জীবন হোক আনন্দময়
জীবনে যদি আনন্দ না থাকে, তাহলে সে জীবন বৃথা। আনন্দবিহীন মানুষ হল জীবন্ত লাশ। ৬০ বছরের বেশি বয়সি ব্যক্তিদের সিনিয়র সিটিজেন বা প্রবীণ বলা হয়। একজন প্রবীণ মানুষ পরিবারে ছাতার মতো। তার অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান পরিবার পরিচালনায় অনেক সাহায্য করে। পরিসংখ্যান বলছে, বর্তমান বিশ্বে ৬৫ ঊর্ধ্ব মানুষের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। আর নতুন প্রজন্ম কমছে, কারণ জন্মহার হ্রাস পাচ্ছে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ১৪ শতাংশ এবং মধ্য ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোতে প্রায় ৪-৭ শতাংশ মানুষ প্রবীণ। বর্তমান যুগে মানুষের গড় আয়ু বাড়ছে। এতে ঝুঁকির মুখে পড়ছে বয়স্ক নাগরিকদের স্বাস্থ্যসেবা।
২০৫০ সালে প্রবীণ মানুষের গড় হার ২০ শতাংশ হতে পারে বলে অভিমত বিশেষজ্ঞদের। কিন্তু তখন প্রবীণদের জীবনযাত্রার চাপ আরো বাড়বে। কারণ, কমবেশি সব দেশেরই অর্থনীতি ক্রমহ্রাসমান। এর সবথেকে বড় কারণ হল, দুর্নীতি। ফলে শিক্ষা, স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক পরিসেবা খাতগুলো ধুঁকছে। এমতাবস্থায় বয়স্ক মানুষদেরকে অনেকে বোঝা মনে করছে। বৃদ্ধ পিতা-মাতাদের প্রতি সন্তানদের আকর্ষণ, শ্রদ্ধা, ভালবাসা কমছে। তবে এক্ষেত্রে আদালতের কিছু রায় উল্লেখযোগ্য ভূমিকা নিচ্ছে। প্রবীণ পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ নিতে সন্তানদের বাধ্য করা হচ্ছে। কেউ এই দায়িত্ব পালন না করলে, তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থার কথা বলছে আদালত।
কিন্তু এভাবে আইন, আদালত বা প্রশাসন দিয়ে বিষয়টা সামাল দেওয়া সম্ভবপর নয়। এটা হল নৈতিক শিক্ষার বিষয়। গলদটা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায়। এখনকার প্রথাগত বা পুঁথিগত শিক্ষা ব্যবস্থা কেরিয়ার ওরিয়েন্টেড। এই শিক্ষা মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করছে। মায়া, মমতা, দয়া, স্নেহ, ভালবাসা, সম্মান, শ্রদ্ধা, মানবিকতা, নৈতিকতা ইত্যাদি হু হু করে কমছে। নৈতিকতা ও মূল্যবোধের শিক্ষা না দেওয়া হলে পরিবার, সমাজ, দেশ কাঙ্খিত মানে কখনোই পৌঁছতে পারবে না। তাই দেখা যাচ্ছে, শিক্ষার হার যত বাড়ছে, তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে নিউক্লিয়ার ফ্যামিলি কনসেপ্ট, বৃদ্ধাশ্রম, লিভ টুগেদার, বিবাহ বহির্ভূত সম্পর্ক, পরকীয়া, সমকামিতা, বহুগামিতার মতো অভিশপ্ত সামাজিক ব্যাধিগুলো।
বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা দিয়ে খুব বেশি কাজ হয় না। মাত্র ১-২ হাজার টাকায় এই মাগ্গিগন্ডার বাজারে কী আর হবে। আবার বয়স্ক মানুষদের যাতনা-বেদনার খবর অনেক ক্ষেত্রেই সামাজিক সংকীর্ণতার কারণে অপ্রকাশিত থেকে যায়। বয়স ৬০-৬৫ বছর হলে গড়পড়তা মানুষ কর্মক্ষমতা হারান। এই বয়সে তারা নানা রকম রোগে আক্রান্ত হন। তারা তো এতকাল সংসারের বোঝা টেনেছেন, ছেলেপুলে মানুষ করেছেন, তাদেরকে পড়াশোনা শিখিয়েছেন। কিন্তু বর্তমান প্রজন্ম এসব ভুলে যাচ্ছে। বাবা-মায়েদের প্রতি এখনকার ছেলেদের সম্মান, শ্রদ্ধা, সহানুভূতি কমে যাচ্ছে। অথচ তারা একবারও ভাবছে না যে, বাবা-মা না থাকলে তারা কোথা থেকে জন্ম নিত? কে তাদেরকে খাইয়ে-পরিয়ে, যত্ন-আদর করে মানুষ করত, কে তাদেরকে পড়াশোনা করাত? এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে দু-দিকটাই ভাবতে হবে।
