এসআইও-র ৪৩ বছর অন্যদের সঙ্গে এই ছাত্র সংগঠনের তফাৎ কোথায়?
বিশেষ প্রতিবেদন
১৯৮২ সালের ১৯ অক্টোবর এক স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল Study, Struggle & Service-এর মাধ্যমে সমাজ পরিবর্তনের আহ্বান নিয়ে। যে স্বপ্নের নাম SIO of India। তাই ১৯ অক্টোবর দিনটি ‘স্টুডেন্টস ইসলামিক অর্গানাইজেশন অফ ইন্ডিয়া’ বা এসআইও-র প্রতিষ্ঠা দিবস হিসেবে দেশজুড়ে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হয়। আজ থেকে ৪৩ বছর আগে মূলত ছাত্র সমাজের দ্বারা, ছাত্রদের নিয়ে এবং ছাত্রদের জন্য গড়ে ওঠা এই সংগঠনের মিশন হল, ঐশী পথনির্দেশনা অনুযায়ী নিজেদের ব্যক্তিজীবন, পরিবার এবং সমাজ পুনর্গঠন করা। আমাদের মিশন স্টেটমেন্টের প্রথম অংশটি প্রকৃতপক্ষে এই কথার ঘোষণা দেয় যে, কুরআন ও হাদীসই আমাদের মূলমন্ত্র এবং ভিত্তি। এ ছাড়া পৃথিবীতে যত চিন্তাধারা, ভাবনা, ধারণা, মতাদর্শ বা দর্শন পাওয়া যায় — সবগুলোই আমাদের কাছে বাতিল বা তাজ্য। কুরআন ও হাদীসই হল আমাদের একমাত্র ভিত্তি, আমাদের প্রাথমিক তথ্যসূত্র। যা কিছু কুরআন ও সুন্নাহ অনুযায়ী হবে, তা আমরা গ্রহণ করব এবং যা কিছু কুরআন ও সুন্নাহ-বিরোধী হবে, সেগুলো আমরা বাতিল বা বর্জন করব। আমাদের চিন্তাধারা ও মতাদর্শ হল খাঁটি ইসলাম।
আমরা তাদের মতো নয়, যারা সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে পরিবর্তিত হতে থাকে। ‘চলো তুম উধার কো, হাওয়া হো যিধার কি’ অর্থাৎ তুমি সেদিকেই চলতে থাকো, হাওয়া যেদিকে যাচ্ছে — এটা যাদের স্লোগান, তাদের মধ্যে আমরা নেই। আমরা সময় ও পরিস্থিতির পরিবর্তনে মূল চিন্তা-চেতনার বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করি না। তাই আমাদের থেকে যদি কেউ প্রত্যাশা রাখে যে, সময়ের পরিবর্তনে, নাজুক মুহূর্তে আমরাও অবস্থান বদল করব, নতুন স্লোগানে গা ভাসাব, তাহলে সে সম্পূর্ণ ভুল বোঝাবুঝির মধ্যে নিমজ্জিত। সেই ব্যক্তি আমাদের চিন্তাধারার বলিষ্ঠতা এবং মতাদর্শের ভিত্তি বুঝতে সক্ষম হয়নি।

ঐশী পথ-নির্দেশের ফোকাসে আলোকিত এসআইও আমাদেরকে সকল মানবীয় চিন্তাধারা থেকে মুক্ত রাখে। আমাদেরকে বাস্তব ও চারিত্রিক অন্ধকার থেকে বাঁচায়, আমাদেরকে মতাদর্শগত অন্ধকার থেকে সুরক্ষিত রাখে। আমরা শান্তিপূর্ণ ও গঠনমূলক উপায়ে আমাদের বার্তা অন্যদের কাছে পৌঁছে দিই। এই সর্বজনীন দাওয়াত পৌঁছাতে আমরা সফল। আমরা চাই আমাদের কর্মীরা চৈন্তিক বা বৌদ্ধিক এবং চারিত্রিকভাবেও সর্বোচ্চ স্থানে থাকবে। এটাই আমাদের মিশনের মূল প্রতিপাদ্য বিষয়।
