মণিপুরের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন
মুদাসসির নিয়াজ
নতুন পয়গাম ডেস্ক: মুহাম্মদ আলিমুদ্দিনের জন্ম ১৯২০ সালে মণিপুরের থৌবল জেলার লিলং হাওরেবি এলাকায়। স্বাধীনতার পর ১৯৪৮ সালে মণিপুর বিধানসভার প্রথম নির্বাচন হয়। সেবার লিলং কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে জিতেছিলেন মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেব। প্রথমবার জয়ী হয়েই মণিপুর রাজ্য সরকারের কারাগার ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী হন তিনি। এরপর আরও ৬ বার, অর্থাৎ মোট ৭বার মণিপুর বিধানসভায় নির্বাচিত বিধায়ক হন তিনি। ১৯৪৮ সালের পর ১৯৫২, ১৯৫৭, ১৯৬২, ১৯৬৭, ১৯৭২ এবং ১৯৭৪ সালের নির্বাচনে প্রতিবারই তিনি জয়লাভ করেন। ১৯৭২ সালে মণিপুর রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পায়। সেবারও যথারীতি নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে জয়ী হন তিনি। সেবার মণিপুর পিপলস পার্টি নামে আঞ্চলিক দল ক্ষমতায় আসে এবং মুখ্যমন্ত্রী হন মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন। অর্থাৎ স্বাধীন ভারতের রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাবার পর মণিপুরের প্রথম মুখ্যমন্ত্রী হয়েছিলেন তিনি।
১৯৭২ সালের মার্চে তিনি মুখ্যমন্তঈর পদে শপথ নেন। কিন্তু সেই সরকার মাত্র একবছর টিকেছিল। ১৯৭৩ সালের মার্চেই সরকার পড়ে যায়। পদত্যাগ করেন মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেব। ১৯৭৪ সালে মধ্যবর্তী নির্বাচন হলে মণিপুর পিপলস পার্টিই সবথেকে এগিয়ে ছিল। অন্যান্য দলকে সঙ্গে নিয়ে তারাই ফের সরকার গড়লে আলিমুদ্দিন পুনরায় মুখ্যমন্ত্রী হন। কিন্তু এবার জোট সরকার মাত্র ৪ মাস টিকেছিল। ১৯৭৪ সালের জুলাইয়ে ভেঙে যায় সেই সরকার। অর্থাৎ দুই দফায় মিলিয়ে মোট ১৬ মাস মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন তিনি।
যতদূর জানা যায়, প্রজ্ঞা, বুদ্ধিমত্তা, বিচক্ষণতা, সত্যিকার অর্থে ধর্মনিরপেক্ষতা এবং সর্বোপরি রাজনৈতিক দূরদর্শিতার জন্য তিনি অনন্য নেতা হয়ে উঠেছিলেন। খুব উচ্চ শিক্ষিত না হলেও তাঁর জ্ঞান-বুদ্ধিমত্তা ছিল প্রখর। বিশেষ করে রাজনীতি তথা শাসনভার পরিচালনায় তিনি খুবই দক্ষযোগ্য ছিলেন। ১৯৭৪-৭৫ সালে তিনি বিধানসভার স্পিকার হন। ১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯ প্রায় আড়াই বছর তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রী ছিলেন। ৭ বার বিধায়ক, দুইবার মুখ্যমন্ত্রী এবং একাধিকবার বিভিন্ন সরকারে বিভিন্ন বিভাগের মন্ত্রী থাকা ছাড়াও তিনি অন্যান্য অনেক কাজ করেছিলেন। যেগুলো মণিপুর রাজ্যকে অনন্য মাত্রা বা উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে। ১৯৭২ সালে তিনি মণিপুর পাবলিক সার্ভিস কমিশন গঠন করেন। এই কমিশনের অধীনে নানারকম রাজ্য সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং চাকরি দেওয়া হয়। এছাড়াও মণিপুর ইউনিভার্সিটি, মেডিক্যাল ইন্সটিটিউট, আইন কমিশন, সেকেন্ডারি এডুকেশন বোর্ড চালু করেন তিনি। রাজ্যের অনেকগুলো বড় বড় খাল, নদী ও বাঁধ সংস্কার করে মণিপুরে সেচ তথা কৃষিকাজে একরকম সবুজ বিপ্লব ঘটিয়েছিলেন মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেব। তাঁর হাত ধরেই মণিপুরের বহু অঞ্চল দো-ফসলী হয়।
১৯৭২ সালের ১৯ নভেম্বর তিনি জওহরলাল নেহরু ইউনিভার্সিটি সেন্টারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন। পরে এটা মণিপুর ইউনিভার্সিটি হয়। মণিপুর রাজ্যে এটাই প্রথম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখান থেকে সব বিষয়ে মাস্টার্স ডিগ্রি করা যেত, এখনও হয়। এছাড়াও রিজিওনাল মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠান করেছিলেন তিনি। পরে এর আধুনিকিকরণ করে নাম দেওয়া হয় রিজিওনাল ইনস্টিটিউট অফ মেডিক্যাল সায়েন্স। মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেবের হাতে তৈরি এই দুই শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আজও দেশজুড়ে সমাদৃত। বিশেষ করে উত্তর-পূর্ব ভারতের স্বল্পোন্নত রাজ্যগুলির জন্য এই দুই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুবই কার্যকরী। প্রতি বছর এখান থেকে বিভিন্ন রাজ্যের অসংখ্য পড়ুয়া পড়াশোনা করে ডিগ্রি অর্জন করে থাকে। যার কৃতিত্ব মণিপুরের মরহুম মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেবের। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হল এতবড় কর্মযজ্ঞ যিনি করেছিলেন সেই মানুষটাকে কোনও সরকার আজ পর্যন্ত স্মরণ করেনি বা সম্মান জানায়নি। তাঁর অবদানকে আজও সরকারিভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়নি। বিভিন্ন সংগঠনের তরফে মণিপুর সরকার এবং দুই উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাছে দাবি জানানো হয় যে, প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী মুহাম্মদ আলিমুদ্দিন সাহেবের নামে একটা বিল্ডিংয়ের অন্তত নামকরণ করা হোক।
কিন্তু দুঃখের বিষয় হল সেটা আজও পর্যন্ত হয়নি। ১৯৮৩ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি ৬৩ বছর বয়সে এই বহুমুখী প্রতিভাবান মানুষটির ইন্তেকাল হয়।
উল্লেখ্য, মণিপুরের মোট জনসংখ্যা ৩৪ লক্ষ ৩৭ হাজার। এর মধ্যে মুসলিম ৮.৫ শতাংশ বা আড়াই লক্ষের মতো। যদিও সেখানকার মুসলিমদের অভিযোগ, সরকার তাদের জনসংখ্যা সবসময় কমিয়ে দেখায়। তাদের আসল সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ। (সৌজন্য: মহাজীবন, নতুন পয়গাম পত্রিকা, ২০২২-২৩)








