এক পরমসত্তায় বিশ্বাসী ছিলেন রামমোহন
ড. রমজান আলি
নতুন পয়গাম, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৫
১৮০৩-০৪ সাল নাগাদ তাঁর পিতার মৃত্যুর পর রামমোহন ফারসি ভাষায় লিখলেন তুহফৎ-উল্-মুওয়াহিদ্দন। ১৮০৪ সালে লিথোগ্রাফিতে ছাপা হল। তখন রামমোহন মুর্শিদাবাদে আছেন। ৩১-৩২ বছর বয়সে লেখা, কিন্তু বিস্ময়ের। বিস্ময়ের এ জন্যই যে, এই বয়সে তিনি চেতনার অনেক উঁচু স্তরে অবস্থান করছিলেন। একেশ্বর সম্বন্ধীয় এই গ্রন্থের ভূমিকা লেখা হয়েছিল আরবি ভাষায়। পরে বাংলায় অনুবাদ হয়। অনুবাদক জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দাস জানিয়েছেন, ‘কিছু দিন হল সরকারি কর্ম হতে অবসর নিয়ে রামমোহন-গ্রন্থ পাঠ আবার শুরু করি ও ‘তুফাতের’ ইংরেজি থেকে বাংলা করার ইচ্ছা হয়। প্রথমে ‘পাণিনি সংস্করণ থেকেই বাংলা শুরু করি, পরে মৌলবী ওবেদ-উল্লা সাহেবের ইংরেজী অনুবাদের সন্ধান পাই। ঋষি রাজনারায়ণ বসু এই অতি মূল্যবান গ্রন্থখানা শিক্ষিত সমাজে পরিচিত করার জন্যই তাঁর বন্ধু মৌলবী সাহেবকে দিয়ে ইংরেজী অনুবাদ করান এবং এটাই প্রথম ইংরেজী অনুবাদ।’
ছিলেন ঢাকা গভর্নমেন্ট মাদ্রাসার সুপারিনটেন্ডেন্ট। গ্রন্থটি অনুদিত হয়েছিল ১৮৮৪ সালে। তারপর অনুবাদ করেন গিরিশচন্দ্র সেন, ১৮৯৯ সালে। আর জ্যোতিরিন্দ্রনাথ দাস অনুবাদ করেছিলেন ১৯৪৯ সালে স্বাধীনতার পর। ছাপায় প্যারাগ্রাফের শিরোনাম সংযোজন ছিল অনুবাদকের বন্ধুবর অধ্যাপক ড. কালিদাস নাগ মহাশয়ের, যা ওবেদ-উল্লাকৃত ইংরেজি অনুবাদে ছিল না। ড. নাগ একটা ভূমিকাও লিখেছিলেন। এর হিন্দি সংস্করণ যে ঢাকা থেকে হচ্ছে, তেমন একটা খবরও অনুবাদক দিয়েছেন।
সত্যকে আশ্রয় করে তাঁর যুক্তবাদী মনোভাব এই গ্রন্থের ছত্রে ছত্রে। নিজের এবং মানুষের ধর্ম সত্য অনুসন্ধান করতে গিয়ে দেখেছেন ধর্মের নামে নির্যাতন ও হত্যা, মূলত ভণ্ড ধর্মগুরুদের প্রভাবে সাধারণ মানুষের অন্ধবিশ্বাস থেকে মুক্তি না পাওয়া, অলৌকিকত্বের ভেলকিতে প্রভাবিত হয়ে বিজ্ঞান থেকে শত যোজন দূরে থাকা এসব নির্ভয়ে স্পষ্ট করে সংক্ষেপে বলেছেন। শেষে বিশ্বমানবের জন্য প্রর্থনা করেছেন। উল্লেখ্য, ‘মানাজারাতুল আদিয়ান’ অর্থাৎ ‘নানা ধর্মের আলোচনা’ নামে তিনি আরবি ভাষায় আর একটি গ্রন্থ লিখেছিলেন, সেখানে বিষয়টা আরো বিস্তারিত ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয়, সেই গ্রন্থটি এখন দুষ্প্রাপ্য, আর পাওয়া যায় না। কেউ কেউ মনে করেন, গ্রন্থটি তুহফাতুল-এর খসড়া। তবে কাজী আবদুল ওদুদের মতে, স্বতন্ত্র গ্রন্থাকারে এটির প্রকাশ হয়েছিল।