আমাদের ‘মিশন স্টেটমেন্ট’-এর দ্বিতীয় অংশ হল, সমাজের পুনর্গঠন। এটা ঘোষণা দেয় যে, সারা দুনিয়ায় শিরক ও নাস্তিকতার উপর ভিত্তি করে যে জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত আছে আমরা তার দ্বারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত হই। এই দুটো মতবাদের উপর নতুন কোন সমাজব্যবস্থা গঠন হলে তা দেখে আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়। এই জীবনব্যবস্থার ফলে আল্লাহর এই দুনিয়ায় যে অন্যায় হয়, যে শোষণ হয়, যে মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় — এই সমস্ত কিছুকে আমরা প্রচন্ড ঘৃণা করি। এই জমিনের অরাজকতার সঙ্গে আমাদের সামঞ্জস্যতা ও সামঝোতার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। অন্যায়-অত্যাচার, অবিচার, অধিকার লঙ্ঘন আমাদের গলায় কাঁটার মতো বিদ্ধ হয়, আমরা শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাই। আর এই কণ্টকময় শরীর এবং শ্বাসরুদ্ধকর অনুভূতি আমাদেরকে ছুটে গিয়ে সকল অন্যায়ের মূল উপড়ে ফেলতে উদ্যত করে। আমরা সমাজে
ন্যায়ের শাসন চাই, অন্যায় অবিচারের সমাপ্তি চাই।
আমাদের এই মানসিক কষ্ট এবং শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা আমাদের অনেক বড় সম্পদ, আমাদের ভিত্তি। এটাই আমাদেরকে সর্বদা আন্দোলনের পথে চালিত করে। আমরা দুনিয়ায় কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণ করেই একটা নৈতিক বিপ্লব নিয়ে আসব। এখানে যে অত্যাচার ও অবিচারের জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত আছে, তা বদলে দিয়ে একটা ন্যায়ভিত্তিক ও ইসলামী জীবনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করার আমরণ প্রচেষ্টা চলতেই থাকবে। আমাদের মিশনের তৃতীয় অংশে আছে ‘ছাত্র ও যুবকদের তৈরী করা’। আমাদেরকে অবশ্যই স্মরণে রাখতে হবে যে, আমরা শুধু একটা সংগঠন নয়; বরং সুবিশাল ইসলামী আন্দোলনের অংশ। আর সেই আন্দোলনের মূল উদ্দেশ্য হল ইকামতে দ্বীন। এই দুনিয়ার প্রত্যেকটি শাখায়, জীবনের প্রতিটা অঙ্গনে প্রতিষ্ঠা করতে হবে ইসলামের নীতিমালা ও বিধান। এই লক্ষ্যে পৌঁছতে অবিরাম সংগ্রাম করতে হবে। লাগাতার জারি থাকা এই সংগ্রাম থেকেই পরিবর্তন আসবে। দ্বীন প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও ইচ্ছা পূরণ হবে। শুধু বক্তব্য আর লেখালিখির দ্বারা এই কাজ আঞ্জাম দেয়া সম্ভব নয়। একটা নিরন্তর সংগ্রামে ছাত্র ও যুবকদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত জরুরি।

