মসজিদ, মাদ্রাসা, গোরস্থান: ১-নং খতিয়ান প্রসঙ্গে কিছু কথা
তায়েদুল ইসলাম
কয়েকদিন থেকেই সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিষয়টি বেশ প্রচার হচ্ছে। মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান সরকার দখল করে নিচ্ছে। নতুন সংশোধিত ওয়াকফ আইন-২০২৫ রাজ্যে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই বিষয়ে কোন কিছু সামাজিক মাধ্যমে লিখলে বা কারও লেখা শেয়ার করলে সাইবার ক্রাইম পুলিশ থানার পক্ষ থেকে কাউকে ফোন করে এ কাজ করতে নিষেধ করছে। কাউকে ডেকে পোস্ট ডিলিট করতে বলছে। কারও বিরুদ্ধে এফআইআর করে নোটিশ পাঠাচ্ছে। মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর থানা তার বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছে বলে জানিয়েছেন মানিক ফকির। পুলিশ নিজেও তাদের নিজস্ব পেজ থেকে প্রচার করছে, এ সব গুজব বলে।
পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সরকারের একটি দপ্তরের নাম ভূমি ও ভূমি রাজস্ব দপ্তর। এই দপ্তরের একটি নিজস্ব ওয়েবসাইট আছে। তার নাম ‘বাংলার ভূমি’। অর্থাৎ ‘বাংলার ভূমি’ হল রাজ্য সরকারের নিজস্ব অ্যাপ। এই অ্যাপ থেকেই জানা যাচ্ছে যে কোন মৌজার বা ব্লকের বা জেলার ১-নং খতিয়ানে থাকা জমির সম্পর্কে বিস্তারিত বিবরণ। দাগ-খতিয়ান নং, জমির পরিমাণ, জমির মালিকের নাম এবং প্রকৃতি। ১-নং খতিয়ানে অনেক রকমের জমি থাকতে পারে। যেমন মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, মন্দির, দরগাহ, রাস্তা, পুকুর, খাল-বিল, বাড়ি, অফিস ইত্যাদি।
১-নং খতিয়ান মানে হল, সেই জমির মালিক সরকার। জেলায় সরকারের পক্ষে জেলা শাসক। এই জমি সরকার যে কোন সময় যে কোন কাজে অধিগ্রহণ বা ব্যবহার করতে পারে। এই জমি যদি মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান, মন্দির ইত্যাদি হয় তাহলে যে কোন সময় অধিগ্রহণ করতে পারে। বিক্রি করতে পারে।
খতিয়ান নং পরিবর্তন মানে হল জমির মালিকানা পরিবর্তন। খতিয়ান নং অর্থাৎ মালিকানা পরিবর্তন করতে হলে স্থানীয় বিএলও নোটিশ দিয়ে উভয় পক্ষকে ডাকবেন এবং উভয়ের কথা, কাগজপত্র দেখে পরীক্ষা করে সিদ্ধান্ত নেবেন। ১-নং খতিয়ানে আনার বিষয় হলে এক পক্ষ হয় পাবলিক বা কোন সংস্থা এবং অন্য পক্ষ হয় সরকারের পক্ষে বিএলআরও। মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান-এর ক্ষেত্রে এক পক্ষ হয় মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান কমিটি। আর এসব ওয়াকফ সম্পত্তি হলে ওয়াকফ বোর্ডের পক্ষে মুতাওয়াল্লি কমিটি।
‘বাংলার ভূমি’ অ্যাপে ১-নং খতিয়ানে অনেক মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান আছে। কয়েকটি কমিটির লোকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বিষয়ে তাঁরা কিছুই জানেন না। অর্থাৎ এ কাজটি করা হয়েছে গোপনে বা বেআইনি ভাবে। ‘বাংলার ভূমি’ যেহেতু সরকারি অ্যাপ, সেহেতু এই গোপন বা বেআইনি কাজটি সরকার নিজেই করেছে। যতদূর জানা গেছে, বিশেষ করে কবরস্থানের খতিয়ান নং পরিবর্তন করে ১-নং খতিয়ান করার কাজ শুরু করেছিল সিপিআইএম তাদের শাসনামলের শেষ দিকে। বর্তমানে যে সমস্ত মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানের খতিয়ান নং-১, তাদের খতিয়ান নং পূর্বে কত ছিল এবং কত দিন আগে তা পরিবর্তন করা হয়েছে, তা জানা গেলে বোঝা যাবে, বাম আমলে কত মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানের খতিয়ান পরিবর্তন করে
