হাসিনার বিরুদ্ধে জবানবন্দিতে যা বলেছিলেন বদরুদ্দীন উমর
নতুন পয়গাম, ঢাকা, ৮ সেপ্টেম্বর:
জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী, লেখক ও ইতিহাসবিদ বদরুদ্দীন উমর। চলতি বছরের ১৪ ফেব্রুয়ারি তিনি তদন্ত কর্মকর্তার কাছে জবানবন্দি দেন এবং তাঁর ভিডিও জবানবন্দিও রেকর্ড করা হয়। এতদিন তার শারীরিক অবস্থার উন্নতির অপেক্ষায় ছিল প্রসিকিউশন। কিন্তু রোববার ৭ সেপ্টেম্বর তিনি প্রয়াত হন। পরদিন ৮ সেপ্টেম্বর বদরুদ্দীন উমরের দেওয়া সেই জবানবন্দির পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য প্রকাশ করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন টিম।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে চলমান মামলায় বদরুদ্দীন উমর ছিলেন দ্বিতীয় সাক্ষী। জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সভাপতি ও বাম ঘরানার প্রবীণ এই রাজনীতিক তার জবানবন্দিতে তুলে ধরেছেন হাসিনার শাসনামল, ক্ষমতা ধরে রাখার কৌশল, বিরোধীদের দমন পীড়ড়, নির্বাচন প্রক্রিয়ায় কারচুপি, মানবাধিকার লঙ্ঘন, অশুভ রাজনৈতিক আঁতাত এবং আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতন সংক্রান্ত নানা পর্যবেক্ষণ। জবানবন্দিতে বদরুদ্দীন উমর বলেছিলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান শুধু বাংলাদেশে নয়, গোটা ভারতীয় উপমহাদেশে এক ব্যতিক্রমী ঘটনা। ভারত বা পাকিস্তানে এমন জনতার শক্তি ও গণঅভ্যুত্থান কখনও দেখা যায়নি। বাংলাদেশ একটি গণঅভ্যুত্থানের দেশ — ১৯৫২, ১৯৬৯, ১৯৯০ সালের ঘটনা তার উদাহরণ। তবে এসব অভ্যুত্থানের মধ্যে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল সবচেয়ে বিস্ফোরক, সবচেয়ে রূপান্তরমূলক।
তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৫২-র ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার স্বীকৃতি এসেছিল, ১৯৬৯-এ আইয়ুব খানের পতন হয়েছিল, ১৯৯০ সালে এরশাদের পতনের মাধ্যমে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিন্তু এসব আন্দোলনে এমন সর্বগ্রাসী ভাঙন, এমন পলায়নপর সরকার বা দল দেখা যায়নি। ২০২৪ সালের অভ্যুত্থানে ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়তে বাধ্য হন। শুধু তিনিই নন, তার মন্ত্রিসভা, দলের কেন্দ্রীয় নেতারা, এমনকি স্থানীয় নেতা-কর্মীরাও অনেকে দেশ ছেড়ে পালান। এই রকম ব্যাপক দলীয় পতন, আতঙ্ক ও আত্মগোপন বাংলাদেশের ইতিহাসে আর কখনও ঘটেনি। জুলাই অভ্যুত্থানের গভীরতা বোঝাতে একটি প্রতীকী চিত্র যথাযথ শেখ হাসিনার পালানোর পরদিন থেকেই সারা দেশে শেখ মুজিবের মূর্তি ও ম্যুরাল সাধারণ মানুষ ভেঙে ফেলে। কেউ কোনও নির্দেশ দেয়নি, তবুও এসব ঘটেছে। এটি এক ধরনের প্রকৃতির প্রতিশোধ, যার বহিঃপ্রকাশ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়ায় হয়েছে। বহু বছর ধরে নির্যাতিত, অবদমিত ও পুঞ্জীভূত জনগণের ক্রোধ এই অভ্যুত্থানে বিস্ফোরিত হয়েছে।
জবানবন্দিতে বদরুদ্দীন উমর আরও বলেন, এই অভ্যুত্থানের ফলে আওয়ামী লীগ শুধু ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হয়নি, তারা জনগণের বিশ্বাসও চিরতরে হারিয়েছে। মুসলিম লীগের পতনের মতোই এবারের গণঅভ্যুত্থান আওয়ামী লীগের জন্য এক চূড়ান্ত রাজনৈতিক পরিণতি তৈরি করেছে। এছাড়াও এই অভ্যুত্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হল ছাত্রদের ভূমিকা। তারাই এই আন্দোলনের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল। ইতিহাসে ছাত্ররা বারবার নেতৃত্ব দিয়েছে, কিন্তু এবারের আন্দোলনে তারা যে সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, সাহস ও আত্মত্যাগের পরিচয় দিয়েছে, তা বিরল।