এসআইও ইসলামী আন্দোলনের বৃহৎ কাফেলায় এই অভাবটা পূরণ করেছে। আপনারাও এই কাফেলায় অংশগ্রহণ করুন, আর এখানে ছাত্র-যুবকদের তৈরি করুন। ছাত্র-যুবরা সমাজের সেই অংশ, যারা সমাজের গতি পরিবর্তনের আবেগ নিজেদের মধ্যে রাখে। এই পৃথিবীতে ভাল বা মন্দ, নৈতিক বা অনৈতিক যে বিপ্লব আসে, সেই বিপ্লব শুধুমাত্র ছাত্র-যুবকদের কাঁধে ভর করেই আসে। যদি যুবকদের চিন্তা-চেতনা সঠিক দিশামুখী হয়, তাহলে সঠিক বিপ্লব আসবে। আর যদি তারা ভ্রান্ত দিশায় চিন্তা-ভাবনা করে, তাহলে অকল্যাণকর বিপ্লব আসবে। যুবকদের শক্তি হল বৈপ্লবিক শক্তি, সেটা যদি সঠিক দিশায় ব্যয় হয়, তাহলেই প্রতীক্ষিত বিপ্লব আসবে। এসআইও-র উদ্দেশ্যই হল ছাত্র-যুবদের সঠিক দিশায় প্রশিক্ষণ দেওয়া, যাতে তাদের মাধ্যমে নৈতিক বিপ্লব হয়, সঠিক বিপ্লব আসে।
আজকের এই বিশেষ দিনে আমরা বিনম্র চিত্তে আল্লাহ তায়ালার শুকরিয়া আদায় করি। আসুন, পুনরায় অঙ্গীকার করি এবং প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই, আমাদের কথাবার্তা, চলাফেরা, কর্মকাণ্ড সবকিছুই ঐশী পথ-নির্দেশনা অনুযায়ী হবে। আমরা সমস্ত ধরনের ভ্রান্ত চিন্তাধারা, বিপথগামিতা, পথভ্রষ্টতা, অসংলগ্ন চিন্তাভাবনা থেকে নিজেকে মুক্ত রাখব।
এসআইও’কে বোঝার জন্য যদি আমরা সংগঠনের একজন সদস্যের চিত্রাঙ্কন করি, তাহলে সেই ছবিটা কেমন হবে? আপনারা নিজেকে সংগঠনের চৌহদ্দির বাইরে থেকে কল্পনা করুন। ভাবুন এসআইও’র কোনো সদস্যের সঙ্গে আপনার সাক্ষাৎ হয়েছে। সেই সাক্ষাৎ এমন একজন সদস্যের সঙ্গে হচ্ছে, যার গুণাবলী দ্বারা আপনি অত্যন্ত প্রভাবিত হচ্ছেন। এইবার দেখুন। এসআইও’র একজন সদস্যের সঙ্গে যখন আপনার দেখা হবে, সে সালাম দিয়ে সাক্ষাৎ শুরু করবে। তারপর সে মুচকি হেসে ভদ্র, নম্র হয়ে আপনার সঙ্গে কথা বলবে। তাঁর কথাবার্তায় আপনি অনুভব করবেন সে অনেক বিনম্র স্বভাবের, অহংকার বা দাম্ভিকতার কোনো ছাপ তাঁর মধ্যে নেই। সে আলোচনা শোনার জন্য প্রস্তুত, কথোপকথনের মধ্যে শুধু সে-ই বলতে চায় না; বরং দ্বিতীয়জনের চিন্তাভাবনা শোনায় অভ্যস্ত। সে শুধু অন্যকে নিজের কথা শুনিয়েই সন্তুষ্ট হয়ে যায় না। সে অযৌক্তিক বিতর্ক থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। অন্যকে তর্কে হারিয়ে সে আত্মতৃপ্তি অনুভব করে না। তার মেজাজ একজন দ্বা’য়ীর মতো, অন্যকে বিতর্কে হারিয়ে দেওয়ার মানসিকতা কোনো দ্বা’য়ীর হতে পারে না।

এসআইও’র সদস্য সমালোচনাও করে, তবে তার সমালোচনা গঠনমূলক, সংশোধনের উদ্দেশ্যেই সে সমালোচনা করে থাকে। একটি বিষয় সে অত্যন্ত বলিষ্ঠ মতামত পেশ করে। তার মতামত বা সিদ্ধান্ত মতো পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে সে সমালোচনা করে, কিন্তু সেই সমালোচনা নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে নয়; বরং ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিতে হয়। সে শুধু সমালোচনাই করে না; বরং কাজের ময়দানেও তৎপর থাকে। এই দুনিয়ায় পথ চলতে বা কাজের আঞ্জাম দিতে গিয়ে যদি তার দ্বারা কোনো ভুল হয়ে যায়, তবে সে ক্ষমা স্বীকার করে নিতে পছন্দ করে। ভুল করেও আত্মহংকারি হয়ে ওঠা তার স্বভাব নয়। সে অনেক গভীরে অধ্যয়ন করে, চিন্তাশীল এবং সময়সাপেক্ষ পর্যবেক্ষণ করে। সে বিষয়ের গভীরে প্রবেশ করে এবং তারপর অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছায়।
