অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদ স্বাস্থ্যসম্মত এবং পরিবেশ-বান্ধব, রয়েছে কর্মসংস্থানের সুযোগও
নতুন পয়গাম, হাসান লস্কর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা: রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের পরিণতিতে দিন দিন মানবদেহে রোগের প্রকোপ বেড়েই চলেছে। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, অর্গানিক বা জৈব পদ্ধতিতে চাষাবাদ করা পরিবেশ-বান্ধব এবং একইসঙ্গে স্বাস্থ্যসম্মত। জীববৈচিত্র এবং পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার পাশাপাশি গ্রামীণ অর্থনীতিকে দিনের পর দিন চাঙা করে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে এই অভিনব পদ্ধতির কৃষিকাজ। রাসায়নিক সার ও কীটনাশকের ব্যবহার বন্ধ করে প্রাকৃতিক উপায়ে ফসল উৎপাদন এবং তা বিক্রির মাধ্যমে বেকার সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। জৈব চাষের মাধ্যমে যেভাবে কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পাচ্ছে, তার একটি সংক্ষিপ্ত রূপ হল কম খরচে বেশি উৎপাদন।
স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ঢাকুরিয়া অত্রি সোসাইটির কর্ণধার ত্রিলোকেশ কুন্ডুর কথায়, জৈব সার যেমন- কেঁচো সার বা ভার্মি কম্পোস্ট এবং প্রাকৃতিক কীটনাশক যেমন- নিম তেল, নিমাস্ত্র ইত্যাদি বাড়িতেই তৈরি করা সম্ভব। এর ফলে স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থান হয় এবং আলাদা করে দামি সার কেনার খরচ বাঁচে। অর্গানিক পদ্ধতিতে উৎপাদিত সবজি ও ফল-ফলের বাজারে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। সাধারণ কৃষিজ পণ্যের তুলনায় অর্গানিক ফসল অনেক সময় ২০ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি দামে বিক্রি করা সম্ভব। সবজির মতো স্বল্পমেয়াদি ফসল সারা বছর চাষ করে কৃষক পরিবারের নিয়মিত আয়ের পথ প্রশস্ত হয়। মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় রাসায়নিকের বদলে প্রাকৃতিক কম্পোস্ট সার ব্যবহারের ফলে জমির উর্বরতা দীর্ঘমেয়াদে বজায় থাকে। এটি মাটির গুণগত মান উন্নত করে এবং কৃষিকাজে নিযুক্ত শ্রমিক ও গ্রাহকদের বিভিন্ন রোগবালাই থেকে দূরে রাখে। জৈব চাষে সফলতার জন্য সঠিক কৌশল, মাটি ব্যবস্থাপনা এবং বাজার সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। আমরা যদি নিজের জন্য কিচেন গার্ডেন করতে চান, নাকি বাণিজ্যিকভাবে চাষ শুরু করতে চান? আপনার জমির আকার ও ধরন কেমন তা পরীক্ষার মাধ্যমে অর্গানিক পদ্ধতিতে চাষ করতে পারেন।

জীবন ধারণের জন্য প্রধান এবং প্রথম যেটি দরকার হয়, সেটি হচ্ছে খাদ্য। এই খাদ্য সংগ্রহ হত গাছ ও জল থেকে, পাশাপাশি পশু শিকারের মাধ্যমেও। প্রধানত তৃণভূমিতে শিকার করত তারা। যখন যেখানে শিকার সহজলভ্য ছিল, তারা সেখানে চলে যেত। কিন্তু প্রকৃতির নিয়মে নারীরা যখন অন্তঃসত্ত্বা অবস্থায় থাকতেন বা প্রসব করার পর বেশ কিছুদিন তারা দলের সঙ্গে এক অঞ্চল থেকে আরেক অঞ্চলে সর্বদা যেতে পারত না। তারা নিরাপদ দেখে কোন স্থানে থেকে যেত। খাদ্যের জন্য তাদের প্রধানত ভরসা করতে হত গাছের ফল-মূল ইত্যাদির ওপর। এই নারীদের চোখেই তখন ধরা পড়ে বীজ থেকে চারাগাছ, চারাগাছ থেকে গাছ, গাছের ফুল ও ফলের থেকেই বীজের পরিক্রমা। এই পরিক্রমাকেই পরবর্তী সময়ে নারীরা কাজে লাগিয়ে তাদের খাদ্য তৈরি করত। বর্তমানে যা আমরা সবাই কৃষিব্যবস্থা নামে জানি। এই নারীদের হাতেই সৃষ্টি হওয়া কৃষি আজও নদীমাতৃক গ্রাম বাংলা ও ভারতবর্ষের নারীদের হাতেই সযত্নে পালিত হয় বিভিন্ন সামাজিক রীতিনীতি, ব্রতকথা ও অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে, কীভাবে কৃষিকাজ করতে হয় তার পদ্ধতি ও কৃষির ইতিহাস ঐতিহ্যকে ধরে রেখেছে মূলত নারীরাই। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ঢাকুরিয়া অত্রি সোসাইটির পক্ষ থেকে গ্রাম অঞ্চলের মহিলাদের সঙ্গে নিয়ে কৃষির ওপর আমরা বিভিন্ন ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা করে থাকি। বাস্তবে বলতে কী, আমরা তাদের কাছ থেকে শিখে থাকি।

যখন রাসায়নিক সার আবিষ্কার হয়নি, তারও আগে যখন কৃষিকার্যে সার ব্যবহারই হত না, ভারতবর্ষের এরকম অনেক জায়গা আছে, যেখানকার মানুষেরা আজও বলেন, ‘আইল পানি গইল পানি ছোড়কে গায়া সোনে কা দানি’। অর্থাৎ বন্যার জল আসে বন্যার জল চলে যায় ছেড়ে যায় সোনার ফসল। ভারতবর্ষ এমনই একটা জায়গা, যেখানে কৃষি উৎপাদন করতে প্রকৃতি সমস্ত কিছু দিয়ে রেখেছে। তার মধ্যে বাংলা অন্যতম সেরা তো বটেই। গ্রাম থেকে নগর, নগর থেকে শহর, যখন তৈরি হয় রপ্তানি শুরু হয় খাদ্যদ্রব্যের ও খাদ্যশস্যের, তখন মানুষ চাষের ক্ষেত্রে সারের প্রয়োজন বোধ করে। একই জমিতে একাধিকবার চাষ অথবা বিভিন্ন ধরনের ফসলের জন্য। আধুনিক সভ্যতা, পাশ্চাত্যের ও কর্পোরেট দুনিয়ার আগ্রাসী শক্তির প্রভাব এই কৃষির ওপর এসে পড়ে, শুরু হয় রাসায়নিক সারের প্রয়োজন। এবং রাসায়নিক সার ব্যবহারের পরিণামে ক্রমশ মাটি হয়ে যায় অনুর্বর। ফলে নিত্যনতুন সমস্যার সম্মুখীন হতে হচ্ছে কৃষককুলকে। পাশাপাশি প্রাণীকুলের মধ্যেও এর কুপ্রভাব বিস্তার করছে ক্রমশ। এই সংকটের সময়ে দাঁড়িয়ে ঢাকুরিয়া অত্রি সোসাইটির পক্ষ থেকে বিভিন্ন কৃষক পরিবারকে জৈব সারের উৎপাদন ও জৈব সার ব্যবহারে উৎসাহী করার এক প্রচেষ্টা দীর্ঘকাল ধরে করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন








