প্রসঙ্গ: বাংলা ভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ দিবস
মজিবুর রহমান: সাংবিধানিকভাবে ভারতবর্ষ হল একটি ‘রাজ্যসমূহের সংঘ’ বা ‘ইউনিয়ন অফ স্টেটস’। এই মুহূর্তে ভারতে রাজ্য (স্টেট) ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের (ইউনিয়ন টেরিটোরি) সংখ্যা যথাক্রমে ২৮ এবং ৮। ভারতের সর্বত্র যথোচিত মর্যাদায় ১৫ আগস্ট (১৯৪৭) স্বাধীনতা দিবস, ২৬ নভেম্বর (১৯৪৯) সংবিধান দিবস ও ২৬ জানুয়ারি (১৯৫০) সাধারণতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করা হয়। কিন্তু রাজ্য ভিত্তিক প্রতিষ্ঠা দিবস অথবা ভারতে অন্তর্ভুক্তি দিবস উদযাপনের বিশেষ রেওয়াজ নেই। হঠাৎ করেই ২০২৩ সালে ২০ জুন রাজ্যপাল সি.ভি আনন্দ বোস রাজভবনে ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ উদযাপনের আয়োজন করেন। মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী রাজ্যপালের এই পদক্ষেপের বিরোধিতা করেন এবং ওই বছরই ২৩ আগস্ট বিধানসভায় পয়লা বৈশাখ ‘বাংলা দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব পাস করা হয়। সেই মতো ২০২৪ ও ‘২৫ সালে সীমিত পরিসরে ‘বাংলা দিবস’ পালন করা হয়। ২০২৬-এ শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে নবগঠিত রাজ্য সরকার বৃহৎ আকারে ২০ জুন ‘পশ্চিমবঙ্গ দিবস’ পালন করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেছে। এই আবহে বাংলা ভাগ ও পশ্চিমবঙ্গ সৃষ্টির ঐতিহাসিক ঘটনাক্রম ফিরে দেখা প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে।
ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট রিচার্ড অ্যাটলি ১৯৪৬ সালের ১৫ই মার্চ হাউস অব কমন্সে ভারতের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে এক বিবৃতি দেন। ওই মাসেই তিনজন ব্রিটিশ মন্ত্রীকে নিয়ে গঠিত ‘ক্যাবিনেট মিশন’ দিল্লি আসে। স্বাধীন ভারতের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে একাধিক প্রস্তাব উত্থাপিত হয়। একটি প্রস্তাবে ভারতকে অবিভক্ত রেখে একটি যুক্তরাষ্ট্র বা ফেডারেশন গঠনের কথা বলা হয়। কেন্দ্রের হাতে কেবল প্রতিরক্ষা, বিদেশ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়। প্রদেশগুলোকে তিনটি ভাগে ভাগ করা হয়। হিন্দু-প্রধান প্রদেশগুলো নিয়ে ‘ক’ ব্লক; মুসলিম অধ্যুষিত পাঞ্জাব, সিন্ধু, বেলুচিস্তান, উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ নিয়ে ‘খ’ ব্লক এবং বাংলা ও আসামকে নিয়ে ‘গ’ ব্লক গঠন করা হয়। জুন মাসে গৃহীত এই প্রস্তাবে প্রাথমিকভাবে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ-সহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষই সহমত হয়। কিন্তু জুলাই মাসে মুসলিম লীগ প্রস্তাবটি সমর্থনের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করে। ১৬ আগস্ট তারা ‘প্রত্যক্ষ সংগ্ৰাম দিবস’ কর্মসূচি পালন করে। একাধিক জায়গায় হিন্দু-মুসলমান দাঙ্গা লাগে। সংঘটিত হয় ‘গ্ৰেট ক্যালকাটা কিলিং’। মুসলিম লীগ সেপ্টেম্বরে গঠিত জওহরলাল নেহরুর নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারে যোগদান করতে অসম্মত হয় (পরে অক্টোবরে যোগ দেয়)। মুসলিম লীগের সদস্যরা সংবিধান রচনার উদ্দেশ্যে গঠিত গণপরিষদের অধিবেশনেও অংশগ্রহণ করেননি। আসলে তখন তাদের ভাবনায় ১৯৪০ সালে লাহোরে গৃহীত ‘পাকিস্তান প্রস্তাব’ পুনরায় সক্রিয় হয়ে ওঠে। এসবের জন্য মুসলিম লীগের সঙ্গে জাতীয় কংগ্রেসের সম্পর্ক ক্রমশ খারাপ হতে থাকে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ অনেকটাই নিশ্চিত হয়ে যায়। ১৯৪৭ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি অ্যাটলি সাহেব দায়িত্বশীল ভারতবাসীর হাতে ১৯৪৮ সালের জুন মাসের মধ্যেই ক্ষমতা অর্পণ করার কথা ঘোষণা করেন।

