গাজা, গাজী, গজা এবং গাজর
ফিলিস্তিনের গাজা উপত্যকা। ৪১ কিলোমিটার দীর্ঘ এবং ১০ কিলোমিটার প্রশস্ত একটি অঞ্চল, যা ইসরায়েল, মিশর এবং ভূমধ্যসাগরের মধ্যে অবস্থিত। এখানে প্রায় ২৩ লাখ মানুষ বসবাস করে, যা বিশ্বের সর্বোচ্চ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা এবং ‘বিশ্বের উন্মুক্ত কারাগার’।
যুদ্ধ হয় একটা দেশের সঙ্গে আরেকটা দেশের বা একাধিক দেশের। কিন্তু গাজা কোন দেশ নয়। গাজা হল ফিলিস্তিনের একটা অঞ্চল। আবার ফিলিস্তিনও কোন দেশ নয়। এখন এটা মধ্যপ্রাচ্যের একটা ভূখণ্ড মাত্র। যার প্রায় ৯০ শতাংশ এলাকা সুদীর্ঘকাল ধরে জবরদখল করে রেখেছে ইসরাইল। তবুও ইসরাইলকে তাদেরকে স্বাধীন দেশের স্বীকৃতি দিয়েছে পশ্চিমারা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইহুদিদের জন্য দেশ বানিয়ে দিয়েছিল পশ্চিমারা। অর্থাৎ ইসরাইল হল মধ্যপ্রাচ্যের জারজ দেশ। ইসরাইল আসলে ব্রিটেন ও আমেরিকার ঔরসজাত এবং গর্ভজাত লাওয়ারিশ সন্তান। ফিলিস্তিনের মাথার ওপর উড়ে এসে জুড়ে বসা অবৈধ দেশ ইসরাইল।
ইসরাইল এতবড় নিমকহারাম, পশ্চিমারা তাদেরকে খেদালে যে ফিলিস্তিন আপন করে নিয়োছিল, বুকে টেনে নিয়ে আশ্রয় দিয়েছিল, সেই ফিলিস্তিনিদেরকেই বিতাড়িত বা উৎখাত করে গাজা-সহ পুরো ফিলিস্তিনকে দখল করে নিয়ে বৃহত্তর ইসরাইল রাষ্ট্র গড়তে মরিয়া হয়ে বিগত সাড়ে সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে পাশবিকতা, বর্বরতা, নৃশংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইল। আর এসব মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডে ইসরাইলকে অল আউট সহযোগিতা ও সমর্থন দিয়ে চলেছে পশ্চিমারা। যার জন্যই কয়েক লক্ষ গাজাবাসী শহিদ হয়েছে, বাকিরা গাজী হয়ে মৃত্যুর অপেক্ষায় দিন গুনছে।
এখন গাজায় স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে দরদ উথলে উঠেছে আমেরিকার। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুকে পাশে দাঁড় করিয়ে শান্তি পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সেই বৈঠকে গাজা বা ফিলিস্তিনের কাউকে রাখা হয়নি। একতরফা গাজার জন্য শান্তি পরিকল্পনার (?) কথা ঘোষণা করেছেন। তাও আবার খসড়া কিংবা প্রস্তাব নয়; একেবারে চূড়ান্ত ঘোষণা। তাদেরকে এই অধিকার কে দিল কে জানে? গাজা কি ট্রাম্প ও তার সাকরেদ নেতানিয়াহুর পৈতৃক বা বাপকেলে সম্পত্তি? যে ইসরাইল যুদ্ধ চালাচ্ছে, আর যে আমেরিকা তথা পশ্চিমারা সবরকম মদদ ও রসদ জুগিয়ে চলেছে, তারা তো সত্যিকার অর্থে যুদ্ধবাজ। তারা কীভাবে শান্তি আনবে?
কথিত শান্তি পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, হামাসকে অস্ত্র পরিহার করতে হবে এবং গাজা প্রশাসনের কোথাও যুক্ত হতে পারবে না। গাজাকে পরিচালনা করবে ভিনদেশি টেকনোক্র্যাট সরকার। সেই সরকারে তল্পিবাহক হয়ে থাকবে মিশর ও আরবের কয়েকটি জো-হুজুর ও ইয়েস বস মার্কা দেশ। ইসরাইল স্বমহিমায় থাকবে। পায়ে পা দুলিয়ে মজা নেবে, আর বগল বাজাবে। গাজাবাসীকে কেবলই মাশুল দিতে হবে। এসব শুনে মনে হচ্ছে যেন, ইসরাইলে যুদ্ধ করছে হামাস। হাজার হাজার ইহুদিকে গণ হারে হত্যা করে চলেছে হামাস। তাই হামাসের প্রথম সারির সকল নেতাকেই হত্যা করেছে ইসরাইল এবং সেসব হত্যাকাণ্ডের কথা সগর্বে ও সদর্পে ঘোষণা করে চলেছে নেতানিয়াহু সরকার।
শয়তানিয়াহু ও তার সরকার গাজায় যাকিছু করে চলেছে, সেগুলো যদি হামাস করত? হামাস যদি ইসরাইলি ভূখণ্ড দখল করত? ইসরাইলকে চারিদিক থেকে অবরুদ্ধ করে রাখত? ইসরাইলের কয়েক হাজার নিরপরাধ নারী, শিশু ও রাজনৈতিক নেতা-মন্ত্রীদের বিনা বিচারে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে গরাদে ঢুকিয়ে রাখত? লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ ইহুদিকে শহিদ করত? তাহলে কী হত?
এখন গাজাকে কবরস্থান এবং এতিম ও প্রতিবন্ধীর উপত্যকা বানিয়ে, সমগ্র অঞ্চলকে ধ্বংসস্তূপ বানিয়ে; আর বিশ্ববিবেকের সামনে গাজর ঝুলিয়ে বলা হচ্ছে, গাজায় শান্তি চাই। হামাস শর্ত মানলে এখুনি বন্ধ হবে যুদ্ধ। ইসরাইলকে কোন শর্ত মানতে হবে না, সব সন্ধি এবং শর্ত ভাঙলেও ইসরাইল মহান। স্বাধীনতাকামী হামাস হল সন্ত্রাসী। আর গণহত্যাকারী নেতানিয়াহু ধোয়া তুলসীপাতা। দু-হাতে রক্ত মেখে শান্তি-মালা জপে ফন্দি আঁটছে ট্রাম্প-নেতাহু জুটি। কথিত শান্তি প্রকল্পের বড়বাবু হবেন ট্রাম্প, মেজ দারোগা হবেন ব্রিটেনের প্রাক্তন যুদ্ধবাজ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার। আর গাজাবাসী হবে কাবাব মে হাড্ডি কিংবা আখের ছিবড়ে। এভাবেই নোবেল শান্তি পুরস্কার হাতাতে গাজায় শান্তি-জল ছেটাচ্ছেন ট্রাম্প। শ চুহা খাকে বিল্লি…।








