ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে হেরিটেজ উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরি
মুহাম্মদ নাসেরউদ্দিন আব্বাসী
এশিয়া মহাদেশের প্রথম এবং ভারতে প্রথম বিনামূল্যে জনসাধারণের জন্য পাঠাগার নির্মাণে ব্রতী হন উত্তরপাড়ার মহারাজ জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়। হুগলি জেলার উত্তরপাড়ায় ১৮৩৮ সালের ২৪ আগস্ট তাঁর জন্ম। পিতা জগমোহন মুখোপাধ্যায়, মাতা রাজেশ্বরী দেবী। শৈশবে স্থানীয় স্তরে পড়াশোনা শুরু হয়। এরপর হিন্দু স্কুল, পরে পিতার কর্মস্থল মিরাটের প্রতিরক্ষা দপ্তরের অফিসে চাকরি জীবনের সূচনা হয়। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ সেনাদলের ভরতপুর আক্রমণের সময় উক্ত দলের সদস্য ছিলেন। ১৮৩৫ সালে সেই চাকরি ছেড়ে উত্তরপাড়া জমিদারির প্রতিষ্ঠা করেন। বিদ্যাসাগরের বিধবা বিবাহ আন্দোলনের সমর্থক ছিলেন। ১৮৫১ সালে উত্তরপাড়া পৌরসভা বিল্ডিং তৈরি করেন। বৃটিশ ইন্ডিয়া অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন।
১৮৬৯ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়কে পাঠাগার প্রতিষ্ঠার জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনুদান দেন।
বেথুন কলেজ প্রতিষ্ঠার জন্য দশ হাজার টাকা দান করেন। তার প্রচেষ্টায় উত্তরপাড়া হাইস্কুল, উত্তরপাড়া কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। স্থানীয় স্তরে প্রায় ৩১টি স্কুল তার অর্থ সাহায্যের দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। অ্যালান হিউম বলেন, ‘জয়কৃষ্ণ বাঙালি রক্ষণশীলদের নেস্টার’।১৮৭৮ সালে বৃটিশদের অবাধ বাণিজ্য নীতির তিনি কট্টর বিরোধী ছিলেন। ১৮৮৬ সালে কলকাতা মহানগরীতে আহুত জাতীয় কংগ্রেসের দ্বিতীয় অধিবেশনে অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি মনোনীত হন। বাংলার কৃষকদের জীবন ব্যবস্থা অবলম্বনে হুগলি কলেজের অধ্যাপক লালবিহারী দে প্রদত্ত ‘History of Bengal Rayal’ গ্রন্থ মুদ্রণের জন্য লেখককে তিনি পুরস্কৃত করেন।
তার অন্যতম সৃষ্টি উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা। ১৮৫৪ সালের আগস্ট মাসে জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় বর্ধমানের বিভাগীয় কমিশনারের কাছে উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরির জন্য পাঁচ হাজার টাকা দান করতে আগ্রহী হন। তার প্রস্তাব বাতিল হয়ে যায়। ১৮৫৬ সালে এক একর জমি ৮৫ হাজার টাকায় ক্রয় করে নিজ উদ্যোগে পাঠাগারের নির্মাণ কাজের সূচনা হয়, সমাপ্ত হয় ১৮৫৯ সালে। বৃটিশ পাবলিক লাইব্রেরি অ্যাক্ট-১৮৫০ দ্বারা নিবন্ধীকরণ হয়। উল্লেখ্য, ১৮৭৭ সালে বরোদায় মহারাজা সায়জি রাও গায়কোয়াড (৩)-এর কারিগরি উদ্যোগে বরোদায় বিনামূল্যে পাঠাগার প্রতিষ্ঠিত হয়। যার প্রধান পরামর্শদাতা ছিলেন শ্রী অরবিন্দ ঘোষ।
১৮৩৬ সালে ক্যালকাটা পাবলিক লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বারকানাথ ঠাকুরের জমিদারদের সংঘের প্রথম সারির সদস্য ছিলেন জয়কৃষ্ণ বাবু। ১৯০৩ সালে বৃটিশ আনুকূল্যে ইম্পেরিয়াল লাইব্রেরি স্থাপিত হয়। প্যারীচাঁদ মিত্র ছিলেন জয়কৃষ্ণ প্রতিষ্ঠিত লাইব্রেরির সমর্থক। বৃটিশ সাহায্য-মুক্ত পাঠাগার নিজ অর্থ ব্যয়ে তৈরি করে জয়কৃষ্ণ বাবু চিনেবাজার-সহ বিভিন্ন এলাকা থেকে বইপত্র সংগ্রহ করেন। তিনি পাঠাগারের রিডিং রুমে পুস্তক পড়ার সাথে টিফিনের প্রচলন করেন।
ঔপন্যাসিক ভুদেব মুখোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর তার ব্যক্তিগত পাঠাগারের সমুদয় পুস্তক জয়কৃষ্ণ বাবু নিজ পাঠাগারে নিয়ে আসেন। এই পাঠাগারে প্রথমে সাত জন কর্মী নিয়োগ হয়, একজন গ্রন্থাগারিক, একজন সহকারি গ্রন্থাগারিক, একজন ক্লার্ক, দু’জন মালি, একজন ঝাড়ুদার, একজন দারোয়ান বহাল হয়। উক্ত লাইব্রেরিতে তিন হাজার পুস্তক নিয়ে শুরু হলেও পরে দুই লক্ষাধিক পুস্তক, শত শত দুষ্প্রাপ্য গেজেটিয়ার, সংবাদপত্র, পত্রিকা ছিল। দাতব্য দেবদত্ত ট্রাস্টের থেকে কিছু পুস্তক ক্রয় করা হয়। মাইকেল মধুসূদন দত্ত প্রায় দুই মাস লাইব্রেরির দ্বিতলে একটি নির্দিষ্ট রুমে বসে পড়াশোনা করতেন। এখনও মাইকেলের ব্যক্তিগত জিনিসপত্র রক্ষিত আছে। দশ হাজার শ্রোতার উপস্থিতিতে শ্রীঅরবিন্দ ঘোষ এই লাইব্রেরিতে ভাষণ দেন, যা ‘উত্তরপাড়া বক্তৃতা’ নামে সুবিদিত।
