তিলোত্তমার ‘মজুমদার’ পদবী কিন্তু মুসলমান বাদশাদের
নবিউল ইসলাম
লোকে বলে ‘নামে কী এসে যায়’! এসে যায় বা যায় না, তবু নাম নিয়ে মানুষের চর্চা নিরন্তর। পিতা-মাতা পুত্রের ‘রবি’ নাম রাখেন উদার আকাশে অকৃপণ সূর্যের রশ্মি ও অন্ধকার থেকে আলোর কথা ভেবে। ‘চন্দ্র’ বা ‘চাঁদ’ নাম রাখেন চাঁদের নরম আলো এবং জ্যোৎস্নার কথা ভেবে। পিতা-মাতা মনের আশা-আকাঙ্ক্ষা পুত্র-কন্যার মাধ্যমে প্রস্ফুটিত হোক – সেই বাসনা অবশ্যই কামনা করেন। সব বাসনা বাস্তবে রূপ পায়, এমনটা নয়। আবার বাস্তবায়িত হয়, এমন উদাহরণ যথেষ্ট রয়েছে। যেমন আমাদের রবীন্দ্রনাথ। তিনি সাহিত্যের ‘ঠাকুর’, রবিকিরণ বিলিয়েছেন সাহিত্যের উদার আকাশে।
ওঁকে বলা হচ্ছে সাহিত্যিক। সাহিত্যিক তিলোত্তমা মজুমদার। সোশ্যাল মিডিয়া, টেলিভিশনের দৌলতে ওঁ এখন ভাইরাল, মানে আলোচনার শীর্ষে উঠে এসেছেন। তাঁর পিতা-মাতার দেওয়া নাম তিনি সার্থক করে তুলেছেন? এখন তিলোত্তমার মুখ থেকে যে বিষ-বিষ্ঠা বের হচ্ছে, সেটা সেই তিলোত্তমার হতে পারে না। তারপর তাঁর পদবী আছে ‘মজুমদার’। সব মিলিয়ে তিলোত্তমা মজুমদার। ‘তিলোত্তমা মজুমদার’ – আসলে ব্যাপারটা কী? কয়েকটি বাক্য লিখে নীহারুল ইসলামের সৌজন্যে প্রাপ্ত ভিডিওটি পোস্ট করব ভেবেছিলাম। সেই মতো নীহারুলের সাথে কথাও হয়। কেন জানি না, লেখাটি এখন অন্যদিকে চলে যাচ্ছে। ‘তিলোত্তমা’ আর ‘মজুমদার’-এর খোঁজ নিতে শুরু করি। নীহারুল ইসলামের ‘খোঁজ’ এবং তার তিলোত্তমাকে খুঁজে বের করার কথা লিখব শেষে।
‘তিলোত্তমা’ শব্দের মানে শুনলে একটু পুলক অনুভব হবেই হবে। ‘তিলোত্তমা’ শব্দের অর্থ হল ‘সবচেয়ে সুন্দরী’ বা ‘তিল তিল করে উৎকৃষ্ট সৌন্দর্য দিয়ে গঠিত’। এটি পুরাণে বর্ণিত এক অপ্সরার নাম, যাকে ত্রি-ভুবনের সকল সৌন্দর্য থেকে তিল তিল করে সৌন্দর্য আহরণ করে সৃষ্টি করা হয়েছিল। সুন্দ ও উপসুন্দ নামক দুই অসুরকে বধ করার জন্য বিশ্বকর্মা এই অপ্সরাকে সৃষ্টি করেছিলেন। আধুনিক সময়ে ‘তিলোত্তমা’ শব্দটি একটি সুন্দর ও আকর্ষণীয় শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং কলকাতাকেও এই নামে অভিহিত করা হয়। কারণ, এটি কলকাতার সাংস্কৃতিক ও নান্দনিক গুরুত্বকে নির্দেশ করে। নিশ্চয়ই এতসব বিষয়কে মনে রেখে তাঁর পিতা-মাতা নাম রেখেছিলেন তিলোত্তমা। কিন্তু এই তিলোত্তমা সেপথে না গিয়ে এখন বিষ্ঠা-ভাষণে পটু হয়ে উঠেছেন।
‘মজুমদার’ শব্দটি জাতিগত পদবি নয়, বিশেষ একটি উপাধি। এই উপাধি মোঘল ও ব্রিটিশ আমলে যাঁরা এক বা একাধিক মৌজার ভূস্বামী ছিলেন, তাদের দেওয়া হত। সেই জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের বাঙালি হিন্দু এবং মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যেই প্রচলিত। তাই এটি কোনো একটি বিশেষ বংশ বা গোত্রের ইতিহাস নয়, বরং এটি একটি পেশাভিত্তিক পদবি ছিল, যা পরবর্তীতে বংশগত উপাধিতে পরিণত হয়।
