নামেই তালপুকুর, ঘটি ডোবে না রুগ্ন কোষাগার পুষ্ট করতে রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি বিক্রি
নতুন পয়গাম, নয়াদিল্লি, ১৯ সেপ্টেম্বর:
শিল্প এবং উৎপাদন ক্ষেত্র কার্যত শুয়ে পড়েছে, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধি আকাশছোঁয়া। সব মিলিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের রাজকোষ নামেই তালপুকুর, আদতে ঘটি ডোবে না। তাহলে উপায় কী? সবথেকে সহজ উপায় হল সরকারি বা রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পত্তি বিক্রি। অনেকদিন ধরেই অবশ্য এই বিক্রিবাটা চলছে। কিন্তু সব ক্ষেত্রেই অভিযোগ উঠেছে, বহুমূল্যবান রাষ্ট্রায়ত্ত সম্পদ ও সংস্থা জলের দরে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। এও দেখা যাচ্ছে, বিলগ্নিকরণ বা বিক্রির যে টার্গেট গত কয়েক বছর ধরে কেন্দ্র সরকার নিয়ে চলেছে, তার ধারেকাছেও পৌঁছনো যাচ্ছে না।
চলতি বাজেটে টার্গেট ছিল, রুগ্ন সংস্থা বা অলাভজনক সম্পত্তি বিক্রি করে ৫০ হাজার কোটি টাকা রোজগার করা। কিন্তু বছর শেষে দেখা যায় ডিসেম্বর-২০২৪ পর্যন্ত আয় হয়েছে মাত্র ৮৬২৪ কোটি। তাই এবার লক্ষ্য পূরণে লাভজনক সম্পত্তি বিক্রির পথে এগোচ্ছে কেন্দ্র। এই ‘উদ্যোগে’ প্রতি বছরের নতুন টার্গেট ২ লক্ষ কোটি টাকা। এভাবে কোষাগার ভরাতে বা আর্থিক ঘাটতি মেটাতে একে একে সব সরকারি সম্পদ-সম্পত্তি বিক্রির সিদ্ধান্ত নেওয়ায় কেন্দ্র সরকারকে তুলোধনা করছে কংগ্রেস-সহ বিরোধীরা। তাদের বক্তব্য, এভাবে সবকিছু বিক্রি করে দিয়ে আত্মনির্ভরশীল ভারত কীভাবে বানাবেন নরেন্দ্র মোদি। দেশ তো সর্বস্ব খুইয়ে আরো কপর্দকশূন্য হয়ে যাবে, আরো পরনির্ভরশীল হয়ে যাবে।
স্বাধীনতার পর নতুন ভারতের নির্মাণপর্বে অসংখ্য সরকারি সংস্থা এবং প্রতিষ্ঠান গঠন করে দেশকে স্বাবলম্বী হওয়ার পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন জওহরলাল নেহরু, লালবাহাদুর শাস্ত্রী, ইন্দিরা গান্ধীরা। সেই সময়ই হয়েছিল বিপুল কর্মসংস্থান এবং শিল্পকাঠামো নির্মাণ। পাশাপাশি অর্থনীতির মধ্যে প্রবেশ করেছিল সরকারের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণও। সেই ফাঁস বেশ কিছুটা শিথিল করেছিলেন নরসিমা রাও সরকার। কিন্তু উদারীকরণের হাওয়া আনলেও সরকারি সংস্থা ও সম্পদের কার্যকারিতা তাঁরা উপেক্ষা করেননি। অটলবিহারী বাজপেয়ির নেতৃত্বে প্রথমবার বিজেপি কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন হয়ে অভিনব এক মন্ত্রকের জন্ম দেন, যার নাম বিলগ্নিকরণ মন্ত্রক। অর্থাৎ একটা আস্ত মন্ত্রকের কাজই হল শুধুমাত্র সরকারি সংস্থা বিক্রি করা। বাজপেয়ির আমলে যা ছিল কৌশলগত বেসরকারিকরণ, মোদি সরকারের কাছে সেটাই আয়ের সহজতম পন্থা। সেখানেও সঙ্গী ব্যর্থতা।
সরকারি সংস্থা ও ব্যাঙ্ক অথবা বিমা কোম্পানি বিক্রি হচ্ছে না। তাহলে রাজকোষ ভরানোর উপায় বলতে কেন্দ্রীয় সংস্থার কাছে থাকা সরকারি জমি, বাড়ি, সম্পত্তি বিক্রি কিংবা ব্যবসায়িক কাজে লিজ দেওয়া। এই লক্ষ্যেই ঘোষণা হয়েছিল ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইন। করোনাকালে টার্গেট ছিল ৫ বছরের মধ্যে ৬ লক্ষ কোটি টাকা আয়ের। কিন্তু ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকারি সম্পত্তি বিক্রি করে আয় হয়েছে ৩ লক্ষ ৮৫ হাজার কোটি টাকা। আগামী মার্চ মাসে প্রথম দফার মনিটাইজেশন প্রকল্প সমাপ্ত হচ্ছে। এবার আরও উচ্চাশা নিয়ে নামতে চলেছে মোদি সরকার। প্রতি বছর ২ লক্ষ কোটি টাকা করে আয়ের টার্গেট। সেই লক্ষ্য পূরণেই আসতে চলেছে এনএমপি-টু। ন্যাশনাল মনিটাইজেশন পাইপলাইনের দ্বিতীয় পর্ব। কিন্তু কেন এহেন আগ্রাসী উদ্যোগ? দাবি সত্ত্বেও জিডিপি ৭ শতাংশ, ৮ শতাংশ পার হয়নি। রপ্তানি তলানিতে। টাকার মূল্যের পতন এতটাই যে, ডলার বিনিময়ের নিয়ন্ত্রণ শিথিল করেছে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। অতএব ভরসা মনিটাইজেশন। অর্থাৎ সরকারি সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানগুলির স্থাবর সম্পত্তি বিক্রি বা লিজ। যেমন রেল, এয়ারপোর্ট, বন্দর, টেলিকমের সম্পদ অগাধ। সেইসব সম্পত্তি বিক্রি কিংবা ব্যবহারই এখন মোদি-শাহদের পাখির চোখ। উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত সম্পত্তি বিক্রি করে জমিদারির ঠাঁটবাঁট চালানোর প্রথা অবশ্য বহু প্রাচীন।








