কলকাতায় প্রথম বাস চালান আবদুস সোবহান
মুদাসসির নিয়াজ
নতুন পয়গাম: কলকাতা শহরে বাস চলাচলের ইতিহাস প্রায় ২০০ বছরের পুরনো। ১৮৩০ সালে প্রথম ঘোড়ায় টানা গাড়ি হিসেবে বাস চলাচল শুরু হয় এবং ১৯১৮ সালে প্রথম মোটর বা ইঞ্জিন চালিত বাস চালু হয়। ১৯২০-এর দশকে বাসের নামকরণ হয় এবং ১৯৪৮ সালে সরকারি বাস পরিষেবা (CSTC ও WBSTC) চালু হয়। ১৯৮০ সালে মিনিবাস রাস্তায় নামে এবং ২০০৫ সালে ঐতিহ্যবাহী ডাবল ডেকার বা দোতলা বাস বন্ধ হয়ে যায়। প্রথম দিকে ব্রিটিশ আমলে জেলা থেকে কলকাতা অভিমুখে বাস চালু হয় ১৮৩০ সালে। সেই বাস ব্যারাকপুর থেকে ছেড়ে আসত ধর্মতলা পর্যন্ত। তবে এগুলি ছিল ঘোড়ায় টানা অমনিবাস।
আজ থেকে ১০৭ বছর আগে ১৯১৮ সালে কলকাতার দুটি রুটে প্রথম বাস চালিয়ে ছিলেন আবদুল সোবহান নামে এক ব্যক্তি। সেই রুট দুটি হল শিয়ালদা থেকে বেলেঘাটা এবং খিদিরপুর থেকে মেটিয়াব্রুজ। ১৯২২ থেকে মহানগরে বেশ কিছু সংখ্যক যাত্রীবাহী মোটর চালিত বাস চলাচল শুরু করে, যার কোনো নম্বর ছিল না। সেই সময় বাসগুলোর বাহারি নাম ছিল – পথের বন্ধু, চলে এসো, মেনকা, কিন্নরী ইত্যাদি। কলকাতায় সরকারি বাস পরিষেবার সূচনা হয় ১৯৪৮ সালে, স্বাধীনতার পরের বছর।
অবশ্য তার অনেক আগে ১৯২৬ সালে কলকাতায় প্রথম ডাবল ডেকার বাস চালু হয়, যা লন্ডনের সফল অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত ছিল। ১৯৩০-৪০ এর দশকে এই বাসগুলো শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ১৯৮০ সালে মিনিবাস চালু হয়। বর্তমানে সরকারি ও বেসরকারি উভয় ধরনের অসংখ্য বাস কলকাতায় চলাচল করে। এছাড়াও ট্রাম, মেট্রো এবং শহরতলি রেলও চলাচল করে। একে চক্ররেল বলা হয়।
তিনটি ঘোড়ায় চালিত গাড়িতে ধর্মতলা থেকে ব্যারাকপুর পর্যন্ত যাত্রী পরিবহণ শুরু হয়। অবশ্য সেই ‘বাস’ বেশিদিন রাস্তায় চলেনি। ঘোড়ায় টানা ট্রাম চলাচল শুরু হয়েছিল সেই সময়। দেখা যায় ট্রামের দাপট। সেজন্য তখন আর বাসের প্রয়োজন পড়েনি। ধীরে ধীরে কলকাতাগামী মানুষের যাতায়াত বাড়তে থাকায় ক্রমেই পরিবহণের জন্য বিকল্প ব্যবস্থার চাহিদা বাড়ে। আবারও বাস ফিরে আসে কলকাতার মানচিত্রে। তখন ১৯১৮ সালে তিলোত্তমা কলকাতা শহের প্রথম বাস চালু করেন আব্দুল সোবহান।