প্রথমত কিছু বাবা-মা তাদের সন্তানকে সুশিক্ষা দিতে পারেননি বা বিষয়টাকে সেভাবে গুরুত্ব দেননি। খাইয়েছেন, পরিয়েছেন, পড়িয়েছেন — জাগতিক প্রয়োজনীয় সবকিছুই অতি যত্ন সহকারে করেছেন। কিন্তু সন্তানকে প্রকৃত অর্থে বা সত্যিকার অর্থে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার অবকাশ পাননি অথবা বিষয়টার প্রয়োজন অনুভব করেননি। আজ তারই পরিণামে মাশুল দিতে হচ্ছে ওইসব অভিভাবককে। আবার অন্যদিকে, সন্তানের দোষও অনেক। তারা তাদের জন্মদাতা বাবা-মায়েদের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা, সম্মানবোধ রাখছে না। তারা কেবল শিক্ষিত হয়ে চাকরি বা জব করে স্ত্রী, পুত্র নিয়ে খোশ মেজাজেই আছে। বাবা-মায়ের প্রতি তাদের দায়িত্ব, কর্তব্য কী, তাঁদের সঙ্গে কেমন আচরণ করতে হবে, ইত্যাদি বিষয়ে একেবারেই উদাসীন।
সব ধর্মেই বাবা-মা, গুরুজনদের প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান প্রদর্শনের কথা বলা আছে, জোরালো তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেসব কথা তাদের মনে রেখাপাত করেনি। কারণ, ধর্মকে আমরা আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব করে রেখেছি। ধর্মীয় শিক্ষাকে দৈনন্দিন জীবনের চর্চার মধ্যে রাখিনি। হিন্দুরা মন্দিরে যান, বিভিন্ন পুজো করেন। মুসলিমরা মসজিদে যান, নামায, রোযা করেন। কিন্তু ধর্মকে আমরা এই পরিসরেই গণ্ডিবন্ধ করে রেখেছি। ধর্ম থেকে শিক্ষা নিয়ে নিজেদের আধ্যাত্মিক চেতনার উন্মেষ ঘটাতে পারিনি। সুবিধাবাদীরা বলে, ধর্মকে রাজনীতির সঙ্গে মেলানো যাবে না, এটা কাম্য নয়। কিন্তু সত্যিই কি তাই? রাজনীতিবিদরা ধর্ম-বিমুখ থাকবেন, আর ধার্মিকরা রাজনীতি-বিমুখ থাকবেন, কেবল মুখ গুঁজে ধর্মচর্চা করে যাবেন। রাজনীতিকরা যত খুশি অনাচার, অবিচার, ব্যভিচার, অত্যাচার, কদাচার, পাপাচার করেই যাবে, আর ধর্মপ্রাণ মানুষরা কোনদিকে তাকাবে না, কেবলই ধর্মের নেশায় বুঁদ হয়ে ধ্যান, তপস্যা, আরাধনা, উপাসনা, ইবাদাত ইত্যাদি করেই যাবেন — এ কেমন ধর্ম?
ইবাদাত মানে কেবল নামায, রোযাই নয়। ইবাদাত মানে হল জীবনের সবক্ষেত্রে আল্লাহর আদেশ, নিষেধ মেনে চলা এবং সর্বোপরি সবক্ষেত্রে ইসলামের দিকনির্দেশনা মেনে চলা। জীবনবিধান আল কুরআনে নামায, রোযা ইত্যাদি আনুষ্ঠানিক ইবাদাত নিয়ে বড়জোর শতাধিক বা কয়েকশো আয়াত আছে। কিন্তু বাকি ৬ হাজারেরও বেশি আয়াতে কী আছে, সেসব আমরা জানার চেষ্টা করি না। সব ধর্মেই ব্যবহারিক জীবন, পারিবারিক জীবনের জন্য মানবীয় নীতীমালা লিপিবদ্ধ বা বিধিবদ্ধ আছে। আমরা সেসবের ধার ধারি না। তাই আমাদের বাস্তব জীবনের সঙ্গে ধর্মের বিধি-বিধানের তেমন কোন সম্পর্কই নেই।
ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক শিক্ষাকে দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োগ করলে বয়স্ক মানুষদেরকে আমরা পরিবারের অবিচ্ছেদ্য ও গুরুত্বপূর্ণ অংশ বলে মনে করতাম। তাদেরকে বোঝা ভাবতাম না। বোঝা ভাবছি, কারণ, আমরা তাদের গুরুত্ব, মর্যাদা, প্রয়োজনীয়তা এবং সর্বোপরি জন্মদাতা হিসেবে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব-কর্তব্য সম্পর্কে আমরা ওয়াকিবহাল নই। ইসলামের নীতি হল, বাবা-মায়েদের সঙ্গে সর্বোত্তম আচরণ করলে তারাই আমাদের জন্য জান্নাতের সিঁড়ি হতে পারেন, অন্যথায় তারাই আমাদের জন্য জাহন্নামের কারণ হবেন। তাই এ ব্যাপারে আমাদেরকে খুব সাবধান, সতর্ক হতে হবে।








