আর কত প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীন হবে ফিলিস্তিন?
শামিম হক মণ্ডল
গত ২১শে সেপ্টেম্বর বৃটেন, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া — ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। এরপর সেই পথে পা বাড়িয়েছে পর্তুগাল, ফ্রান্স। একে একে জাতিসংঘের দেড় শতাধিক সদস্য দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি দিল। মনে পড়ে যাচ্ছে ১৯৪৮ সালের মে মাসের একটা ঘটনা- তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যা ন ১৪ই মে ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করলেন। তার মাত্র ১৫ মিনিটের মা্থায় আমেরিকা এবং আড়াই দিনের মাথায় সমাজতান্ত্রিক রাশিয়াও ইজরায়েলকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এ যেন ধনতান্ত্রিক ও সমাজতান্ত্রিক দুই শক্তিধর রাষ্ট্রের মধ্যেকার চলমান ঠান্ডা লড়াইয়েরই অংশ ।
গত দুই বছর ধরে ইজরায়েলের আগ্রাসনে গাজা প্রায় মাটিতে মিশে গেছে, এর পিছনে আমেরিকার সাহায্য না থাকলে ইজরায়েলের পক্ষে এতদিন ধরে নিধনযজ্ঞ চালানো কার্যত অসম্ভব ছিল; গত এক বছরে আমেরিকা ইজরায়েলে ১৮ মিলিয়ন ডলার মূল্যের সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে, পৃথিবীর ইতিহাসে এরকম নজির আর দ্বিতীয়টি নেই। এখন প্রশ্ন হল আমেরিকার এত ইজরায়েল প্রীতির কারণ কি?
১৮৪৮ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যািনকে ঠিক এরকম প্রশ্নই করেছিলেন সাংবাদিকরা-‘এত তড়িঘড়ি ইজরায়েলকে স্বীকৃতি কেন দিতে হলো?’ এর জবাবে দুটো বিষয়ের কথা উল্লেখ করেন ট্রুম্যা ন- প্রথমত সহানুভূতি; আমরা জানি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রায় ৬০ লক্ষ ইহুদিকে হত্যার করেছিলেন হিটলার, ফলে সেই সময়কার ইহুদিদের প্রতি মানুষজন সমব্যা়থি ছিলেন । প্রেসিডেন্ট দেখলেন তাঁর ভোটব্যাঙ্কের মধ্যে একটা বিরাট অংশ সেসময় চাইছিল আমেরিকা ইহুদিদের সমর্থন করুক, তারই বহিঃপ্রকাশ এই আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি। আর দ্বিতীয় কারণটি হল গণতন্ত্র । আমেরিকা সবসময়ই নিজেদেরকে গণতন্ত্রের পীঠস্থান হিসেবে দাবি করে এসেছে । মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলিতে তখন রাজতন্ত্রের রমরমা, তাদের মাঝে নবগঠিত একটি গণতান্ত্রিক দেশ ; ট্রুম্যা নের মতো দুঁদে রাজনৈতিক নেতা কি আর সেই সুযোগ হাতছাড়া করতে পারেন!
স্বিকৃতী দিলেও ভালোবাসা কিন্তু তখনও শুরু হয়নি; কোনো আর্থিক সাহায্য বা সামরিক অস্ত্রের আদান প্রদান হয়নি তখনও। এমনকি আমেরিকা কিন্তু ইজরায়েলের কাছে অস্ত্রও বিক্রি করতো না প্রথমদিকে; রাষ্ট্র গঠনের পর ইজরায়েল প্রথম সামরিক সরঞ্জাম কেনে ফ্রান্সের থেকে।
১৯৬৭ সালের যুদ্ধের পর থেকে পরিস্থিতি পরিবর্তন হতে শুরু করে । এই যুদ্ধে তিনটি আরব রাষ্ট্রকে (মিশর, জর্ডান, ও সিরিয়া) পরাজিত করে বিশ বছর বয়সী ইজরায়েল, সেই থেকেই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সুনজরে পড়ে নেতানিয়াহুর উত্তরসূরীরা। আবার আরব দেশগুলির সঙ্গে তখন রাশিয়ার সুসম্পর্ক রয়েছে, ফলে ‘শক্রর শত্রু আমার বন্ধু’-এইরকম প্রাচীন প্রবাদ মার্কিন সরকারকেও প্রভাবিত করে।সেই সময় থেকে আমেরিকা ইজরায়েলের কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে শুরু করে । ইজরায়েল দেখে আরব রাষ্ট্রগুলির মাঝে টিকে থাকতে গেলে আমেরিকার মতো এক নিউক্লিয়ার শক্তিধর রাষ্ট্রের হাত মাথায় থাকা প্রয়োজন, কারণ আরব রাষ্ট্রগুলির মাথায় ছাতা ধরে আছে আর এক পারমাণবিক শক্তিধর রাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন। অপরদিকে আমেরিকাও দেখে রাশিয়ার সাথে ঠান্ডা লড়াইয়ে জিততে গেলে মধ্যপ্রাচ্যে তাদের একটা জোরালো সমর্থন দরকার । অবশেষে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী, হেনরি কিসিঞ্জার ও প্রেসিডেন্ট, নিক্সন আমেরিকার সাথে ইজরায়েলের সম্পর্ক মজবুত করেন।