সে জ্ঞানার্জনের জন্য সব ধরণের তথ্যসূত্র বা উৎসকে ব্যবহার করে। সে বই থেকে জ্ঞান আহরণ করে থাকে, সে বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেও জ্ঞান অন্বেষণ করে, বুজুর্গদের সংস্পর্শে থেকেও জ্ঞানের খোঁজ করতে থাকে। এসআইও’র সদস্যরা মনে করে জ্ঞানের প্রত্যেকটা উৎস গুরুত্বপূর্ণ। তাই জ্ঞানের সকল শাখা-প্রশাখায় বিচরণ করে। সংগঠনের সঙ্গে জুড়ে থাকার সময় সে সর্বদা তৈরি থাকে। আল্লাহ আর রাসূলের (সাঃ) আলোচনা উৎসুকতা নিয়ে শোনে, আরবি ভাষা না জানার জন্য সে হৃদয়ে কষ্ট অনুভব করে। তার মনে আকুলতা সৃষ্টি হয় যে, আরবি জানা উচিত, যাতে সে কুরআন ও হাদিসকে আসল ভাষায় বুঝতে পারে। আল্লাহ তায়ালার পবিত্র কালামকে সরাসরি শোনার ও বোঝার চেষ্টা করতে পারে। এ জন্য সে পরিশ্রম করে, চেষ্টা সাধনা করে।
আপনি দেখবেন, সে অর্থহীন আলাপ আলোচনা থেকে বিরত থাকে। যেসব কাজে সময় নষ্ট হয়, যেগুলো অর্থহীন — সেসব থেকে সর্বদা বিরত থাকে। তাকে কখনো দীর্ঘ সময় ধরে ক্রিকেট ম্যাচ দেখতে বা ফিল্ম দেখতে, চায়ের আড্ডায় ভবঘুরের মতো পাবেন না, অশ্লীলতা করতে দেখবেন না। সে বিভিন্ন দিক থেকে ২০-২৫টা সেলফি তুলে ফেসবুকে আপলোড দেয় না বা হোয়াটসঅ্যাপে লঘু বা জঘন্য কৌতুক ফরোয়ার্ড করে না। এগুলো হারাম না হালাল, সে বিতর্ক তার কাছে অনর্থক। আসল কথা, এসব কাজে সময় অপচয় করা তার কাছে বোকামি। সে সমস্ত জিনিসকে সৃজনশীলভাবে এবং দ্বা’য়ীআনা পদ্ধতিতে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে।
সে ভাবতে থাকে, আল্লাহতায়ালা আমাকে দিনে ২৪ ঘণ্টা দিয়েছেন। এই ২৪ ঘণ্টার দিন ইমাম আবু হানিফা (রহঃ) পেয়েছিলেন, ইমাম মউদূদি (রহঃ)-ও পেয়েছিলেন, ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহঃ)-ও পেয়েছিলেন এবং এই ২৪ ঘণ্টার সদ্ব্যবহার করে সর্বোচ্চ মাকামে পৌঁছেছিলেন, আর আমাকে কোথায় পৌঁছাতে হবে। এই ২৪ ঘণ্টায় তাকে জান্নাত অর্জন করতে হবে। এত সময় কোথায় যে, আমি ফেসবুক ও হোয়াটস্যাপের নিকৃষ্ট ব্যবহার করে টাইম পাস করব। সে সময়কে সদ্ব্যবহার করার বিষয়ে সতর্ক থাকে, সময়কে সঠিক ভাবে নিয়ন্ত্রণ করে। তার একটা প্যাশন থাকে, একটা জিদ থাকে, একটা আবেগ থাকে। আর এই জিদ হল জান্নাত অর্জন