংঘাতকে অসামান্য সংবেদনশীলতায় পর্দায় রূপ দিয়েছে। এইসব সিনেমা প্রমাণ করে, চলচ্চিত্র কেবল বিনোদনের উৎস নয়, বরং সমাজতাত্ত্বিক দলিল হিসেবেও কাজ করে।
তবে এখানেই আরেকটি প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—সিনেমা কি সর্বদা সমাজের আয়না হিসেবে কাজ করেছে? নাকি বাজারের চাপ, দর্শকের রুচি ও বিনোদনের চাহিদা তাকে এক ‘পণ্য’তে পরিণত করেছে? বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি থেকে বিশেষত বলিউড বা হলিউডে সিনেমা হয়ে ওঠে এক বিশাল শিল্প, যেখানে প্রযোজনা সংস্থা, তারকা সংস্কৃতি ও বিপুল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ প্রধান চালিকাশক্তি। এই প্রেক্ষাপটে বহু চলচ্চিত্র নির্মাতার প্রধান লক্ষ্য থাকে মুনাফা অর্জন। ফলে বিষয়বস্তু নির্বাচনে সমাজের সমস্যার পরিবর্তে অগ্রাধিকার পায় রোমান্স, অ্যাকশন, কমেডি বা কল্পনার জগৎ। দর্শককে অস্থায়ী স্বস্তি প্রদান করাই হয়ে ওঠে উদ্দেশ্য। এই বাজারকেন্দ্রিক মানসিকতা সিনেমাকে প্রায়শই বাস্তবতা থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যায়।
তবে এখানেই সিনেমার দ্বৈত চরিত্র ফুটে ওঠে। একদিকে এটি নিছক বিনোদনের বাজার, অন্যদিকে সমাজ-রাজনীতি-সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। উদাহরণস্বরূপ, হলিউডের চলচ্চিত্র মডার্ন টাইমস (চার্লি চ্যাপলিন) শিল্পায়নের যুগে শ্রমিকের যন্ত্রনির্ভর জীবনের কাহিনী শোনায়, যা ছিল স্পষ্ট সামাজিক সমালোচনা। আবার একই সঙ্গে হলিউডই তৈরি করেছে অ্যাভেঞ্জারস বা স্পাইডার-ম্যান সিরিজের মতো চলচ্চিত্র, যেখানে মূলত ফ্যান্টাসি ও বাজারজাতকরণই মুখ্য। ভারতের ক্ষেত্রেও আমরা একদিকে পাই ঋত্বিক ঘটকের মেঘে ঢাকা তারা বা মৃণাল সেনের ভুবন সোম — যেখানে সমাজের বঞ্চিত মানুষের কণ্ঠস্বর প্রতিফলিত হয়, অন্যদিকে সমসাময়িক বলিউডে পাই আইটেম গান, অতিরঞ্জিত অ্যাকশন দৃশ্য আর পণ্যায়িত নায়কতন্ত্র।
এখন প্রশ্ন আসে, গবেষণাধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে সিনেমাকে কোন খোপে ফেলা যায়? সমাজবিজ্ঞানের তত্ত্ব বলছে, সিনেমা হলো ‘কালচারাল টেক্সট’ — যেখানে সমাজের প্রচলিত মূল্যবোধ, দ্বন্দ্ব, লিঙ্গবিন্যাস, শ্রেণি বৈষম্য ও রাজনৈতিক মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৭০-এর দশকের ‘অ্যাংরি ইয়ং ম্যান’-এর ভূমিকায় অমিতাভ বচ্চন আসলে ভারতীয় সমাজে দুর্নীতি, বেকারত্ব ও শ্রেণি বৈষম্যের বিরুদ্ধে যুবকের ক্ষোভকে প্রকাশ করেছিলেন। একইভাবে দক্ষিণ ভারতের সিনেমায় ভক্তিমূলক ধারার প্রাবল্য স্থানীয় সামাজিক-ধর্মীয় কাঠামোকে প্রতিফলিত করে। আবার নারীবাদী সিনেমা যেমন দীপা মেহতার ফায়ার বা ওয়াটার ভারতীয় সমাজে নারীর অধিকার ও যৌনতার প্রশ্ন উত্থাপন করে।
অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে সিনেমা নিঃসন্দেহে একটি শক্তিশালী শিল্প। ফিকি (FICCI)-এর রিপোর্ট অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতীয় চলচ্চিত্রশিল্পের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৩,০০০ কোটি টাকা, যা ২০২৫ সালে আরও দ্বিগুণ হওয়ার সম্ভাবনা। এই বিপুল অর্থনৈতিক কাঠামো সিনেমাকে কেবল সমাজচিত্রের দলিল হতে দেয় না, বরং তাকে ভোগ্যপণ্য বানিয়ে ফেলে। একদিকে যেমন স্বাধীন চলচ্চিত্রকারেরা সীমিত বাজেটে বাস্তব সমস্যার সিনেমা নির্মাণ করছেন, অন্যদিকে বড় প্রযোজনা সংস্থা বাজারমুখী ‘মসালা’ ছবিতে কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগ করছে। ফলে সিনেমার ভেতরে সমাজের প্রতিফলন ও বিনোদনের বাজার—দুটি প্রবণতাই পাশাপাশি বিদ্যমান।
ডিজিটাল যুগে এসে সিনেমার চরিত্র আরও জটিল হয়ে উঠেছে। ওটিটি প্ল্যাটফর্ম যেমন নেটফ্লিক্স, আমাজন প্রাইম বা হটস্টার দর্শকের সামনে নতুন ধারা খুলে দিয়েছে। এখানে যেমন সমাজমুখী কনটেন্ট (দ্য কাশ্মীর ফাইলস, আর্টিকেল ১৫, পঞ্চায়েত) তৈরি হচ্ছে, তেমনই বাজারকেন্দ্রিক ওয়েব সিরিজও আসছে যেখানে চটকদার কাহিনী, সহিংসতা ও যৌনতার প্রদর্শনই প্রধান। ফলে প্রশ্ন জটিলতর হয়েছে — সিনেমা আসলে সমাজের আয়না নাকি কেবল বিনোদনের বাজার?
এই দ্বন্দ্বের সমাধান খুঁজতে গেলে আমাদের হয়তো স্বীকার করতে হবে যে সিনেমা একযোগে দুটো ভূমিকা পালন করে। এটি কখনো আয়না, যেখানে সমাজের সুখ-দুঃখ, বৈষম্য, সংগ্রাম ও স্বপ্ন প্রতিফলিত হয়। আবার কখনো এটি এক বিশাল বাজার, যেখানে দর্শকের আবেগকে পুঁজি করে মুনাফা অর্জনই মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে। কিন্তু এখানেই সিনেমার আসল শক্তি নিহিত। কারণ একে কেবল সমাজের আয়না বললে বিনোদনের প্রভাবকে অস্বীকার করা হবে, আর কেবল বাজার বললে সামাজিক প্রতিফলনের শক্তিকে খাটো করা হবে।
তবে সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সিনেমার বাজারমুখী চরিত্রকেও উপেক্ষা করা উচিত নয়, কারণ বিনোদনের মাধ্যম দিয়েই অনেক সময় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক বার্তা ছড়িয়ে দেওয়া যায়। যেমন আমির খানের ‘তারে জমিন পার’ সিনেমাটি ছিল বাণিজ্যিক সাফল্য, কিন্তু একইসঙ্গে এটি শিক্ষাব্যবস্থার ত্রুটি ও ডিসলেক্সিয়া আক্রান্ত শিশুদের সমস্যা নিয়ে সামাজিক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। আবার ‘পিঙ্ক’ বা ‘কাহানির’ মতো ছবিও বিনোদনের পাশাপাশি নারীর প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আলোড়ন তুলেছিল। সুতরাং সিনেমার বাজারকেন্দ্রিক দিকও সঠিকভাবে ব্যবহার করলে সমাজের জন্য ইতিবাচক পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে।
অবশেষে বলা যায়, সিনেমাকে একমাত্রিকভাবে বিচার করা যায় না। এটি একদিকে প্রযুক্তির বিস্ময়, অন্যদিকে শিল্পের পরম রূপ। এর ভেতরেই জড়িয়ে আছে সমাজের ইতিহাস, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও অর্থনৈতিক বাস্তবতা। সিনেমা যেমন আমাদের হাসায়, কাঁদায়, স্বপ্ন দেখায়, তেমনি প্রশ্ন তোলে, প্রতিবাদ গড়ে তোলে, ন্যায়ের দাবি জানায়। তাই সিনেমা কখনো নিছক বিনোদনের বাজার, আবার কখনো সমাজের নির্লজ্জ আয়না। এই দুইয়ের মেলবন্ধনেই সিনেমার প্রকৃত শক্তি নিহিত।
(লেখক: বিদ্যাসাগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক)








