আরবের নারী-নক্ষত্র কবি খানসা বিনতে আমর (রা.)
ড. সাজেদা হোমায়রা
মরুভূমির বালুকাবেলায় যেমন জ্বলে ওঠে তপ্ত সূর্যের আলো, তেমনি আরব সাহিত্য আকাশে দীপ্তি ছড়িয়েছিলেন এক নারী কবি খানসা বিনতে আমর (রা.)। তাঁর কবিতায় শব্দ আর অনুভূতির মিশ্রণে জন্ম নিয়েছিল সৌন্দর্যের এক চিরন্তন শিল্পরূপ।
চপল, বুদ্ধিমতী ও মন কাড়া চেহারার এক নারী খানসা। আরবি ‘খানসা’ শব্দের অর্থ হরিণী। অনিন্দ্য রূপ ও প্রাণবন্ত স্বভাবের জন্যই তাঁকে এই নামে ডাকা হতো। ইসলামের ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাবশালী মহিলা কবি। যিনি তাঁর সময়ের বহু পুরুষ কবিকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন।
বাশশার ইবনে বুরদ আব্বাসি যুগের একজন শ্রেষ্ঠ আরব কবি। তিনি এক সভায় মন্তব্য করেন, ‘যখন আমি কোনো মহিলা কবির রচিত কবিতা পড়ি, তখন তাদের প্রত্যেকের কবিতায় কোনো না কোনো ভুল ও দুর্বলতা আমার চোখে পড়ে। তবে আল খানসার রচিত কবিতা এর ব্যতিক্রম। তাঁর মর্যাদা তো পুরুষ কবিদেরও উপরে।’
মক্কার আকাশে যখন রিসালাতের সূর্য উদিত হয় এবং তার আলোয় সারাবিশ্ব আলোকিত হয়ে ওঠে, তখন খানসার হৃদয়ও সে আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে ওঠে। তিনি নিজ গোত্রের কিছু লোকের সাথে মদীনায় নবীজির কাছে ছুটে যান এবং ইসলাম গ্রহণ করেন।
এ সাক্ষাতে তিনি নবীজিকে দীর্ঘক্ষণ তাঁর স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনান। নবীজি তাঁর ভাষার শুদ্ধতা, উচ্চারণের মাধুর্য ও অনুভূতির গভীরতায় ফুটে ওঠা শিল্পরূপ দেখে বিষ্ময় প্রকাশ করেন।
খানসার কাব্য প্রতিভায় তিনি প্রচণ্ড মুগ্ধ হন এবং তাঁর দিকে ইঙ্গিত করে বলেন—‘তোমাকে অভিনন্দন! হে খানসা!’
ইসলাম গ্রহণের পর তিনি তাঁর কাব্যপ্রতিভা ইসলামের সেবায় নিয়োজিত করেন। চিন্তা ও বিশ্বাসে পরিণত হন একজন খাঁটি মুসলিমে। ইসলাম নিয়ে যেসব জাহেলি কবি ব্যঙ্গাত্মক কবিতা রচনা করতো, তিনি কবিতা দিয়েই সেগুলোর জবাব দিতেন।
খানসা (রা.) ছিলেন এক অসাধারণ প্রতিভাবান কবি। শোকগাথা রচনার জন্য বিখ্যাত হলেও, আরবি কবিতার প্রায় সব ক্যাটাগরিতেই ছিল তাঁর স্বচ্ছন্দ বিচরণ। তৎকালীন আরব সভ্যতার প্রতিটি উপাদান— মরুপ্রান্তরের নিস্তব্ধতা, ঝড়-বৃষ্টি, উটের পদচারণা কিংবা পাহাড়-পর্বতের দৃষ্টিনন্দন ক্যানভাস সবকিছুই তাঁর কবিতার পংক্তিতে জীবন্ত হয়ে উঠতো।
খানসার কাব্য প্রতিভা বিকশিত হয় তার দুই ভাই সাখর ও মুয়াবিয়ার মৃত্যুর পর শোকগাথা রচনার মাধ্যমে। ভাইদের তিনি অত্যন্ত ভালোবাসতেন। ভাইদের স্মরণে রচিত শোকগাথায় তিনি এমন সব অন্তর গলানো শব্দে নিজের তীব্র ব্যথার কথা হৃদয়গ্রাহী ভাষায় ব্যক্ত করেছিলেন যে, তা শুনে সবার চোখ দিয়েই অশ্রু গড়িয়ে পড়তো।
আরবী কাব্যগ্রন্থের পন্ডিতদের মতে, খানসার পূর্বে ও পরে তার এমন কোন মহিলা কবির জন্ম হয়নি, যার কবিতা খানসা (রা.)’র কবিতার চেয়ে অধিক জ্ঞানে পরিপূর্ণ ছিল। রাসূলুল্লাহ (সা.) কবি খানসার কবিতা খুব পছন্দ করতেন এবং তিনি তাঁর কবিতা তিনি আবৃত্তিও করতেন।
১৮৮৮ সালে বৈরুত থেকে খানসার কবিতার একটি বৃহৎ সংকলন প্রকাশিত হয়। এতে আরও ৬০ জন আরব মহিলা কবির মরসিয়া কাব্য (শোকগাথা) অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ১৮৮৯ সালে এর ফরাসী অনুবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
হযরত খানসা (রা.) যিনি কলমে জ্বালিয়েছেন বিশ্বাসের আলো, শোককে রূপ দিয়েছেন শক্তিতে। আরব সাহিত্যের ইতিহাসে এক জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি। তাঁর বীরত্বগাথা হোক আজকের প্রজন্মের নারীদের অনুপ্রেরণার উৎস!