আওয়ামী লীগের শাসনামল নিয়ে তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তার আমলে বড় বড় সব ধরনের অপরাধ করেছে। হাসিনা দীর্ঘ দেড় দশক ক্ষমতায় ছিল নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করার মাধ্যমে। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতিটি নির্বাচন সে ম্যানিপুলেট করেছে। এগুলো সম্ভব হয়েছে, কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের ওপর, নির্বাচন কমিশন থেকে শুরু করে পুলিশ এবং আমলাতন্ত্র, সব কিছুর ওপর সে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছিল। প্রথম থেকেই হাসিনা ঠিক করেছিলেন, নির্বাচন নিয়ন্ত্রণ করবেন। সেটি করতে গেলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার রাখা সম্ভব নয়। অথচ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে তিনিই আন্দোলন করেছিলেন, সংশোধনী এনেছিলেন। কোনও নীতিবোধ বা নৈতিক লজ্জাবোধ তার ছিল না। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে তিনিই সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল করে দিলেন। কারণ, তিনি বুঝেছিলেন নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে পরের বার তারা আর জিততে পারবে না। সুতরাং নির্বাচনে জিততে হলে তাকে সবকিছু নিজের নিয়ন্ত্রণে আনতেই হবে।
প্রশাসনকে হাসিনা দুইভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে: প্রথমত ঘুষ, টাকা-পয়সা ও সুযোগ-সুবিধা দিয়ে; দ্বিতীয়ত হুমকি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে। ২০০৯ সালের মধ্যেই এই নিয়ন্ত্রণ স্থাপন করেন। এর মাধ্যমেই তিনি ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের নির্বাচনে জিতেছেন। ২০১৪ সালে ভোটকেন্দ্রে কাউকে ঢুকতেই দেয়নি। ২০১৮ সালে রাতের অন্ধকারে ভোট করা হয়েছে, যা সারা বিশ্ব জানে। ২০২৪ সালেও একই ঘটনা। জনসমর্থন না থাকলেও এভাবে প্রহসনের নির্বাচন করে তিনি জয়লাভ করেছেন। এসব নির্বাচনে দেখা গেছে, তার দল ৩০০ সিটের মধ্যে চার-পাঁচটি সিটও পাবে কিনা সন্দেহ। এরপরও তিনি জয়ী হয়েছেন শুধুমাত্র প্রশাসনের ওপর চূড়ান্ত নিয়ন্ত্রণের কারণে। এটা গোপন কিছু না, সবাই জানে।
শুধু নির্বাচনের কারচুপিই নয়, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ওপর নিষ্ঠুর দমন পীড়ন চালিয়েছেন হাসিনা। প্রচুর মানুষকে গ্রেফতার, অপহরণ ও গুম করে বছরের পর বছর আটকে রাখা হয়েছে বিনা অপরাধে। ‘আয়না ঘর’ নামে বহু জায়গায় গোপন টর্চারসেল তৈরি করা হয়েছে, যেটা মুজিবের আমলেও ছিল না। মুজিব বিরোধীদের সরাসরি হত্যা করতেন; শেখ হাসিনা শুধু হত্যা করতেন না, নির্যাতনও করতেন এবং এতে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেতেন। এভাবে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজের করায়ত্ত করেছেন এবং প্রকৃতপক্ষে জনগণের সঙ্গে তার সম্পর্ক একেবারেই ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল।