এর ৪ বছর পর ১৯২২ সালে ওয়ালফোর্ড অ্যান্ড কোম্পানির তৈরি বাস চালাতে শুরু করে ক্যালকাটা ট্রামওয়ে কোম্পানি বা সিটিসি। তখন থেকেই কলকাতায় পুরোদমে বাস পরিষেবা চালু হয়। এছাড়াও ইতিহাসের পাতা ওল্টালে দেখা যায়, অল্পবিস্তর কিছু রুট যেমন- রামরাজাতলা থেকে হাওড়া স্টেশন পর্যন্ত বাস চালু হয় সেই সময়েই। পাশাপাশি চালু হয় বালিখাল, শিবপুর এবং হাওড়া জেলার বিভিন্ন বাস রুট। ১৯২৫ সালে গঠিত হয় বেসরকারি বাস মালিকদের সংগঠন ‘বেঙ্গল বাস সিন্ডিকেট’। তারপর ১৯২৬ সালে কোম্পানির হাত ধরে সর্বপ্রথম রাস্তায় নামে আইকনিক ডাবল ডেকার বাস। উত্তরে শ্যামবাজার এবং দক্ষিণে কালীঘাটের সঙ্গে যুক্ত করে ওই দোতলা বাস। এভাবেই ধীরে ধীরে একের পর এক রুটে বাসের চাহিদা বাড়তে থাকে। ক্রমেই কলকাতা ও হাওড়া ছাড়িয়ে হুগলি, ২৪ পরগনায় বাসরুট চালু হয়।
১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘রিজিওন্যাল ট্রান্সপোর্ট অথরিটি’ (RTA), যারা বাস অপারেটরদের পারমিট দেওয়া থেকে বাস পরিষেবার যাবতীয় দায়িত্ব পায়। আবার ১৯৪০ সালেই কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিগত সমস্যার কারণে বাস পরিষেবা বন্ধ করে দেয় সিটিসি। ১৯৪৫ সালে উত্তরবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা, তারপর ১৯৪৮ সালে কলকাতা রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা চালু হয়। ধীরে ধীরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বিভিন্ন বাস রুটের নিয়ন্ত্রণ হাতে নেয় সিএসটিসি। ১৯৪৮ সালে তৈরি হওয়া সিএসটিসি ২০২৩ সালে ৭৫ বছরে পদার্পণ করে। ১৯৬৩ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দক্ষিণবঙ্গ রাষ্ট্রীয় পরিবহন সংস্থা (SBSTC)। সেই সংস্থারও ৬০ বছর হয়েছে ২০২৩ সালে।
কলকাতায় এখন প্রায় ৬৪০টি সরকারি বাস চলছে। অন্যদিকে ট্যাক্সির সংখ্যা কিছুটা কমেছে, যেখানে কোভিড অতিমারীর আগে প্রায় ১৮ হাজার ট্যাক্সি চলত, এখন সেখানে অর্ধেকেরও কম ৭ হাজার ট্যাক্সি কলকাতার রাস্তায় চলাচল করছে। ২০২০ সালের এক রিপোর্ট অনুযায়ী, কলকাতা শহরে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার বেসরকারি বাস ২৩০টি রুটে চলাচল করে। তবে ১৫ বছরের বেশি পুরনো বাস বন্ধে হাইকোর্টের নির্দেশিকার কারণে এই সংখ্যা এখন একটু কমেছে।
চলতি বছর জানুয়ারি মাসে রাজ্যের পরিবহণমন্ত্রী স্নেহাশিস চক্রবর্তী জানান, বর্তমানে কলকাতা ও শহরতলিতে সরকারি বাসগুলি দৈনিক ৩৩০০ ট্রিপ চলে। এরই মধ্যে কলকাতা এবং শহরতলিতে ট্রিপের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০। তবে এই ট্রিপ সংখ্যা নিত্যযাত্রীর চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়। তাই সরকারি বাসের সংখ্যা বাড়িয়ে ৬৪০ এবং ট্রিপ বাড়িয়ে ৪১৯৮ করা হয়েছে।








