৯৫ বছরেও নিত্য রোগী দেখেন ডা. নারায়ণ চন্দ্র মান্না
ডা. সেখ নূর মহম্মদ
নতুন পয়গাম:
হাওড়া জেলার উলুবেড়িয়ার ভূমিপুত্র ডাক্তার নারায়ণ চন্দ্র মান্না, এম ডি (ক্যাল), জন্ম ১৩৩৭ সন ১৭ই চৈত্র বুধবার, বয়স প্রায় ৯৫ বছর। এই বয়সে এখনও নিয়মিত রোগী দেখে চলেছেন রোজ দু’বেলা। ন্যাশনাল হাইওয়ের নিমদীঘি মোড়ে ইএসআই হাসপাতাল ও নতুন ভাবে তৈরি হওয়া শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সরকারি মেডিকেল কলেজ অ্যান্ড হসপিটালের একদম পাশে পানপুর মোড়ে ডাক্তারখানা। তাঁর চেম্বার বন্ধ থাকে সপ্তাহে একদিন, কেবলমাত্র শুক্রবার। তাঁকে বলা যায় উলুবেড়িয়া, পূর্ব মেদিনীপুর ও হুগলীর খানাকুল থানার ‘বিধান রায়’। ১৯৫০ সালে উলুবেড়িয়া হাই স্কুল থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। তারপর ১৯৫৩ সালে কলকাতার সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ থেকে আইএসসি, ১৯৫৮ সালে কলকাতা মেডিকেল কলেজ থেকে এমবিবিএস পাশ করেন এবং এসএসকেএম হাসপাতাল থেকে এমডি করেন। চিকিৎসক হিসেবে কর্মরত ছিলেন উলুবেড়িয়া হাসপাতাল, বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ, আরজি কর, এনআরএস এবং পিজি হাসপাতালে।
এই বয়সেও ডাক্তারির ‘ক্লিনিক্যাল আই’ এখনও ধারালো ও মসৃণ। ডা. নারায়ণ চন্দ্র মান্না অযথা ল্যাবরেটরি-নির্ভর চিকিৎসক নন, প্রয়োজন ছাড়া রোগীকে ইনভেস্টিগেশন বা টেস্ট করতে বলেন না। জানা যায়, নিত্যদিন সকাল থেকে রাত ন’টা পর্যন্ত দূর-দুরান্ত থেকে আগত রোগীদের চিকিৎসা পরিষেবা দেন তিনি। ৮-১০ জন রোগীকে একসঙ্গে চেম্বারে ডেকে নিয়ে তাদের প্রবেশের ধরন, দাঁড়ানো, কথা বলার ভঙ্গি, কষ্টের কথা, রোগের কথা মন দিয়ে অবজারভেশন করেন এবং পর পর প্রেসক্রিপশন লিখে সহকারীকে দিয়ে দেন এবং ওষুধ সেবনবিধি বাংলায় লিখে দেন। তিনি রোগীদের কাছে ‘ধন্বন্তরী’ চিকিৎসক। গরীব অসহায় মানুষের পাশে প্রথম জীবন থেকেই ছিলেন, এখনও সেই ধারা অব্যাহত, যা প্রেসক্রিপশনে উল্লেখ করা আছে।
কোন কোন সময় জটিল রোগে দীর্ঘদিন ভুগতে থাকা রোগীর বিভিন্ন ডাক্তার বাবুর প্রেসক্রিপশন, টেস্ট রিপোর্ট, অন্যান্য কাগজপত্র নিজের কাছে রেখে দেন এবং দু-চারদিন পর রোগীকে নিয়ে আসতে বলেন। নিজে রাত জেগে এই বয়সেও রোগীর চিকিৎসাপত্র, রোগ নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করেন। রোগী দেখার কৌশলে ও রোগীর সাথে ব্যক্তিগত গোপনীয়তায়, নিজ গুণেই রোগীর অব্যক্ত-অকথিত কথা জেনে নেন এবং রোগীর আস্থা ও বিশ্বাস অর্জন করেন, যেটা প্রকৃত চিকিৎসকের একটা মস্ত বড় গুণ।
মাত্র কয়েকদিন আগে উলুবেড়িয়ার ‘অবসর’ নাট্য গোষ্ঠীর কর্ণধার চন্দন সাহার কাছে বলি, উলুবেড়িয়ায় ত্রিশ বছরের বেশি এলাম অথচ উলুবেড়িয়ার ‘বিধান রায়ে’র সাথে সাক্ষাৎ করতে পারলাম না! উনি আমার একথা শুনে ডা. মান্নার সহকারী তথা নাট্যকর্মী শান্তনু পণ্ডিতকে দিয়ে স্যারের সঙ্গে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। অবশেষে দেখা হল, অনেক পুরনো দিনের স্মৃতিকথা শুনলাম বর্ষীয়ান ডা. নারায়ণ চন্দ্র মান্নার কাছে। উলুবেড়িয়ার আত্মকথা ও বিভিন্ন হাসপাতালের অভিজ্ঞতা এবং পুরনো দিনের ‘ক্লিনিক্যাল আই’ তৈরিতে কেন বাধ্য হয়েছিলেন, সেসব কথা ও কাহিনি শুনে আপ্লুত হলাম। মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলাম তাঁর বাস্তব অভিজ্ঞতার কথা। ৯৫ বছর বয়স, কিন্তু স্মৃতি শক্তি এখনও কত প্রখর! ধৈর্য্য ও অধ্যবসায় ঈর্ষণীয়! কথা প্রসঙ্গে বলছিলেন, তখন উন্নত প্রযুক্তি বলতে তেমন কিছুই প্রায় ছিল না, তাই নিজের হাত-চোখ ও মস্তিষ্ক দিয়েই চিকিৎসকের কাজ চালাতে হত। চোখ বন্ধ করে রোগীর নাড়ী দেখে, পেটে হাত দিয়ে পরীক্ষা করে, বুকে স্টেথোস্কোপ বসিয়ে রোগের লক্ষণ চিনতে কান তৈরি করতে হত। সবথেকে দরকার রোগীর প্রতি ভালবাসা ও মানবিক ব্যবহার। অযথা রোগীকে ভয় দেখানো নয়, প্যানিকগ্রস্ত না করে পাশে থেকে সাহস দেওয়া চিকিৎসকের মস্ত গুণ।