১৮৫১ সালে কেবল গবেষকদের জন্য এই পাঠাগার উন্মুক্ত ছিল। ১৮৫২ সালের ১৫ এপ্রিল উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরি জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। বর্তমানে এই পাঠাগার ‘জাতীয় হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে। এই পাঠাগার উত্তরপাড়ার ২৬২ নং জিটি রোড ঠিকানায় সগর্বে জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায়ের স্মৃতি বহন করে চলেছে। উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরিতে ইংরেজি, বাংলা ও সংস্কৃত মিলিয়ে ৪৫ হাজার লুকানো পুস্তক, ৬৫ হাজার নতুন পুস্তক, ৪৫টি পান্ডুলিপি, ২৫০০ পুরনো সাময়িকী, ২০ হাজার নতুন সাময়িকী আছে।
অতীত দিনের দিকদর্শন, সংবাদ রসরাজ, সোমপ্রকাশ, তত্ত্ববোধিনী, ক্যালকাটা মান্থলি জার্নাল, বেঙ্গল ক্রনিকল পত্রিকা সংরক্ষিত আছে। দেবনাগরীতে সংস্কৃত ব্যাকরণ, সংস্কৃত বাইবেল, কেমিস্ট্রির ডিকশনারী আছে। উইলিয়াম কেরি, রামমোহন রায়, মার্শম্যান, ওয়ার্ড, গুটেনবার্গ, জেমস লং, হ্যালাড়ের পুস্তক, ম্যাক্স মুলারের চিঠি, ওয়েস্ট মিনিস্টারের রির্পোট, পার্লামেন্টের রির্পোট, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রচারপত্র, নির্দেশাবলী, ঐতিহাসিক প্রমাণাদি এখনও সংরক্ষিত আছে। ভুর্জপত্রে, কদলীপত্রে, হাতে বানানো কাগজে, সংস্কৃত ভাষায় লেখা দুই শতাধিক পান্ডুলিপি সংরক্ষিত আছে।
বারানসী, কাশ্মীর, তিব্বতের বৌদ্ধ মঠ থেকে বহু দুষ্প্রাপ্য মূল্যবান পুস্তক জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরিতে আছে। উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ লাইব্রেরি যাদের পদধূলিতে ধন্য হয়েছে, তাঁরা হলেন বিদ্যাসাগর, কেশবচন্দ্র সেন, বিবেকানন্দ, মধুসূদন দত্ত, শ্রীঅরবিন্দ, অ্যাসলি ইডেন, রেভারেন্ড জেমস লং, স্যার রিভার্স হম্পসন, উইলিয়াম হান্টার, চিত্তরঞ্জন দাশ, বিপিনচন্দ্র পাল, মেরি কারপেন্টার, কানিংহাম, স্যার আর্থার ওয়েলেসলি, স্যার এডুইন আর্থার, স্যার রিভারস থম্পসন, মারকুইস অফ ডাফরিন, আভা ডাফরিন, সুরেন্দ্রনাথ ব্যানার্জী, অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রামেন্দসুন্দর ত্রিবেদী, বিধানচন্দ্র রায়, প্রফুল্লচন্দ্র সেন, রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল-সহ বহু গুণিজন।
১৮৮৮ সালের ১৯ জুলাই মহান সমাজ সংস্কারক, শিক্ষাব্রতী, জমিদার জয়কৃষ্ণ মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হন। তাঁর মৃত্যুর পর ‘উত্তরপাড়া পাবলিক লাইব্রেরি’ নতুন করে ‘উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরি’ নামে পরিচয় লাভ করে। এরপর পাঠাগারটি বিভিন্ন আইনি জটিলতা ও আর্থিক সংকটে বিদ্ধ হয়। ফলে অতি মূল্যবান নথি নষ্ট হয়। বিল্ডিং, দালান সংস্কারের অভাবে বিনষ্ট পথে পাড়ি দেয়। ১৯৫৪ সালে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বিধানচন্দ্র রায় পাঠাগারের ব্যবস্থাপক সমিতির সাথে দীর্ঘ আলোচনা করেন। ১৯৫৮ সালে পাঠাগারটি সরকারি স্বীকৃতি পায়। বছরে ৬৪ হাজার টাকা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বরাদ্দ হয়। ১৯৬৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী প্রফুল্ল চন্দ্র সেনের সমীপে পাঠাগার উন্নয়নের হেতু দরবার করা হয়। ১৯৬৪ সালের ১৫ জুন উত্তরপাড়া জয়কৃষ্ণ পাবলিক লাইব্রেরি সরকারি হস্তে হস্তান্তর করা হয়। ২০০৬ সালে রাষ্ট্রপতি প্রতিভা পাতিল পাঠাগারের দেড়শত বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে যোগদান করেন। দশ লক্ষ টাকা অনুদান দেন তিনি। হুগলি জেলা তথা সারা বাংলা-সহ ভারতে এই পাঠাগার এক অতি পরিচিত ঐতিহ্যবাহী নাম।