১৯৪৭ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সভাপতি শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি বাংলার গভর্নর স্যার ফ্রেডরিক জন ব্যারোজের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে বাংলার হিন্দু-প্রধান অঞ্চল নিয়ে একটি পৃথক প্রদেশ গঠন করে তাকে ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানান। ১৯ মার্চ এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, ”ভারত যদি অবিভক্তও থাকে তাহলে সেই অবস্থাতেও বাংলাকে ভাগ করতে হবে।” ৫–৬ এপ্রিল তারকেশ্বরে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় প্রাদেশিক হিন্দু মহাসভার সম্মেলনে বঙ্গদেশে হিন্দুদের জন্য একটি পৃথক প্রদেশ গঠনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কর্মপন্থা ও পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির উপর দায়িত্ব অর্পণ করা হয়। ১৩ মে তিনি সোদপুর আশ্রমে গান্ধীজির সঙ্গে দেখা করে সার্বভৌম বাংলা গঠনের ব্যাপারে তাঁর তীব্র আপত্তির কথা জানিয়ে আসেন। পরিস্থিতি বিচার করে কংগ্রেসের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব বাংলা ভাগ করে হিন্দু-প্রধান অঞ্চলসমূহ ভারতে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। মুসলিম লীগের সর্বোচ্চ নেতৃত্ব অবশ্য অবিভক্ত বাংলাকে পাকিস্তানে পেতে আগ্ৰহী ছিল। তবে শরৎচন্দ্র বসু ও কিরণ শঙ্কর রায়ের নেতৃত্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেসের একটি ক্ষুদ্র অংশ এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ও আবুল হাশিমের নেতৃত্বে বঙ্গীয় প্রাদেশিক মুসলিম লীগের একটি বৃহৎ অংশ অবিভক্ত স্বাধীন বঙ্গদেশ গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যান। মর্নিং নিউজ, দৈনিক আজাদ, আনন্দবাজার পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা প্রভৃতি সংবাদপত্র বাংলা ভাগের পক্ষে অবস্থান গ্ৰহণ করে।
১৯৪৭ সালের ২ জুন ভাইসরয় লর্ড মাউন্টব্যাটেনের সঙ্গে কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের শীর্ষ নেতৃত্বের আলোচনায় অখণ্ড সার্বভৌম বাংলার পরিকল্পনা বাতিল হয়ে যায়। ৩ জুন ব্রিটিশ সরকার ভারত এবং সেই সঙ্গে বাংলা ও পাঞ্জাব ভাগের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। ৪ জুন ঘোষণা করা হয়, ১৯৪৭ সালের ১৪-১৫ আগস্ট ক্ষমতা হস্তান্তর করা হবে। পুরো পরিকল্পনাটি ‘মাউন্টব্যাটেন রোয়েদাদ’ নামে পরিচিত হয়। তবে এই পরিকল্পনায় বাংলাকে একটি স্বাধীন দেশ হিসেবে না হলেও অবিভক্ত প্রদেশ হিসেবে থেকে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলার প্রাদেশিক আইনসভার সদস্যরা হিন্দু ও মুসলিম অধ্যুষিত এলাকার ভিত্তিতে দুই ভাগে বিভক্ত হবেন। প্রথমে অবিভক্ত বিধানসভার অধিবেশন বসে বাংলা অখণ্ড থাকবে কিনা এবং অখণ্ড থাকলে ভারতে, নাকি পাকিস্তানে যোগদান করবে, তা স্থির করতে বলা হয়। পরে বিভাজিত এলাকার সদস্যরা পৃথকভাবে বসে ঠিক করবেন, তাঁরা বাংলা ভাগকে সমর্থন করছেন কিনা এবং করলে কোন্ দেশের অংশ হবেন। কোনো একটি অংশ ভাগের অনুকূলে মত প্রকাশ করলে বাংলাকে ইতিমধ্যেই চিহ্নিত দু-ভাগে ভাগ করা হবে।

১৯৪৭ সালের ২০ জুন বাংলার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার জন্য বঙ্গীয় প্রাদেশিক আইনসভার বিশেষ অধিবেশন বসে। প্রথমে যৌথ অধিবেশনে বাংলাকে অবিভক্ত রাখার এবং অবিভক্ত বাংলার পাকিস্তানে যোগদানের পক্ষে ১২৬–৯০ ভোটে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকা তথা পশ্চিমবঙ্গের প্রতিনিধিরা স্বতন্ত্র অধিবেশনে মিলিত হয়ে ৫৮–২১ ভোটে বাংলা ভাগের এবং ভারতে যোগদানের সিদ্ধান্ত নেন। মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চল অর্থাৎ পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধিরা আরেকটি স্বতন্ত্র অধিবেশনে মিলিত হয়ে ১০৬–৩৫ ভোটে বাংলা ভাগের বিপক্ষে রায় দেন এবং বাংলা ভাগ অনিবার্য হলে পাকিস্তানে যোগদানের সিদ্ধান্ত গ্ৰহণ করেন। বাংলা ভাগের বিপক্ষে দু-বার বেশি ভোট পড়লেও পূর্বোক্ত রোয়েদাদের