কলম ও ক্যানভাসে ব্যতিক্রমী মফিজুল ইসলাম
বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: দক্ষিণ ২৪ পরগণার ভাঙড়ের মাছিভাঙা গ্রামের সন্তান মহম্মদ মফিজুল ইসলাম বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও সংস্কৃতির পরিসরে এক উজ্জ্বল পরিচিত নাম। আট ভাই-বোনের মধ্যে চতুর্থ। স্বল্পসচ্ছল পরিবারের সন্তান হয়েও তিনি অদম্য সাধনা আর নিরলস জিদের মধ্য দিয়ে গড়ে তুলেছেন স্বতন্ত্রতা ও স্বকীয় পথচলা। পিতা আব্দুল মালেক মোল্লা ও মাতা রহিমা বিবির স্নেহমণ্ডিত ছায়া শৈশবেই হারালেও ভেঙে পড়েননি; বরং নিজের প্রতিভাকে সাধনার জলে সিঞ্চিত করে জীবনের সত্যকে জয় করেছেন।
পেশায় তিনি একজন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক, পাশাপাশি রাজ্যের একজন স্টেট রিসোর্স পার্সন। শিক্ষাজগতে তাঁর প্রধান লক্ষ্য, পিছিয়েপড়া ছাত্র-ছাত্রীদের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনা, স্কুল-ছুট শিশুদের শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং নতুন দিশায় এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। শিক্ষক-প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে জেলা ও রাজ্য স্তরের নানান কর্মকাণ্ডে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ শিক্ষা আন্দোলনের অন্তর্নিহিত শক্তিকে সমৃদ্ধ করেছে।
লেখালিখির জগতে তাঁর আত্মপ্রকাশ অল্প বয়সেই। ১৯৮৬ সালে প্রথম কলম ধরা, আর ১৯৮৮ সালে ১৬ বছর বয়সে রাজারহাটের শতাব্দী প্রাচীন বিষ্ণুপুর স্যার রমেশ ইনস্টিটিউশনের বাৎসরিক পত্রিকা সম্পাদনার গুরুদায়িত্ব পালন তাঁর সাহিত্যপ্রীতির প্রাথমিক নিদর্শন। কমার্সের ছাত্র হয়েও সাহিত্য ও সাংবাদিকতার প্রতি টান তাঁর গভীর।
আকাশবাণী কলকাতার ‘প্রাত্যহিকী’ ও ‘যুববাণী’র ‘হাটে বাজারে’ অনুষ্ঠানে তিনি নিয়মিত লিখেছেন। বহুবার ‘সেরা পত্রকারের’ শিরোপাও পেয়েছেন। ‘সেরার সেরা’ খেতাবও পেয়েছেন। মহম্মদ মফিজুল ইসলামের মুক্তঝরা হাতের লেখা আকাশবাণী কলকাতার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে, বিভিন্ন গণমাধ্যমে ও সমাজ মাধ্যমে বহুবার প্রশংসিত হয়েছে।
বাংলাদেশ থেকে প্রকাশিত ৩০-টিরও বেশি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকায় তাঁর লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়। কলকাতার প্রথম সারির সংবাদপত্র ও পত্রিকাতেও সমান স্বীকৃতি পেয়েছেন তিনি। ‘Newz বাংলা’, ‘সংবাদ নজর’, ‘দিনদর্পণ’, ‘পূবের কলম’, ‘নতুন গতি’, ‘সুখবর’,
‘আপনজন’, ‘মীযান’, ‘আরো খবর’, ‘নতুন পয়গাম’— প্রায় সবেতেই তাঁর উত্তর সম্পাদকীয়, প্রবন্ধ ও কবিতা নিয়মিত স্থান পায়। তাঁর লেখায় প্রতিবাদের সুর, বঞ্চিত মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা এবং সমাজ পরিবর্তনের গভীর আকাঙ্ক্ষা প্রতিফলিত হয়। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষামূলক বা সামাজিক যেকোন প্রসঙ্গেই তিনি তুলে ধরেন যুক্তিনিষ্ঠ ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি।
পশ্চিমবঙ্গ, ত্রিপুরা, বাংলাদেশ, প্যারিস, নরওয়ে-সহ এক হাজারেরও বেশি পত্র-পত্রিকায় তাঁর নিয়মিত লেখালিখি। চার শতাধিক সংকলন গ্রন্থে তাঁর কবিতা, গুচ্ছ কবিতা ও সমসাময়িক বিভিন্ন প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। লেখালিখির পাশাপাশি তিনি দক্ষ সম্পাদক। এখনও পর্যন্ত সাতটি পত্রিকার সম্পাদনায় যুক্ত থেকেছেন। নিজের হাতের লেখায় বেশ কয়েকটি দেওয়াল পত্রিকাও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু সেভাবে সংরক্ষণ করা হয়ে ওঠেনি। অতি সম্প্রতি অত্যন্ত সাজানো গোছানো ও দৃষ্টিনন্দন ‘লাইম লাইট’ পত্রিকা গোটা রাজ্যে, দেশে, এমনকি বিদেশেও প্রশংসিত ও সমাদৃত হয়েছে। এই পত্রিকা তাঁকে প্রচুর খ্যাতি, সুনাম ও পুরস্কার এনে দিয়েছে।
ইতিহাসভিত্তিক গ্রন্থ ‘বিশ্ব ইতিহাস পরিক্রমা’-তে তাঁর জীবনী অন্তর্ভুক্ত হয়েছে। এছাড়া ‘অমর তাপস’, ‘অনেক কথা বলার ছিল’, ‘চাকা ঘুরছে’, ‘না বলা কথা’ প্রভৃতি গ্রন্থ তাঁর সাহিত্যকীর্তির গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন। সাহিত্য, সাংবাদিকতা ও চিত্রকলার পাশাপাশি তিনি ক্যালিগ্রাফার, কমার্শিয়াল আর্টিস্ট ও মোটিভেশনাল স্পিকার হিসেবেও সমান খ্যাতিমান। কলমের আঁচড় ও তুলির টান — দুই শিল্পেই তিনি সমান দক্ষ।
পেয়েছেন উত্তর ২৪ পরগণার ‘পীর আল্লামা আব্দুল হান্নান খাঁন স্মৃতি পুরস্কার’ (২০২০), ‘রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মাননা’ (২০২২), ‘ডাইভার্স ট্যালেন্ট অ্যাওয়ার্ড’ (২০২২), ‘বর্ষ সেরা প্রাবন্ধিক পুরস্কার’ (২০২৩), বাংলাদেশ থেকে ‘আজকালের আলো সাহিত্য সম্মাননা’ (২০২৪)-সহ চার শতাধিক সম্মাননা। সম্প্রতি রাণাঘাট বইমেলায় ‘কবি শিরোমণি’ পুরস্কার এবং ‘একুশ শতকের সেরা বাঙালি’, ‘মধুকবি সম্মাননা’, ‘বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায় স্মৃতি সম্মাননা’, ‘ভাঙড় প্রেসক্লাবের লাইফ টাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড’, ‘বিদ্যাসাগর সম্মাননা’ তাঁর গৌরবকে আরও উজ্জ্বল করেছে।
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম শুধু একজন শিক্ষক বা কবি নন, তিনি এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব —সাহিত্যিক, সাংবাদিক, সম্পাদক, শিল্পী ও চিন্তক। তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপে যেমন থাকে প্রতিবাদের ভাষা, তেমনি রয়েছে সৌন্দর্যের সৃজন। বাংলা সংবাদ ও সাহিত্যজগৎ তাঁর অবদানে সমৃদ্ধ হয়েছে।








