ইসলামে হিজড়াদের অধিকার ও মর্যাদা
ইসরাত জাহান সারা
নতুন পয়গাম: নারীও নয়, পুরুষও নয় — এ ধরনের এক শ্রেণিকে প্রায়ই রাস্তাঘাটে নানা রকম অঙ্গভঙ্গি করে চাঁদা তুলতে দেখা যায়। সভ্য সমাজে অবহেলিত এই শ্রেণিকে ‘হিজড়া’ বলা হয়। সাধু ভাষায় বলা হয় ‘ক্লিব লিঙ্গ’। এখন আবার এদেরকে তৃতীয় লিঙ্গের মানুষও বলা হচ্ছে। হিজড়ারা পুরুষ বা মহিলার প্রচলিত সংজ্ঞায় পড়ে না। শারীরবৃত্তীয় দিক থেকে অস্পষ্ট (হারম্যাফ্রোডাইট), উভলিঙ্গ, কিংবা পুরুষ বা মহিলা যৌনাঙ্গ নিয়ে জন্মগ্রহণ করতে পারে এরা। তবে তৃতীয় লিঙ্গ বা থার্ড জেন্ডার ও ট্রান্সজেন্ডার এর পার্থক্য না জানায় আমাদের সমাজের অনেকেই দু’জনকে এক করে দেখেন, আদতে কিন্তু তা নয়। হরমোনাল সমস্যার কারণে কিংবা স্বেচ্ছায় জেন্ডার পরিবর্তনকারীকে ট্রান্সজেন্ডার বলে। প্রশ্ন হল, কেন হিজড়া সন্তান জন্ম হয়? এ ব্যাপারে বিজ্ঞান বা ইসলাম কী বলছে?
বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে মনে করা হয়, ভ্রূণের বিকাশের সময় অস্বাভাবিক মাত্রার হরমোন হিজড়া জন্ম দেওয়ার প্রধান কারণ। অনেক সময় কোনও শিশু এমন লিঙ্গ বা যৌনাঙ্গ নিয়ে জন্মায়, যেগুলি পুরুষ বা মহিলা হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায় না, এদের যৌনাঙ্গ অস্পষ্ট। বৈজ্ঞানিকভাবে এরা ambiguous genitals বা ইন্টারসেক্স অবস্থা (intersex state) হিসেবেও পরিচিত। তবে বেশিরভাগ হল সিউডো-হার্মাফ্রোডাইটস অর্থাৎ তাদের অস্পষ্ট বাহ্যিক যৌনাঙ্গ থাকে এবং তাদের ডিম্বাশয় বা টেস্টিস কোনো একটি থাকে, তবে উভয়ই হয় না। জেনেটিকভাবে সিউডো-হার্মাফ্রোডাইট বলতে পুরুষ বা মহিলা হিজড়া বলা হয়।
হিজড়াদের লিঙ্গ, টেস্টিস বা ভগাঙ্কুরে সমস্যা দেখা দেয় কেন? যৌনাঙ্গে ত্রুটি বা অস্বাভাবিকতার কারণ সম্ভবত, জন্মের আগে ভ্রূণের অস্বাভাবিক হরমোন লেভেল, যার কারণে লিঙ্গ বিভেদকারী ক্রোমোজম গঠনে সমস্যা সৃষ্টি হয়। XX প্যাটার্ন ডিম্বাণুর সমন্বয়ে কন্যা শিশু, আর XY প্যাটার্ন থেকে সৃষ্ট হয় পুত্র শিশু। ভ্রূণের পূর্ণতার স্তরগুলোতে ক্রোমোজোম প্যাটার্নের প্রভাবে ছেলে শিশুর মধ্যে অণ্ডকোষ আর কন্যা শিশুর মধ্য ডিম্বকোষ জন্ম নেয়।
ইসলামী মতে, হিজড়ারাও মানুষ। তাই তাদের উপরেও ইসলামের বিধি-বিধান অপরিহার্য। তা পালন করলে তারাও জান্নাতে যাবে ইনশাআল্লাহ। তাই তাদেরকেও ইসলামী আদেশ নিষেধ মেনে জীবন যাপন করতে হবে। আর হিজড়াদেরকে নিযে উপহাস, হেয় বা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা উচিত নয়। ইসলাম তাদেরকেও মানবসন্তান হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে হিজড়াদের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে বলেছে ইসলাম। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘নিশ্চয়ই আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রেষ্ঠতম সুন্দর আকৃতিতে’ (সুরা ত্বীন: ৪)।
আমাদের পর্যাপ্ত ইসলামী জ্ঞান না থাকায় এবং নানা কুসংস্কার, সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকট, অবক্ষয় ও চৈন্তিক দৈন্যতার কারণে হিজড়ারা সমাজে বঞ্চিত ও অবহেলিত। ক্ষেত্র বিশেষ নিপীড়ন ও নির্যাতনের শিকার। ইসলামী বিধানমতে তাদের মানবিক ও নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। রাসুল (সা.) বলেন, ‘নিশ্চয়ই আল্লাহতায়ালা তোমাদের চেহারা এবং সম্পদ দেখেন না; বরং তিনি তোমাদের হৃদয় এবং আমলগুলো দেখেন।’ (মুসলিম: ৬৭০৮)।
প্রতিবন্ধীদের যেমন সহজাতভাবে শারীরিক গঠন কাঠামোয় ত্রুটি থাকে, হিজড়াদের ক্ষেত্রেও ব্যাপারটা তেমনই। তাই তাদের প্রতি ঘৃণা, দুর্ব্যবহার, কু-মন্তব্য করা গুনাহের কাজ। তাদেরকে অভিশাপ দেওয়া, গালি দেওয়া জঘন্য অপরাধ। আল্লাহর সৃষ্টিকে ঠাট্টা-তামাশার বিষয় বানানো গর্হিত কাজ। মনে রাখতে হবে, আল্লাহ যাকে যেভাবে ইচ্ছা সৃষ্টি করেন। দৈহিক পূর্ণতা ও অপূর্ণতা তার একান্ত ইচ্ছাধীন।
কুরআন-হাদিসে অঙ্গ-প্রত্যেঙ্গ ও আকার আকৃতির ভিত্তিতে মানুষকে ভাগ করা হয়নি। আল্লাহতায়ালার কাছে সব মানুষই সমান। হাশরের ময়দানে সবাইকে তার দায়িত্ব কর্তব্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে। ইসলামের দৃষ্টিতে ঈমান ও তাকওয়া হচ্ছে মানুষের মর্যাদার মানদণ্ড। যে যত বেশি মুত্তাকি, আল্লাহ তাকে তত বেশি ভালবাসেন। আল্লাহ বলেন: ‘হে মানুষ! আমি তোমাদের সৃষ্টি করেছি এক পুরুষ ও এক নারী হতে। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যেন তোমরা একে অপরের সঙ্গে পরিচিত হতে পার। তোমাদের মধ্যে ওই ব্যক্তিই আল্লাহর কাছে অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে বেশি মুত্তাকি।’ (সুরা হুজুরাত: ১৩)।