খুন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড কেবল সেই ব্যক্তিই করতে পারে, যার হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা রয়েছে। যার অধীনে ইন্টেলিজেন্স বিভাগ, ডিজিএফআই-এর মতো সংস্থা থাকে। আয়না ঘরের মতো গোপন নির্যাতন সেল কিংবা গুমের মতো অপরাধ তো ডিজিএফআই-এর মাধ্যমেই করা হয়েছে। সব অপহরণের পেছনে ডিজিএফআই জড়িত রয়েছে। এমনকি তারা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডও সংঘঠিত করেছে। তারা এসব করেছে বিরোধী দলগুলোকে নিকেশ করার লক্ষ্যে। শেষদিকে দেখা গেছে বিরোধীরা কোনও মিটিং-মিছিল করতে গেলেও পুলিশ দিয়ে হামলা চালিয়ে তা ছত্রভঙ্গ করে দেওয়াও হয়েছে। যত বড়ই জনসমাবেশ হোক, পুলিশ দিয়ে তা দমন করা হয়েছে। এইভাবে বিরোধী পক্ষ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে পড়ে, অকার্যকর হয়ে যায়। এভাবেই হাসিনা বিরোধী কণ্ঠস্বরকে থামিয়ে দিয়েছিলেন।
বদরুদ্দীন ওমর তার জবানবন্দিতে আরো বলেন, এভাবেই হীন কৌশলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত হাসিনা শাসন করেছেন। প্রশাসন ও পুলিশ ব্যবস্থার ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ এবং তা নিজের স্বার্থে ব্যবহার করার মাধ্যমে তিনি ক্ষমতায় টিকে থেকেছেন। এতটা বেপরোয়া হয়ে বাংলাদেশে আর কাউকে এভাবে কাজ করতে দেখা যায়নি। হাসিনার বাবা মুজিব বেপরোয়া ছিলেন ঠিকই, কিন্তু তার শাসনশৈলী ও হাসিনার শাসনশৈলীর মধ্যে মৌলিক পার্থক্য আছে। কারণ হাজার হলেও, মুজিব জনগণের মধ্য থেকে উঠে এসেছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে রাজনীতিতে এসেছিলেন। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক পরিপক্বতা তার ছিল। অন্যদিকে, হাসিনা যেন উড়ে এসে জুড়ে বসা। তিনি শুধু শেখ মুজিবের কন্যা হওয়াতেই ক্ষমতায় এসেছেন। তার নিজের কোনও রাজনৈতিক ভিত্তি বা ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ছিল না। তিনি বাপের বেটি হিসেবে গদিতে বসেন, কিন্তু মুজিবের চিন্তা-চেতনার কিছুই তিনি ধারণ করেননি। বরং হাসিনা দেশের রাজনৈতিক মূল্যবোধকে ধ্বংস করেছেন।
শেখ হাসিনার শাসনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটা বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে কর্তৃত্ববাদী শাসন আর লুটপাট। এই যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলা হয়, সেটি নিয়ে আমি নিজেও নিশ্চিত না। এই কথাটি আসলে কী বোঝায়? মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সবাই বলে যাচ্ছে, কিন্তু এই চেতনার প্রকৃত অর্থ কী, তা কখনও স্পষ্ট করা হয়নি। যদি চেতনা বলতে বোঝানো হয়, ১৯৭১ সালে মানুষ কী স্বপ্ন দেখেছিল, কী পেতে চেয়েছিল, তাহলে বলা যায়, সাধারণ মানুষের চেতনা আর আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের চেতনার মধ্যে কোনও মিল ছিল না। মানুষ চেয়েছিল দু’বেলা খেতে, নিরাপদ জীবন, সম্মানজনক কাজ, আর নিরাপত্তা। কিন্তু আওয়ামী লীগের লোকজন ভাবছিল, কীভাবে তারা ক্ষমতার সুযোগ নিয়ে সম্পদের পাহাড় বানাবে, দীর্ঘকাল ক্ষমতা কুক্ষিগত করবে।