‘মজুমদার’ শব্দটি সম্ভবত ফার্সি শব্দ ‘মজুম’ (সমষ্টি) এবং ‘দার’ (ধরে রাখা) থেকে এসেছে, যার অর্থ ‘সমষ্টির ধারক’ বা ‘সংগ্রাহক’। যাঁরা একাধিক মৌজার হিসাব রাখতেন, বা রাজস্ব আদায় করতেন, তাঁদের মজুমদার বলা হত। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে মোঘল আমলে এই পদবির প্রচলন হয়। যে সকল ভূস্বামী বা ভূস্বামীরা একাধিক মৌজার মালিক ছিলেন, তাঁরা এই উপাধি ধারণ করতেন। বর্তমানে এটি একটি সাধারণ উপাধি হিসেবে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তানের বাঙালি হিন্দু এবং মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে প্রচলিত। পশ্চিমবঙ্গে এই পদবির মানুষ মুসলমানদের মধ্যে তেমন দেখা যায় না। বাংলাদেশে আছে। যেমন জ্যোতির্বিজ্ঞানী আবু তাহের মজুমদার, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাহবুব মজুমদার, মানবাধিকার কর্মী বদিউল আলম মজুমদার এবং রাজনীতিবিদ দেলোয়ার হোসেন মজুমদার — এরকম অনেক বিখ্যাত মানুষ রয়েছেন। এটা ঠিক, এখন এটি একটি উচ্চ শ্রেণির পদবি হিসেবে বিবেচিত হয়, যে পদবির প্রচলন করেন মুসলমান মোঘল বাদশাহরা। তিলোত্তমার পদবি ‘মজুমদার’। এই পদবি নিয়ে আত্মগর্বী তিলোত্তমা এখন মুসলমানদের ‘দুশমন’ বলছেন। অথচ মুসলমানদের দেওয়া ‘মজুমদার’ পদবির সঙ্গেই তাঁর সহ-বাস।
নীহারুল ইসলাম বাংলা কথাসাহিত্যে এখন পরিচিত নাম। তার ‘খোঁজ’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকা আছে। পিতা রফিকুল ইসলামের স্মৃতিতে প্রতি বছর পুরস্কার ও সম্মাননা প্রদান করে। এই মহৎ কাজটি নীহারুল প্রায় দু’দশকের উপর করে আসছে। ২০১৩ সালে তিলোত্তমা মজুমদারকে সম্মাননা দেয় ‘খোঁজ’ পত্রিকা। লালগোলায় এসেছিলেন তিলোত্তমা। রাত্রিযাপন করেন নীহারুলের পরিবারের সঙ্গে। হোটেলে থাকেননি, তার গ্রামের বাড়িতে মা-চাচী-বোন, পরিবারের বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে মেতে ওঠেন রবীন্দ্র সংগীতে। এখন তিলোত্তমা মজুমদারের বিষ-ভাষণ শুনে নীহারুল ইসলামের আক্ষেপ — ”তিলোত্তমা, আপনি কী করে সব ভুলে গেলেন? ভাবতেই অবাক লাগছে…।” সাহিত্যিক অনিতা অগ্নিহোত্রী বিস্মিত — “এটা কী করে সম্ভব বুঝতে পারছি না। অচেনা মনে হচ্ছে। এত ঘৃণা?”
কথা হল, কেন তিলোত্তমা এরকম ঘৃণ্য আচরণ করছেন? বিদ্বেষপূর্ণ হিন্দুত্ববাদী অপরাজনীতির হাতছানি! তাঁর রচনা পড়িনি। তবে এটা বুঝতে পারছি, বারো বছরে সময়ের সাথে সাথে নিজেকে পাল্টে ফেলেছেন। বিদ্বেষের বিষ-পাহাড় জমেছে তাঁর মনে। এটা বমনেচ্ছার সামান্য লক্ষণ মাত্র। ‘অপ্সরী’ তিলোত্তমা ‘দস্যু’ মুসলমান বধে এখন ছিন্নমস্তা!