করা, আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করা। সে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও ঢিলাঢালা পোশাক পরে। সে কখনই অর্থহীন ফ্যাশনের ভক্ত নয়। ঐসব ফ্যাশন, যেমন- ফাটা জিন্স প্যান্ট, টাইট পোশাক ইত্যাদি। আপনি অনুভব করবেন, সে জামাআতের সঙ্গে নামায আদায়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। তার নামাযের মধ্যে নম্রতা ও বিনয় থাকে। মসজিদের সঙ্গে গভীর ভালবাসা থাকে। সে শুধু ফরজ নামায আদায় করে না; বরং নফল নামায এবং জিকর-আজকারেও মনোনিবেশ করে।
আপনি যখন তাকে দাওয়াত দেবেন, সে খুশি মনে কবুল করবে। কখনো কখনো আপনাকেও দাওয়াত দেবে। আবার কিছু এমনও মুহূর্ত পাবেন, যখন আপনি তাকে খাওয়ার দাওয়াত দিলে, সে এড়িয়ে যাবে। আপনি যখন আগ্রহের সঙ্গে জানতে চাইবেন, সে বলবে “আমি আজ নফল রোযায় আছি। তার ব্যক্তিগত জীবন ত্যাগ-তিতিক্ষা দিয়ে রচিত। যখন কর্মের ময়দানে ডাকা হয়, কুরবানির জন্য আওয়াজ দেয়া হয়, সে অন্যদের চেহারা দেখে না কে এগিয়ে এল, আর কে এল না। বরং সে নিজেই এগিয়ে যায়। সে ভাল কাজে প্রতিযোগিতার উদাহরণ পেশ এক সৃজনশীল ও নৈতিক প্রতিযোগিতা। যেমনটা দেখা গিয়েছিল হযরত আবু বকর (রাঃ), হযরত উমার (রাঃ)-দের মধ্যে।
সে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সব কাজ সম্পন্ন করে। তবে যখন দায়িত্বশীল হওয়ার বিষয় আসে, সেখানে তার মনে হয়, এটা যেন বিদ্যুতের খোলা তার, যা স্পর্শ না হয়ে যায়। এতটাই দায়িত্ব-ভীতি তার মধ্যে পাওয়া যায়। তবে যদি তার ওপর দায়িত্ব অর্পণ হয়, তাহলে সে দায়িত্বের পূর্ণ হক আদায় করার চেষ্টা করে। আল্লাহর উপর ভরসা করে দায়িত্ব গ্রহণ করে নেয়। আত্মশুদ্ধির জন্য ইবাদাত আর নফলকে মাধ্যম হিসেবে গ্রহণ করে। তবে শুধু এটাতেই সে সন্তুষ্ট হয় না। বরং নিজের যোগ্যতাকে চিহ্নিত করে সঠিক রাস্তায় ব্যয় করে, যার মাধ্যমে জান্নাত অর্জনের রাস্তা সহজ হয়। ইসলামী আন্দোলনের প্রয়োজন তার যোগ্যতাকে বিকশিত করে।
সে স্কুল-কলেজ বা অফিস যেখানেই থাকুক, তার পরিচয় হবে সে একজন ভদ্র, যোগ্য এবং ঈমানদার, বিশ্বাসী ব্যক্তিত্ব। মানুষ তাকে দেখে বলে এই ব্যক্তি সৎ, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সোচ্চার। এই ব্যক্তি নির্ভীক, সত্য বলতে ভয় পায় না। সে মানুষের পাশে থাকে। তার পারিপার্শ্বিক ব্যক্তিরা যখন কোনো সাহায্যের প্রয়োজন হয়, পরামর্শের প্রয়োজন হয়, ঋণের প্রয়োজন হয় তখন সে এসআইও’র সদস্যের কাছে পৌঁছায়। কেননা সে জানে, এই ব্যক্তি আমাদের অসহায়ত্বের সুযোগ নেবে না, উপহাস করবে না। এই ব্যক্তি আমাদের সত্যিকার শুভাকাঙ্ক্ষী। এসআইও সেই সদস্য বড়দের সম্মান করে, ছোটদের স্নেহ করে।