মাতৃভাষার মতো করেই তিনি আরবি ভাষা বলতে পারতেন। এ ব্যাপারে সাক্ষ্য দিয়েছেন, রামমোহনের সেক্রেটারি স্ট্যাণ্ডফোর্ড অরনট। ভূমিকা আরবিতে লিখে ‘তুহফাৎ-উল-মুওয়াহিদ্দিন’ কেন ফারসিতে লিখলেন? তার জবাব তিনি গ্রন্থের ভূমিকাতেই দিয়েছেন, ‘আমার এই মত, এবার আমি পারসী ভাষায় ব্যাখ্যা করলাম। কারণ, আজমবাসীদের (অনারবদের) কাছে এই ভাষাই অধিকতর বোধগম্য হবে।’ প্রাক-ব্রিটিশ যুগে সেই সময় কলকাতার অনেক মানুষ চাকরির প্রয়োজনে রাজভাষা ফারসি জানতেন।
তাছাড়া আরেকটা কারণ হল, ফারসি ভাষায় লিখলে তাঁর এই পুস্তিকার বক্তব্য সারা ভারত তথা মধ্যপ্রাচ্যে প্রচার পেতে অসুবিধা হবে না। অনুবাদক ওবেদ-উল্লা সাহেবের মতে, গ্রন্থটি Full of Arabic logical and philosophical terms। সমস্ত ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তাঁর বক্তব্য, সেখানে তিনি পরোক্ষভাবে মুসলিম সমাজ ও সম্প্রদায়ের মধ্যে গড়ে ওঠা কুসংস্কারকেও ছেড়ে কথা বলেননি। আসলে ধর্মের প্রতি অবিশ্বাস নয়, ধর্মে বিশ্বাস রেখেই তিনি ধর্মের উদ্ধৃতিও দিয়েছেন। যেমন সাধারণ মানুষের উপর ধর্মগুরুদের প্রভাবের কথা বলতে গিয়ে শেষে কুরআন থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন, ‘আমাদের নিকৃষ্ট সত্তার এই সব প্রলোভন ও দুষ্কর্মজনিত অপরাধ হতে রক্ষা পাবার জন্য ঈশ্বরের (আল্লাহর) শরণ মাগি।’ কিম্বা নিরর্থক বিধি-নিষেধের কথা বলতে গিয়ে সমাজ কল্যাণের কথাটি মাথায় রেখে কুরআনের আয়াত যুক্ত করেছেন- ‘যাকে ঈশ্বর (আল্লাহ) সুপথে নিয়ে যান, তাকে কেউ বিভ্রান্ত করতে পারে না, যাকে তিনি বিপথে নেন, তার পথপ্রদর্শক আর কেউ নেই।’
তবে হ্যাঁ, এটা ঠিক যে, তিনি এক ঈশ্বরের কথা বলেছিলেন এবং এটা তাঁর সামাজিক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান। তাই তুহফাতুল-এর ভূমিকায় বলেছেন, ‘আমি পৃথিবীর বহু দূর দেশে গিয়েছি। কখনো সমতলভূমিতে, কখনো-বা পার্বত্যদেশের নানাস্থানে ঘুরে বেড়িয়েছি। সর্বত্রই দেখেছি, সে সকল দেশের লোকেরা একটি বিষয়ে একমত যে, এই জগতে সব কিছুরই আদি কারণ ও তার বিধাতারূপে (governor) এক পরম সত্ত্বা বিদ্যমান আছেন। তাঁর ব্যক্তিত্বে সাধারণভাবে সকলেই বিশ্বাস করে।’ সেখান থেকেই রামমোহনের একটা বিশ্বমন তৈরি হয়েছিল। সংস্কার দূরীকরণে শুধু লড়াই করলে হবে না, তারও যে বিকল্প পরিশুদ্ধ ভাবনা আছে, সে কথা বলতেই তাঁর এই গ্রন্থ পরিকল্পনা। বাংলায় অনুদিত গ্রন্থের শিরোনাম থেকে এটা বোঝা যায় যে, একেশ্বর-বিশ্বাসীদের এই উপহারের মধ্যে লুকিয়ে ছিল তাঁর ব্রাহ্মধর্মের বৃহত্তর ভাবনা। উল্লেখ্য যে, তিনি শুধু হিন্দু ধর্ম নয়; সব ধর্মকেই সংস্কার-মুক্ত হওয়ার কথা বলেছিলেন।








