তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনে কোন দল সবথেকে বেশি লাভবান হতে পারে?
মহম্মদ মফিজুল ইসলাম: রাজনীতিতে পরাজয় অনেক সময় একটি দলের শক্তি পরীক্ষা করে। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় দলের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব সাধারণত চাপা থাকে। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই দ্বন্দ্বই প্রকাশ্যে চলে আসে। পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি যেন সেই পুরনো সত্যকেই আবার সামনে নিয়ে এসেছে। দীর্ঘ পনেরো বছর শাসনের অবসানের পর তৃণমূল কংগ্রেস আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে দলটির সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষ নয়; বরং নিজেদের ভেতরের বিভাজন। নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকেই রাজনৈতিক মহলে একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। তৃণমূল কংগ্রেসের এই ভাঙনে শেষ পর্যন্ত লাভবান হবে কোন দল? প্রশ্নটা যত সহজ শোনায়, উত্তরটা ততটা সরল নয়। কারণ, একটি বড় আঞ্চলিক দলের দুর্বলতা কখনও শুধু একটি দলের লাভের কারণ হয় না; তার প্রভাব পড়ে সমগ্র রাজনৈতিক ভারসাম্যের উপর। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে দেখা গেছে, বড় দলগুলির ভাঙন সাধারণত তিন ধরনের ফল বয়ে আনে। প্রথমত: শাসক দল শক্তিশালী হয়। দ্বিতীয়ত: বিরোধী রাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ তৈরি হয়। তৃতীয়ত: ভোটারদের একাংশ রাজনৈতিকভাবে অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়ে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতিতেও এই তিনটি সম্ভাবনাই সমানভাবে বিদ্যমান। তৃণমূল কংগ্রেসের উত্থানের ইতিহাস মূলত একক নেতৃত্ব, সাংগঠনিক দৃঢ়তা এবং জনসংযোগের উপর দাঁড়িয়ে ছিল। দীর্ঘ সময় ধরে দলটি একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক ছাতার ভূমিকা পালন করেছে। বিভিন্ন মত, গোষ্ঠী এবং স্বার্থকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার ক্ষমতা ছিল দলের অন্যতম শক্তি। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর সেই সুতো আলগা হয়ে গেলে বহুদিনের চাপা অসন্তোষ প্রকাশ্যে আসাটাই স্বাভাবিক।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন, নির্বাচনী পরাজয়ের পর যেকোন দলের মধ্যে আত্মসমালোচনা হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু আত্মসমালোচনা যদি নেতৃত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়, তাহলে তা দ্রুত সাংগঠনিক সংকটের রূপ নেয়। তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই লক্ষণই দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলের একাংশ নিজেদেরকে ‘প্রকৃত তৃণমূল’ বলে দাবি করছে এবং বিধানসভায় পৃথক অবস্থান গ্রহণের চেষ্টা করছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে তাৎক্ষণিক সুবিধা পেতে পারে ক্ষমতাসীন বিজেপি। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় একটি শক্তিশালী বিরোধী দলের অস্তিত্ব শাসক দলের উপর স্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করে। কিন্তু বিরোধী শিবির বিভক্ত হয়ে পড়লে সেই চাপ অনেকটাই কমে যায়। শাসক দল তখন প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে তুলনামূলক স্বস্তির অবস্থানে চলে যায়। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে এই বাস্তবতা অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বিজেপিই একমাত্র লাভবান হবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তাড়াহুড়ো হবে। কারণ, বিরোধী রাজনীতির শূন্যস্থান সবসময় কোনও না কোনও শক্তি পূরণ করার চেষ্টা করে। কংগ্রেস, বামপন্থী দল কিংবা নতুন কোনও আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি সেই সুযোগ কাজে লাগাতে পারে। ইতিহাস বলে, যখন কোনও প্রধান বিরোধী দল দুর্বল হয়, তখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির উত্থানের সম্ভাবনাও তৈরি হয়।

এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটব্যাঙ্ক সম্পূর্ণ একরৈখিক নয়। গ্রামীণ ভোটার, সংখ্যালঘু ভোটার, নারী ভোটার, শহুরে মধ্যবিত্ত এবং বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সমন্বয়ে দলটির সমর্থনভিত্তি গড়ে উঠেছিল। দলীয় ভাঙন যদি দীর্ঘস্থায়ী হয়, তাহলে এই ভোটগুলির একটি অংশ বিভিন্ন দিকে সরে যেতে পারে। ফলে রাজনৈতিক সমীকরণ আরও জটিল হয়ে উঠবে। অনেকেই মনে করছেন, এই সংকট কেবল সাংগঠনিক নয়; এটি নেতৃত্বের সংকটও। দীর্ঘদিন একজন ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বের উপর নির্ভরশীল দলগুলিতে প্রজন্মান্তরের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। নতুন নেতৃত্বের গ্রহণযোগ্যতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি এবং দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন উঠলে অসন্তোষ বাড়তে থাকে। পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান পরিস্থিতি সেই বৃহত্তর বাস্তবতারই অংশ। তবে রাজনৈতিক দলগুলির ইতিহাসে ভাঙন সব সময় মৃত্যুঘণ্টা নয়। অনেক দল ভাঙনের পর আরও শক্তিশালী হয়ে ফিরে এসেছে। আবার অনেক দল ইতিহাসের পাতায় হারিয়েও গেছে। কোন পথটি তৃণমূল কংগ্রেসের জন্য অপেক্ষা করছে, তা নির্ভর করবে আগামী কয়েক মাসের রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের উপর। এখানে ভোটারদের মনস্তত্ত্বও গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ প্রায়শই রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পছন্দ করেন। তারা দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব ও অনিশ্চয়তা দেখতে চান না। যদি কোনও দল নিজেদের অভ্যন্তরীণ সমস্যা সমাধানে ব্যর্থ হয়, তাহলে ভোটারদের আস্থা দ্রুত ক্ষয় হতে পারে। বিপরীতে, যদি দলটি আত্মসমালোচনার মাধ্যমে নতুন করে সংগঠন গড়ে তুলতে পারে, তাহলে পুনরুজ্জীবনের সম্ভাবনাও থেকে যায়।

সবশেষে বলা যায়, তৃণমূল কংগ্রেসের ভাঙনে তাৎক্ষণিকভাবে সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেতে পারে শাসক দল বিজেপি। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে লাভ-ক্ষতির হিসাব এত সরল নয়। বিরোধী রাজনীতির পুনর্গঠন, ভোটব্যাঙ্কের পুনর্বিন্যাস, নতুন নেতৃত্বের উত্থান এবং জনমতের পরিবর্তন — সবকিছু মিলিয়েই ভবিষ্যতের রাজনৈতিক চিত্র নির্ধারিত হবে। আজ যে দল লাভবান বলে মনে হচ্ছে, কাল সেই সমীকরণ বদলেও যেতে পারে। গণতন্ত্রে কোনও রাজনৈতিক শূন্যস্থান দীর্ঘদিন থাকে না। ইতিহাসের শিক্ষা তাই বলে। পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি আজ এক নতুন অধ্যায়ের সূচনালগ্নে দাঁড়িয়ে। এই অধ্যায়ের শেষ পৃষ্ঠা এখনও লেখা হয়নি। কিন্তু একটি বিষয় নিশ্চিত — তৃণমূল কংগ্রেসের বর্তমান সংকট শুধু একটি দলের সংকট নয়; এটি পশ্চিমবঙ্গের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক মানচিত্র পুনর্গঠনেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।








