চাষি-পুত্র থেকে কথাশিল্পী আব্দুল মান্নান
বিশেষ প্রতিবেদন
নতুন পয়গাম: হুগলী জেলার ধনিয়াখালী থানার প্রত্যন্ত গ্রাম পশ্চিম গোপীনাথপুরে ১৯৫৮ সালের ২ নভেম্বর সেখ আব্দুল মান্নান এর জন্ম। পিতা সেখ কালো মোল্লা ও মাতা নূহুরা খাতুন। হতদরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান ইতিমধ্যেই কথাশিল্পী হিসেবে সুপরিচিত। যদিও তাঁর সাহিত্য প্রতিভার প্রকাশ কবিতার মধ্য দিয়ে। ক্লাস এইটে তাঁর প্রথম কবিতা ছাপা অক্ষরে প্রকাশ পায় ব্লক-স্কুল পরিদর্শক পরিচালিত ম্যাগাজিনে। কিন্তু অভাবী সংসারে কৃষিকাজে পিতাকে সাহায্য করতে গিয়ে স্নাতক পর্যন্ত আর সাহিত্য চর্চা করতে পারেননি।
তাঁর লেখালেখির প্রকৃত স্ফূরণ ঘটে আন্দামানে। কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে প্রথম পোস্টিং আন্দামানের পোর্টব্লেয়ারে। এখানে ১৯৮৪ থেকে ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত থাকাকালে তিনি গল্প লেখায় নিজেকে পারদর্শী করে তোলেন। ওই সময়ে তাঁর লেখা বেশ কয়েকটি গল্প আকাশবাণী পোর্টব্লেয়ার থেকে সম্প্রচারিত হয়। আন্দামানের নানা পত্রিকাতেও তাঁর গল্প প্রকাশ পায়। বিশেষ করে সেই সময়ের একমাত্র সাপ্তাহিক বাংলা সংবাদপত্র ‘দ্বীপবাণী’ এবং পোর্টব্লেয়ারের ঐতিহ্যপূর্ণ বেঙ্গলি ক্লাব ‘অতুল স্মৃতি পাঠাগার’-এর মুখপত্রে তাঁর লেখা প্রকাশিত হত। আকাশবাণী পোর্টব্লেয়ারে কয়েকটি বেতার নাটকে তিনি অভিনয় করেন। সেখানকার মুখ্যভূমির বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় লেখালিখিও করতেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হুগলী জেলার ধনিয়াখালী থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক ‘হুগলী কথা’ এবং কলকাতার সল্টলেক থেকে প্রকাশিত ‘অদল বদল’ পত্রিকা।
১৯৮৭ সালের সেপ্টেম্বরে অসমের গুয়াহাটিতে বদলি হয়ে গেলে তিনি উত্তর পূর্বাঞ্চলের বৃহৎ সাহিত্য অঙ্গনের সাথে পরিচিত হন। গুয়াহাটিতে দীর্ঘ কুড়ি বছর চাকরির সুবাদে ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার উল্লেখযোগ্য গল্পকার হয়ে ওঠেন। গুয়াহাটির ‘দৈনিক সময় প্রবাহ’ এবং ‘দৈনিক যুগশঙ্খ’ পত্রিকার সাহিত্য বিভাগে নিয়মিত লিখতেন। যুগশঙ্খের সাহিত্যপাতা ‘রবিবারের বৈঠক’-এ ‘গল্প দাদুর আসর’ বিভাগে ধারাবাহিক গল্প লিখতেন। ক্রমে তিনি ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় গল্প আন্দোলনের শরিক হয়ে ওঠেন। গুয়াহাটিতেই ২০০৫ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মেঘমুক্তি’। তিনি গুয়াহাটি তথা উত্তর-পূর্বাঞ্চলের একাধিক সাহিত্য পত্রিকায় গল্প লিখতেন। যার মধ্যে ‘পৃথিবী’, ’মাজুলি’,’অঙ্কুর’,’বনফুল’,’কলাক্ষেত্র’,‘পইঠা’,‘সংলাপ’ ও ‘অন্যদেশ’ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
২০০৮ সালে গুয়াহাটি থেকে বদলি হয়ে চলে আসেন কলকাতায়। বঙ্গ ভূমের ছোঁয়ায় তাঁর সাহিত্য আরও পরিপুষ্ট হয়। যুক্ত হন বিভিন্ন সাহিত্য সংগঠনের সাথে। রাজ্যের দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্র-পত্রিকায় নিয়মিত লিখতে থাকেন। আজও নিরলস লিখে চলেছেন গল্প, কবিতা, প্রবন্ধ, নিবন্ধ ‘পুবের কলম’, ‘যুগশঙ্খ’, ‘সুখবর’, ‘নতুন গতি’, ‘আপনজন’, নিউজ পোর্টাল ‘বাংলার জনরব’ ও দৈনিক ‘নতুন পয়গাম’ পত্রিকায়। কলকাতা কেন্দ্রিক সাহিত্য পত্রিকা বার্ষিক ঈদ সঙ্কলন ‘প্রগতি’, ‘বাংলার জনরব’, ‘সাহিত্য সমন্বয়’র সহ-সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও প্রতিবেশি রাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সাহিত্য সম্মান পেয়েছেন। কলকাতা থেকে ‘একুশের ভাবনা’ সাহিত্য সংস্থা তাঁকে ‘জীবনকৃতি সাহিত্য সম্মাননা-২০১৯’ দেয়। তাঁর জীবনের দুর্লভ ওই সম্মাননা উপলক্ষে প্রকাশিত হয় একটি গ্রন্থ। যেটি আন্দামান, অসম, পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশের শতাধিক সাহিত্যিক, সম্পাদক, অধ্যাপক এবং বিশিষ্ট জনের লেখায় সমৃদ্ধ।
উল্লেখ্য, তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘মেঘমুক্তি’র শুভেচ্ছা বার্তা লিখেছিলেন প্রথিতযশা সাহিত্যিক সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ। পরবর্তীতে আরও দুটি গল্পগ্রন্থ ‘সময়ের সংলাপ’ এবং ‘শালুকে সাপের ফণা’ প্রকাশিত হয়। এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে তিনটি কাব্যগ্রন্থ ‘মন মুসাফির’, ‘অনুভবের অঞ্জলি’ ও ‘মনের পাতায় টুকরো কথা’। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে তাঁর জীবন কাহিনিমূলক প্রথম উপন্যাস ‘জীবন খাতার পাতায় পাতায়’।