৭১ সালে লড়াই করেছিল সাধারণ ছাত্র, কৃষক-শ্রমিকের সন্তান, মধ্যবিত্ত তরুণেরা। আওয়ামী লীগের এমপি-মন্ত্রী বা ছাত্রনেতাদের কারও যুদ্ধক্ষেত্রে কোনও ভূমিকা ছিল না। তাদের মধ্যে অনেকেই তখন পলায়নপর ছিল। তাহলে প্রশ্ন হল, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বলতে কার চেতনার কথা বোঝানো হচ্ছে? হাসিনা যখন এটি উচ্চারণ করেন, তখন তিনি এমনভাবে বলেন, যেন তার চেতনা আর জনগণের চেতনা একই। কিন্তু বাস্তবে তার চেতনা জনগণের আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কোনও সম্পর্কই রাখে না। বরং এটা এক ধরনের দলীয় রেটোরিক, যার মাধ্যমে তিনি জনগণকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে এমনভাবে ব্যবহার করেছেন, যেন সেটি তার পারিবারিক সম্পত্তি। এই চেতনা একসময় কাজ করেছে, মানুষ বিভ্রান্ত হয়েছে, আবেগে ভেসেছে। কিন্তু পরে দেখা গেছে, তার দমননীতি ও নির্যাতনের ফলে এই চেতনার মুখোশ খুলে গেছে। এখন তিনি জনগণ থেকে শতভাগ বিচ্ছিন্ন। যদি সত্যিকারের নিরপেক্ষ নির্বাচন হত, তাহলে আওয়ামী লীগ কটা আসন পেত, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। হাসিনা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা দিয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক জমিদারি কায়েম করেছেন। মুক্তিযুদ্ধকে কংক্রিটাইজ বা বাস্তবায়িত করার কোনও চেষ্টা তিনি করেননি। তার জন্য এটি শুধু একটি রেটোরিকাল অস্ত্র। তিনি এই চেতনায় গণতান্ত্রিক চর্চার কোনও সুযোগ দেননি। হাসিনার মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে মুজিবুর রহমানই মুক্তির একমাত্র পুরুষ, একমাত্র নেতা, এরকম একটা মিথ প্রতিষ্ঠা করেছেন। অথচ বাস্তবতা হল, ২৫ মার্চ ১৯৭১-এ শেখ মুজিব রাজনৈতিকভাবে ব্যর্থ হয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানে বন্দি ছিলেন এবং সেই নয় মাস যুদ্ধ সম্পর্কে প্রায় কিছুই জানতেন না।
এরপর যখন শেখ হাসিনা বলেন, তার পিতা মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছেন, সেটি ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বিকৃতি বলে মনে হয়। কিন্তু তার শাসনামলে এই মিথ্যার বিরুদ্ধে কেউ কথা বলতে পারে না। যেসব তথাকথিত বুদ্ধিজীবী তার শাসনামলে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, তারাই বিকৃত ইতিহাসের বাহক। তাছাড়া হাসিনার নেতৃত্বে এমন একটা ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, যেখানে মুজিবুর রহমানকে পাঠ্যবই থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের থিসিস পর্যন্ত এককভাবে উপস্থাপন করা হয়। স্কুলের পাঠ্যসূচি থেকে শুরু করে সমস্ত শিক্ষা ও গবেষণায় শেখ মুজিবকে এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে, যেন তিনিই বাংলাদেশের একমাত্র ইতিহাস। এই অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে কোনও গণতান্ত্রিক চর্চা — সে ইতিহাস হোক, মতামত হোক, গবেষণা হোক সবই দমন করা হয়েছে। কেউ ভিন্ন কিছু বললে, তার চাকরি যায়, উন্নতি বন্ধ হয়, হয়রানি হয়, কখনও কখনও জীবন পর্যন্ত ঝুঁকির মধ্যে পড়ে।
সব মিলিয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ মুজিবের বর্ণনায় মুক্তিযুদ্ধের চেতনা একটি দলীয় ক্ষমতাকেন্দ্রিক একমুখী বয়ানে পরিণত হয়েছে — যা গণতন্ত্র, সত্য ও ইতিহাসের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে। হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আরেকটি দমনমূলক কৌশল ছিল সাম্প্রদায়িকতাকে ব্যবহার করা। আওয়ামী লীগ সরাসরি ধর্মীয় বৈষম্যের রাজনীতি খুব বেশি করেনি বটে, কিন্তু ১৯৭২ সাল থেকেই হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িঘর, সম্পত্তি লুটপাট শুরু হয়েছে এবং এসব কাজ করেছে মূলত আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরাই। জামায়াতে ইসলামী বা বিএনপি-র লোকজন এভাবে হিন্দুদের সম্পত্তি দখল করেনি, যাকিছু করেছে আওয়ামী লীগের নেতারা। পাকিস্তানি আমলে যে শত্রু সম্পত্তি আইন ছিল, স্বাধীনতার পর সেটি বাতিল করা উচিত ছিল। কিন্তু তা না করে, আওয়ামী লীগ সরকার এটিকে অর্পিত সম্পত্তি আইন নামে রূপান্তর করে বহাল রাখে, যার ফলে হিন্দু সম্প্রদায়ের সম্পত্তি লুটপাট অব্যাহত থাকে। মুখে ধর্মনিরপেক্ষতা দাবি করলেও অর্থনৈতিক স্তরে আওয়ামী লীগ ছিল চরম সাম্প্রদায়িক, হিন্দুদের অর্থ-সম্পদ দখল করাকে তারা একটি কাঠামোগত ও ব্যবস্থাগত প্রক্রিয়া হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।
বদরুদ্দীন ওমর আরও বলেন, রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতাকে মূলত লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছে। প্রভাবশালী এলিট, সিভিল সোসাইটি, আমলাতন্ত্র, বিশ্ববিদ্যালয়, ব্যবসায়ী মহল সবাইকে দমন ও পুরস্কারের নীতিতে নিয়ন্ত্রণ করেছে। সরকারের অনুগতদের দেওয়া হয়েছে দেদার সুযোগ-সুবিধা। আর যারা বিরোধিতা করেছে, তাদের করা হয়েছে বরখাস্ত, বঞ্চিত, এমনকি কারাবন্দী। হাসিনার ১৫ বছরের শাসন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে দুর্নীতি একটি সাংগঠনিক নীতি হয়ে দাঁড়ায়। দলীয় নেতাকর্মী ও পরিবারের সদস্যরা কয়েক হাজার বা লক্ষ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে পাচার করেছে, যা ব্রিটিশ বা পাকিস্তান আমলেও দেখা যায়নি। ফলে প্রশাসন পুরোপুরি ভেঙে পড়েছে, দেশের অর্থনীতি দেউলিয়া হয়ে গিয়েছে। প্রশাসনিক কাঠামো যে ধ্বংস হয়ে গেছে, তার প্রমাণ ২০২৪ সালে স্পষ্ট হয়ে গেছে। এমনকি আগস্টের শুরুতে সামরিক বাহিনী পর্যন্ত হাসিনার নির্দেশে গুলি চালাতে অস্বীকার করে। কারণ, তারা বুঝে গিয়েছিল, এই সরকারের দিন শেষ।
যদিও সামরিক বাহিনী শেখ হাসিনাকে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে সাহায্য করেছে, বিমানের ব্যবস্থা করে, ক্যান্টনমেন্টের নিরাপত্তা দিয়ে হাজার হাজার নেতা-কর্মীকে দেশত্যাগে সহায়তা করেছে। এই সহযোগিতার পেছনে ছিল তাদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট হিসাব-নিকাশ। কিন্তু এখনও প্রশাসন, বিশ্ববিদ্যালয়, মিডিয়া ও বুদ্ধিজীবী মহলে আওয়ামী লীগের অনুগতরা রয়ে গেছে। তারা খোলাখুলি না বললেও নীরবভাবে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছে। তাদের কেউ কেউ কোনও দল নিষিদ্ধ করা উচিত নয় বললেও বাস্তবতা হল, আওয়ামী লীগ এখন আর একটি সাধারণ রাজনৈতিক দল নয়।
মৃত্যুর আগে দেওয়া জবানবন্দিতে বদরুদ্দীন ওমর আরও বলেন, হাসিনা সরকারের শাসন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত দেশবিরোধী ছিল। এই অবস্থায়, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা রাজনৈতিক নীতির প্রশ্ন নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। এই দলটির কার্যক্রম বাংলাদেশের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বার্থের বিরুদ্ধে। এদের জন্য রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ বিপন্ন হয়ে পড়েছে।








