পারমাণবিক প্রতিযোগিতা
নব্বইয়ের দশকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর এই প্রথম আমেরিকা ও রাশিয়ার মধ্যে লাগামহীন পরমাণু অস্ত্র প্রতিযোগিতায় জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুই দেশের মধ্যে টিকে থাকা একমাত্র অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র এক সপ্তাহও বাকি নেই। শেষ মুহূর্তে কোনো নাটকীয় পটপরিবর্তন না সমঝোতা না হলে বিশ্ব এক নতুন অস্থিরতার মুখে পড়বে।
৫ ফেব্রুয়ারি ‘নিউ স্টার্ট’ চুক্তির মেয়াদ শেষ হচ্ছে। এটি কার্যকর না থাকলে দূরপাল্লার পারমাণবিক অস্ত্রের ওপর আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। ১৯৭২ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও সোভিয়েত রাষ্ট্রপ্রধান লিওনিদ ব্রেজনেভ এই চুক্তি সই করেছিলেন। বর্তমান রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন প্রস্তাব দিয়েছেন, পরবর্তী করণীয় ঠিক করার জন্য বর্তমান চুক্তির শর্তগুলোই আরও এক বছর বহাল রাখা হোক। তবে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এখন পর্যন্ত এর কোনো আনুষ্ঠানিক জবাব দেননি। চলতি মাসেই ট্রাম্প মন্তব্য করেন, মেয়াদ শেষ হলে হোক, বরং একে আরও উন্নত কোনো চুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা উচিত।
মার্কিন রাজনীতিকদের একাংশ মনে করেন, পুতিনের প্রস্তাব ট্রাম্পের প্রত্যাখ্যান করা উচিত। এতে ওয়াশিংটন নিজের অস্ত্রভান্ডার বাড়ানোর সুযোগ পাবে, যা চীনের দ্রুত বাড়তে থাকা পারমাণবিক সক্ষমতা মোকাবিলায় সহায়ক হবে। ট্রাম্প অবশ্য রাশিয়া ও চীন — উভয় দেশের সঙ্গেই পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণে আগ্রহ দেখিয়েছেন। তবে বেইজিং সাফ জানিয়েছে, আমেরিকা ও রাশিয়ার অস্ত্রভান্ডার তাদের চেয়ে বহুগুণ বড়, তাদের সঙ্গে নিরস্ত্রীকরণ আলোচনায় বসা অযৌক্তিক।
স্নায়ুযুদ্ধের সেই অন্ধকার দিনগুলোতে যখন আমেরিকা ও সোভিয়েত ইউনিয়ন একে অপরকে ‘ধ্বংস’ করার হুমকি দিত, তখন থেকেই দুই পক্ষ অস্ত্র সীমাবদ্ধকরণ চুক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে আসছে। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল কোনো মারাত্মক ভুল বোঝাবুঝি বা অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করে দেওয়ার মতো অস্ত্র প্রতিযোগিতা এড়ানো।
লন্ডনভিত্তিক চিন্তন প্রতিষ্ঠান ‘রুসি’র গবেষক দরিয়া দোলজিকোভা বলেন, এই চুক্তিগুলো কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা ওয়ারহেডের সংখ্যার সীমাবদ্ধতা নয়; বরং দুই পক্ষের মধ্যে তথ্য আদান-প্রদানের সুযোগ তৈরি করে। এটি একে অপরের উদ্বেগ এবং লক্ষ্য বোঝার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
সোভিয়েত ও রাশিয়ার সাবেক অস্ত্র আলোচক নিকোলাই সকভ মনে করেন, কোনো নতুন চুক্তি না থাকলে প্রতিটা দেশই প্রতিপক্ষের অস্ত্র উৎপাদন ও মোতায়েন নিয়ে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখে কাজ করতে বাধ্য হবে। তিনি বলেন, এটি একটি চক্রাকার প্রক্রিয়া। আর নিয়ন্ত্রণহীন অস্ত্র প্রতিযোগিতা পরিস্থিতিকে ভয়াবহভাবে অস্থিতিশীল করে তোলে।
১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর থেকে রাশিয়া ও আমেরিকা বারবার স্নায়ুযুদ্ধ আমলের চুক্তিগুলো হালনাগাদ করেছে। সর্বশেষ চুক্তি নিউ স্টার্ট-২০১০ সালে বারাক ওবামা ও দিমিত্রি মেদভেদেভ স্বাক্ষর করেছিলেন। এই চুক্তিতে প্রতিটি দেশের জন্য মোতায়েনকৃত কৌশলগত ওয়ারহেডের সংখ্যা ১৫৫০ এবং তা বহনে ক্ষেপণাস্ত্র বা বোমারু বিমান ৭০০-তে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
তবে এই চুক্তি প্রতিস্থাপন করা এখন অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। রাশিয়া ইতিমধ্যেই ‘বুরভেস্টনিক’ ক্রুজ মিসাইল বা ‘পসেইডন’ টর্পেডোর মতো নতুন কিছু ব্যবস্থা তৈরি করেছে, যা বর্তমান চুক্তির কাঠামোর বাইরে। অন্যদিকে ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, মহাকাশভিত্তিক ‘গোল্ডেন ডোম’ ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কথা, যাকে মস্কো কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করার চেষ্টা হিসেবে দেখছে।
একই সময়ে চীনের ক্রমবর্ধমান পারমাণবিক সক্ষমতাও মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পেন্টাগনের ধারণা, ২০৩০ সালের মধ্যে বেইজিংয়ের হাতে হাজারের বেশি ওয়ারহেড থাকবে। ২০২৩ সালের একটি দ্বিপাক্ষিক কংগ্রেসনাল কমিশন সতর্ক করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন একক নয়; বরং রাশিয়া ও চীন দুই পারমাণবিক শক্তির কাছ থেকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন।
পুতিনের প্রস্তাব মেনে নেওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিনির্ধারকদের মধ্যে স্পষ্ট বিভাজন দেখা দিয়েছে। সাবেক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তা ও নিউক্লিয়ার থ্রেট ইনিশিয়েটিভের পল ডিন মনে করেন, একটি ধ্বংসাত্মক পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতা এবং সংকটের মুহূর্তে ভুল বোঝাবুঝির ঝুঁকি কমাতে ট্রাম্পের উচিত ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া।
কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ থেকে ২০৩৪ সালের মধ্যে পারমাণবিক শক্তি আধুনিকায়ন ও পরিচালনার জন্য মার্কিন করদাতাদের প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লক্ষ কোটি ডলার গুনতে হবে। ডেমোক্র্যাট সিনেটর এড মার্কেট বলেন, ‘আমেরিকা যদি চুক্তির সীমা লঙ্ঘন করে ওয়ারহেড বাড়ায়, তবে রাশিয়াও তা-ই করবে। আর চীন এটাকে তাদের অস্ত্রভান্ডার বাড়ানোর নতুন অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করবে।’ তাঁর মতে, ট্রাম্প এমন এক অস্ত্র প্রতিযোগিতা শুরু করতে যাচ্ছেন, যা জেতা সম্ভব নয় এবং এতে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে। সব মিলিয়ে বলা যায় চলমান বিশ্ব নতুন করে পরমাণু প্রতিযোগিতায় এগোচ্ছে, যার পরিণতি মারাত্মক ভয়াবহ হতে পারে। ভিয়েতনাম, হিরোশিমা, নাগাসাকির ক্ষয়ক্ষতির মিলিত পরিমাণকে ছাপিয়ে যাবে।