১৯৭৩ সালের যুদ্ধে আমেরিকা সরাসরি ইজরায়েলকে সাহায্য করে । এরপর ৭৮ সালে আমেরিকা একটা চুক্তি প্রস্তাব করে -না এবার আর শুধু ইজরায়েলের সঙ্গে নয়, ত্রিবন্ধনের আর এক প্রান্তে মিশরও ছিল । আমেরিকা প্রথম পক্ষকে তিন বিলিয়ন ও অপরপক্ষকে ২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়, বিনিময়ে দুই পক্ষই আমেরিকার কথা শুনবে ও নিজেদের মধ্যে ঝগড়া বিবাদ করবে না। অনেকটা ডনের মতো প্রস্তাব । দুই পক্ষই এই প্রস্তাবে অমত করেনি। সেই শুরু, এরপর থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যতক বছরই আমেরিকা নেতানিয়াহুদের অর্থ সাহায্য করে আসছে ।
কি মনে হচ্ছে- মার্কিনরা খালি দিয়েই যাচ্ছে, আর এক দেশ কেবল নিয়ে যাচ্ছে! ব্য্পারটা এতটাও সরল নয় । ৮৫ সালে আমেরিকা ইজরায়েলের সাথে একটা বাণিজ্যিক চুক্তি করে-দুই দেশের আমদানি রফতানি দ্রব্যে কোনো ট্যাারিফ থাকবেনা। ভাবতে পারেন, সেই আমেরিকা, যার বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রত্যেটক সপ্তাহে আমাদের হুমকি দিচ্ছে-ট্যা রিফ ২৫%, ৫০% করে দেব.., তারা কিনা ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট করেছে একটি দেশের সাথে! অবাক হওয়ার কিছু নেই, কারণ এর পিছনে মার্কিনিদের একটা বড় লাভ লুকিয়ে আছে । ইজরায়েল এমনিতে চিকিৎসা ও প্রযুক্তিতে উন্নত একটা দেশ । এই ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্টের ফলে নেতানিয়াহুর দেশের প্রচুর মেধা ও প্রযুক্তির অবাধ বিচরণ আমেরিকার বাজারে; এক পরিসংখ্যান বলছে এর ফলে কর্মসংস্থান বেড়েছে প্রায় চার লক্ষ ।
আমেরিকা -ইজরায়েলের ভালোবাসার পেছনে আর একটি কমিটির কথা না বললেই নয়- AIPAC (American Israel Public Affairs Committee) কমিটি। বিখ্যাত ফরচুন ম্যাগাজিন, তাদের এক সংখ্যায় এই কমিটিকে একসময় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী কমিটি হিসেবে উল্লেখ করে । এই কমিটির সাথে যুক্ত উচ্চপদস্থ মার্কিন কংগ্রেসের সদস্যরা, যারা যুক্তরাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণ করে।
আসলে ইজরায়েল জানে যে স্বল্প সময়ে পৃথিবীতে প্রভাব বিস্তার করতে গেলে মিডিয়া ন্যাযরেটিভ নিয়ন্ত্রণ করতে হবে । সেই কাজ তারা শুরু করে তিন দশক আগে থেকেই । একটা সময় হলিউডের বড় বড় প্রোডাকশন হাউজের অধিকাংশই ছিল ইজরায়েল মালিকানাধীন । তাদের কাজ ছিল সুকৌশলে ইজরায়েলের ন্যাররেটিভ প্রচার করা । সুদীর্ঘ সাড়ে তিন দশক এই প্রপাগাণ্ডা প্রচার করার ফলে আমেরিকার মানুষজন ইজরায়েলের ব্যচপারে ছোটো থেকেই বেশ সহানুভূতিশীল । তবে বর্তমানে আন্তর্জাতিক মিডিয়ার কল্যাণে ইজরায়েলের বর্বরতার নজির দেখছে বিশ্ববাসী । আজ আমেরিকার বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, স্কয়ারে, জায়গায় জায়গায় যে ইজরায়েল বিরোধী স্লোগান উঠছে, তা এক দশক আগে কেউ কল্পনাও করতে পারতো না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে নীতি নির্ধারকদের মনের ভেতরে এখনোও জমে আছে সেই পুরানো ইজরায়েল প্রীতির বরফ। আর কত রক্তপাতের বিনিময়ে সে বরফ গলবে, তা আমরা কেউই জানি না।








