আইন কি সবার জন্য সমান, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠের আধিপত্যই শেষ কথা?
রফিকুল হাসান: একটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি হল আইনের শাসন। রাষ্ট্রের শক্তি, মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে এই সত্যের ওপর যে, সেখানে আইন সব নাগরিকের জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য কি না। কিন্তু যখন কোনো সমাজে সংখ্যালঘু, দুর্বল বা ভিন্নমতের মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করে, তখন একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে — আইন কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি সংখ্যাগরিষ্ঠের ইচ্ছাই শেষ পর্যন্ত আইনকে নিয়ন্ত্রণ করে? ভারতের সংবিধান অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করেছে, রাষ্ট্র কোনো ব্যক্তির প্রতি ধর্ম, বর্ণ, ভাষা, লিঙ্গ বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে বৈষম্য করতে পারবে না। সংবিধানের ১৪ নম্বর অনুচ্ছেদে সবার জন্য “আইনের দৃষ্টিতে সমতা”এবং “আইনের সমান সুরক্ষা”নিশ্চিত করা হয়েছে। অর্থাৎ রাষ্ট্রের চোখে ধনী-দরিদ্র, সংখ্যাগুরু-সংখ্যালঘু, ক্ষমতাবান-সাধারণ সবাই সমান। কিন্তু কাগজে লেখা নীতি এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা সব সময় এক হয় না। অনেক সময় দেখা যায়, কোনো ঘটনার বিচার বা প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে এই ধারণা জন্মায় যে, সবার জন্য একই মানদণ্ড প্রয়োগ করা হচ্ছে না। কোথাও কোনো ঘটনার দ্রুত তদন্ত হয়, আবার কোথাও বছরের পর বছর তদন্ত ঝুলে থাকে। কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কণ্ঠস্বর গুরুত্ব পায়, আবার কোথাও তা জনমতের ভিড়ে হারিয়ে যায়। এসব পরিস্থিতি মানুষের মনে প্রশ্ন জাগায় — আইন কি সত্যিই নিরপেক্ষভাবে কাজ করছে?

বিশেষ করে ভারতবর্ষের মতো বহুধর্মীয়, বহুভাষিক ও বহুত্ববাদী সাংস্কৃতিক সমাজে এই প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এখানে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একসঙ্গে বসবাস করে আসছে। এই সহাবস্থানের সৌন্দর্য তখনই টিকে থাকবে, যখন প্রত্যেক নাগরিক বিশ্বাস করবেন, রাষ্ট্র তাঁর প্রতি সমান আচরণ করবে। যদি কোনো সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অনুভূতি জন্মায় যে, তাদের অভিযোগ, নিরাপত্তা বা অধিকার অন্যদের তুলনায় কম গুরুত্ব পাচ্ছে, তাহলে সামাজিক আস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে। গণতন্ত্রের একটি মৌলিক সত্য হল, সংখ্যাগরিষ্ঠতা সরকার গঠন করতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের মানদণ্ড নির্ধারণ করতে পারে না। ভোটের মাধ্যমে সংখ্যাগরিষ্ঠ মত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে; কিন্তু আদালত, প্রশাসন এবং আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কাছে প্রত্যেক নাগরিকের মূল্য সমান হওয়া উচিত। অন্যথায় গণতন্ত্র ধীরে ধীরে সংখ্যার শক্তিতে পরিচালিত এক ধরনের আধিপত্যে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে। ইতিহাস সাক্ষী, বহু দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠের আবেগ ও রাজনৈতিক শক্তি কখনো কখনো সংখ্যালঘু বা দুর্বল জনগোষ্ঠীর অধিকারকে সংকুচিত করেছে। কিন্তু একটি পরিণত রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য হল — সে সংখ্যার ভিত্তিতে নয়; ন্যায়ের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। কারণ, ন্যায়বিচার যদি সংখ্যার ওপর নির্ভর করে, তবে একদিন সেই সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশও অন্য কোনো পরিস্থিতিতে অবিচারের শিকার হতে পারে।

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা জরুরি। আইনের সমতা মানে শুধু আদালতে সমান বিচার নয়; বরং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, পুলিশি কার্যক্রম, সরকারি সুযোগ-সুবিধা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার — সব ক্ষেত্রেই সমান মর্যাদা সুনিশ্চিত করা। একজন সাধারণ নাগরিক যখন থানা বা আদালতে যান কিংবা কোনো সরকারি দপ্তরের দ্বারস্থ হন, তখন তাঁর পরিচয় হওয়া উচিত শুধু একজন নাগরিক হিসেবে; তাঁর ধর্ম, ভাষা বা সামাজিক পরিচয় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব ফেলবে না। আজকের দিনে সমাজমাধ্যম, রাজনৈতিক মেরুকরণ এবং গোষ্ঠীগত বিভাজন মানুষের মধ্যে সন্দেহ ও অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই মানুষ আইনের নিরপেক্ষতার চেয়ে সংখ্যার শক্তিকে বেশি কার্যকর মনে করতে শুরু করেছে। এ এক বিপজ্জনক প্রবণতা। কারণ, যখন মানুষ আইনের ওপর আস্থা হারায়, তখন সমাজে নৈরাজ্য, প্রতিশোধের মনোভাব এবং বিভাজন বৃদ্ধি পায়। তাই আমাদের প্রত্যেকের দায়িত্ব হল এমন এক সমাজ গড়ে তোলা, যেখানে ন্যায়বিচার কোনো সম্প্রদায়, গোষ্ঠী বা সংখ্যার ভিত্তিতে নির্ধারিত হবে না। রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে কাজ করতে হবে, যাতে একজন সাধারণ মানুষও দৃঢ়ভাবে বলতে পারেন — “আমার পাশে আইন আছে।”আইন যদি সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য না হয়, তাহলে সংবিধানের প্রতিশ্রুতি অর্থহীন হয়ে পড়বে।
এই প্রশ্নটি শুধু আইন বা আদালতের নয়; এটি রাষ্ট্রের নৈতিক চরিত্রের প্রশ্ন। একটি সভ্য গণতন্ত্রে শেষ কথা হওয়া উচিত আইনের শাসন, কোনো সম্প্রদায়ের আধিপত্য নয়; ন্যায়বিচার, কোনো সংখ্যার অহংকার নয়; সমতা, কোনো পক্ষপাত নয়। কারণ, যেখানে আইন সবার জন্য সমান, সেখানেই প্রকৃত গণতন্ত্র বেঁচে থাকে। আর যেখানে সংখ্যার জোর ন্যায়ের ওপর প্রাধান্য পায়, সেখানে গণতন্ত্রের আত্মাই সবচেয়ে বেশি আঘাতপ্রাপ্ত হয়।