সামাজিক সমস্যা নিয়ে চায়ে তুফান তুলে অনেকেই বিতর্ক করে। আড্ডায় বসে চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে শিশুশ্রম নিয়ে তর্ক-বিতর্ক করে, আর তারপর ওই চায়ের দোকানের ছোটুকে বলে, আরও চা নিয়ে আয়। তাদের ধ্যান হয় না যে, এই ছোটুও শিশুশ্রমের শিকার। এসআইও’র একজন সদস্য কোনো সমস্যাকে শুধু সমস্যা হিসেবেই উত্থাপন করে না। সে সমস্যাকে উত্থাপন করে ইসলামী পন্থায় সমাধান করার জন্য। তাই কোনো ছোটু যদি তার চোখে পড়ে, সে ছোটুর সঙ্গে কথা বলে জানতে চায় তার সমস্যা কী, সে পড়াশোনা করে না কেন। সে ছোটুর সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করে। তার পিতা-মাতার সঙ্গে আলোচনা করে এবং তার পড়াশোনার উদ্যোগ নেয়। তাকে সমাজের অপশক্তি দমিয়ে রাখতে পারে না, সে রসম রেওয়াজ বা প্রথার বিরুদ্ধে পাথরের মতো হয়। পণপ্রথা, বরযাত্রী এই ধরণের বিষয়গুলো তার মধ্যে পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। সে এ বিষয়ে ভাবতেই পারে না।
তার মধ্যে দ্বা’য়ীআনা আকুলতা লক্ষ্য করা যায়। শিরক হল এই দুনিয়ার সবথেকে বড় জুলুম। আর এই জুলুম সমাজের সর্বস্তরে হচ্ছে। এই জুলুম থেকে দুনিয়া কীভাবে মুক্ত হবে, এই চিন্তায় সে ব্যাকুল হয়ে থাকে। রুস্তমের দরবারে হযরত রাবে বিন আমীর যে পন্থা গ্রহণ করেছিল, সে-ও সেই পন্থা অবলম্বন করে যে, আমরা আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত এবং মানুষকে মানুষের গোলামী থেকে বের করে আল্লাহর গোলামীতে ফিরিয়ে নিয়ে আসাই আমাদের উদ্দেশ্য। এভাবেই সে দুনিয়াকে আহ্বান করে। মানুষকে শির্কের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে ইসলামের তৌহীদি আলোয় নিয়ে আসাই তার উদ্দেশ্য। দুনিয়া নিয়ে তার চিন্তাভাবনা ইতিবাচক। সে পরিস্থিতি দেখে হতাশ হয় না, বরং তার প্রশ্ন হয় এই পরিস্থিতিতে আমার দায়িত্ব কী?
এই পরিস্থিতিকে পরিবর্তনের প্রচেষ্টার দ্বারা সে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করতে চায়। সে পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণ করে এবং নিজের দায়িত্ব পালনের চেষ্টা করে। একজন সংগঠনের সদস্য শর্টকাট খোঁজে না। একটা বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে নীচে আসার জন্য আপনি সিঁড়ি ব্যবহার না করে ঝাঁপ দিয়ে নীচে নামতে চাইলে ধ্বংস অনিবার্য। শর্টকাট হল আপনি ছাদ থেকে ঝাঁপ দিয়ে দিন। এতে আপনি সব থেকে কম সময়ে নিচের তলায় পৌঁছাতে পারবেন। কিন্তু এই শর্টকাট ধ্বংসাত্মক। এসআইও’র সদস্য শর্টকাটে বিশ্বাসী না; বরং সে পরিশ্রম করে, বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে সমস্ত চেষ্টা করে। শর্টকাট এর চক্করে পড়ে না। সে বুদ্ধির সীমা-পরিসীমা সম্পর্কে অবগত। সে নিজের বুদ্ধিকে আল্লাহর বিধানের কাছে সমর্পিত করে।
সে-ও মানুষ, তাই তারও রাগ হয়, সে-ও আবেগী হয়। সে তার ক্ষোভ ও আবেগকে ইতিবাচকভাবে চ্যানেলিং করে। সর্বাবস্থায় সে তার ইসলামী পরিচয় ধরে রাখে, তাই আপনি মসজিদের প্রথম সারিতে, সমাজে ঘটে যাওয়া যেকোন অন্যায়ের বিরুদ্ধে, প্রতিবাদের মিছিলে প্রথম সারিতে আপনি এসআইও’র সদস্যদের পাবেন। কখনো যদি জীবন উৎসর্গ করতে হয়, সেখানেও এসআইও’র সদস্যকে প্রথম সারিতে পাবেন। মাওলানা মওদূদী (রহঃ) সম্পর্কে বলা হয়, “ইধার তাফহীম-এ দ্বীন কি মজলিশোকে শাম-এ মেহফিল ভি, উধার রাহে আমলকে কাফিলা সালার মওদূদী।” অর্থাৎ একদিকে দ্বীনি মজলিসের উদ্দিপ্ত প্রদীপ, অন্যদিকে ইসলামের কাফিলার প্রধান মওদূদী।
আমাদের প্রত্যেক সদস্যের মধ্যে এই কথাটার ছোট নমুনা বর্তমান থাকে। একজন সদস্য সর্বদা আন্দোলনরত থাকে। তার কখনো ছুটি হয় না। সে কখনও দারসে কুরআন পেশ করছে, কখনও কারো সঙ্গে সাক্ষাৎ করছে, কখনো বৈঠক করছে, কখনো পরিকল্পনা করছে, কখনো সফর করছে। তবে সে ভারসাম্য বজায় রাখতে জানে। তাই সে তার পরিবারের হককে ভুলে যায় না, নিজের পরিবারের প্রতি উদাসীন নয়। সে একজন শ্রেষ্ঠ পুত্র সন্তান, শ্রেষ্ঠ স্বামী, শ্রেষ্ঠ পিতা, শ্রেষ্ঠ প্রতিবেশী, শ্রেষ্ঠ বন্ধু হওয়ার চেষ্টা অনবরত করতে থাকে। তার কথা ও কাজে পার্থক্য হয় না। সব মিলিয়ে এসআইও’র সদস্যের জীবনের একটা উদ্দেশ্য থাকে, তার জীবন উদ্দেশ্যহীন হয় না। তার সব কাজ জীবনের উদ্দেশ্যের সঙ্গে জড়িত থাকে, উদ্দেশ্যপূর্ণ থাকে। তার হৃদয় আল্লাহ আর রাসূল (সাঃ)-এর ভালবাসায় সমৃদ্ধ। সে সৌন্দর্যে ভরপুর একটা স্বপ্ন দেখে। এই সুন্দর স্বপ্ন দেখে সে সুসংগঠিত পন্থায় ইসলামী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করে।
আপনি একজন এসআইও’র সদস্যকে ‘সত্যের জিহাদি’ বা সূরা আসরের ভাষায় “যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে এবং পরস্পরকে সত্য ও ধৈর্য ধারণের উপদেশ দেয়” — এভাবে সংক্ষেপে বর্ণনা করতে পারেন। সে তার সফলতায় আল্লাহ তায়ালার কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে। সে তাওবাহ ও ইস্তেগফার করে প্রশান্তি লাভ করে। আর এভাবেই জান্নাতের প্রশস্ত পথে চলতে থাকে। হতাশ হয় না; বরং অনবরত নিজের উন্নতি সাধন করতেই থাকে। কবি বলেন, “ও দর্দ কে চিরাগ জ্বালাও কে আপনে বাদ, ইন বাস্তিআঁ মে ফিরনা কাভি রাত হো সাকে।” অর্থাৎ, নিজের মধ্যে মানব প্রেম ও সহানুভূতির প্রদীপ জ্বালাও, যে প্রদীপ জ্বালাতে জ্বালাতে আমরা শহীদ হব, তবে এটা নিশ্চিত করে যাব, এখানে আর কোনদিন অন্ধকার আসবে না।”