১-নং করা হয়েছে। তৃণমূল আমলে কত হয়েছে এবং নতুন আইন চালু হওয়ার পর কত মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানের খতিয়ান পরিবর্তন করে ১-নং খতিয়ান করা হয়েছে। অনেকেই বলছেন, যদি নতুন আইন চালু হওয়ার পর ১-নং খতিয়ান করা হয়, তা হলে বুঝতে হবে, সরকার নতুন আইন অনুযায়ী মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান কেড়ে নিচ্ছে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কীভাবে জানা যাবে, কখন কোন আইনে মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান ইত্যাদি ১-নং খতিয়ান করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলো দলিল, রেকর্ড থেকে জানতে পারবেন আগের খতিয়ান নং কত ছিল। কিন্তু কতদিন আগে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা জানতে পারবেন না। ‘বাংলার ভূমি’ অ্যাপ থেকেও জানা যাচ্ছে না। কারণ, ১-নং খতিয়ান-ভুক্ত মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থানের দাগ নং ধরে আরএস রেকর্ড দেখতে চাইলে ‘বাংলার ভূমি’ দেখাচ্ছে ‘নট ফাউন্ড’। তার মানে এই দাঁড়ায় যে, ১-নং খতিয়ান-ভুক্ত জমির আরএস তথ্য সরকার লুকিয়ে রেখেছে বা গোপন করে রাখছে। এখান থেকেই মানুষ আতঙ্কিত হচ্ছেন যে, সরকার নতুন আইন অনুযায়ী মসজিদ, মাদ্রাসা, কবরস্থান কেড়ে নেওয়ার কাজ শুরু করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী যাই বলুন, আমাদের রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় রাজ্য সরকার ইউনিয়ন বা কেন্দ্র সরকারের আইন বাস্তবায়ন করতে বাধ্য। বড়জোর কিছু দিন দেরি করতে পারে। টালবাহানা করতে পারে। ‘করব না, করব না’ বলে বিরোধিতা বিরোধিতা খেলা করতে পারে। কিন্তু দিনের শেষে বাস্তবায়ন করে। ওয়াকফ আইন বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও তা-ই হবে। রাজ্যে ইউনিয়ন সরকারের পোর্টাল চালু আছে। আগামী বিধানসভা নির্বাচনের পর হয়ত তা বাস্তবায়নের কাজ শুরু করা হবে। জেলা শাসকদের মাধ্যমেই তা করবে। জেলা শাসকরা প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজ সেরে রাখছেন। সেই প্রাথমিক প্রস্তুতির কাজটাই হল ছোটখাট ত্রুটিপূর্ণ সম্পত্তিগুলোকে কাগজে-কলমে অধিগ্রহণ করে রাখা। এরপর সময় সুযোগ ও প্রয়োজন অনুযায়ী কেড়ে নেবে। রাজ্য সরকারের পক্ষে সাফাই গাওয়া কেউ কেউ বলার চেষ্টা করছেন, নতুন ওয়াকফ আইন তৈরি হওয়ার পর কোন ওয়াকফ সম্পত্তির খতিয়ান নং পরিবর্তন করা হয়নি। যা হয়েছে তা অনেক আগেই হয়েছে। অতএব এখানে রাজ্য সরকারের কোন ভূমিকা নেই। এখন কথা হচ্ছে, যে আমলেই হোক, ওয়াকফ সম্পত্তিকে ১-নং খতিয়ানে নিয়ে আসাটাই তো বেআইনি। তাই সবার আগে সেটার সংশোধন করতে হবে। সেটা বর্তমান রাজ্য সরকারেরই দায়িত্ব। কিন্তু সরকার সেটা করছে না। বরং কেন্দ্র সরকারকে আগ বাড়িয়ে সাহায্য করছে। গত দু-তিন মাসের মধ্যে ১-নং খতিয়ানের সংখ্যা বেড়ে যাওয়া এবং রাজ্য সরকারের নিজস্ব ওয়েবসাইটে আরএস রেকর্ড সংক্রান্ত তথ্য ‘নট ফাউন্ড’ করে রাখাই তার প্রমাণ।