শর্তানুযায়ী বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব জয়যুক্ত হয়। পূর্ববঙ্গ যায় পাকিস্তানে, আর পশ্চিমবঙ্গ থাকে ভারতে। আয়তনে ও লোকসংখ্যায় পূর্ববঙ্গ বড় ছিল। প্রাদেশিক আইনসভায় পূর্ববঙ্গের প্রতিনিধির সংখ্যাও বেশি ছিল। অবিভক্ত বাংলার আইনসভার মোট সদস্য সংখ্যা ছিল ২৫০। কয়েকটি প্রধান দলের সদস্য সংখ্যা ছিল এরূপ: মুসলিম লীগ ১১৪, কংগ্রেস ৮৬, কমিউনিস্ট পার্টি ৩, কৃষক প্রজা পার্টি ৩, হিন্দু মহাসভা ১ (শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জি)। বলাবাহুল্য, কংগ্রেস ও মুসলিম লীগের সদস্যরা বাংলা ভাগের যথাক্রমে পক্ষে ও বিপক্ষে ভোট দেন। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যরা বঙ্গভঙ্গের পক্ষে ভোট দেন। দ্বিখণ্ডিত বাংলায় পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার সদস্য সংখ্যা হয় ৯০। প্রফুল্লচন্দ্র ঘোষের নেতৃত্বে ৩ জুলাই পশ্চিমবঙ্গে ১১ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়।
রেডক্লিফ কমিশন ভারত-পাকিস্তানের যে সীমানা নির্ধারণ করে তাতে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ জেলা হিসেবে নদীয়া, মুর্শিদাবাদ, মালদা ও দিনাজপুর ১৪-১৫ আগস্ট, ১৯৪৭ স্বাধীনতার দিন পূর্ববঙ্গ তথা পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত হয়। এর ফলে পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ প্রান্ত উত্তর প্রান্ত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। জল-সংকটে কলকাতা বন্দর বিপন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দেয়। এই গুরুতর সমস্যা সমাধানের জন্য তৎপরতা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা বাদ দিয়ে অবশিষ্ট নদীয়া, হিন্দু প্রধান খুলনার বিনিময়ে মুর্শিদাবাদ, মালদার ১৫টি থানার মধ্যে ১০টি থানা এবং অবিভক্ত দিনাজপুরের বালুরঘাট, হিলি, গঙ্গারামপুর ও রায়গঞ্জ পশ্চিমবঙ্গ তথা ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯ আগস্ট এই অন্তর্ভুক্তি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়।
যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে মুসলিম লীগ ভারত ভাগের দাবি তুলেছিল, সেই দৃষ্টিকোণ থেকেই কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা বাংলা ভাগ চেয়েছিল। ১৯০৫ সালে যে বঙ্গভঙ্গ হয়, তা রদ করার জন্য বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস ও হিন্দু সমাজ সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। কিন্তু মুসলিম লীগ ও মুসলিম সমাজ বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করে। ১৯৪৭ সালের বাংলা ভাগ আটকাতে বঙ্গীয় মুসলিম লীগ ও মুসলিম সমাজের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা লক্ষ্য করা যায়। কিন্তু বঙ্গীয় প্রাদেশিক কংগ্রেস ও হিন্দু সমাজ বাংলা ভাগের পক্ষে প্রাণপণ চেষ্টা চালায়। সাম্প্রদায়িক বিভেদের কারণেই এসব হয়েছে। অবিভক্ত বাংলার জনসংখ্যার ৫৫ শতাংশ ছিল মুসলমান। তারাই বঙ্গ রাজনীতিতে শাসকের ভূমিকায় ছিল। তারা সেই ধারা অব্যাহত রাখতে চেয়েছিল। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা চেয়েছিল, বাংলার একটা অংশে যাতে হিন্দুরা শাসকের ভূমিকায় থাকতে পারে, তা সুনিশ্চিত করতে। এছাড়াও তাদের আশঙ্কা ছিল, বাংলা স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি পেলে পরে পাকিস্তানের সঙ্গে মিশে যাবে।
১৫ আগস্ট স্বাধীনতা দিবস উদযাপনের সময় স্মরণ করা হয় ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীর লড়াই ও আত্মত্যাগের ইতিহাসকে। ভারত ভাগের জন্য যে লক্ষ লক্ষ মানুষকে চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছিল, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ করা হয়। এর সঙ্গে মিশে থাকে বৈদেশিক শাসন থেকে স্বদেশী শাসনে ভারতের ফিরে আসার আনন্দ ও গৌরব। জাত-ধর্ম-বর্ণ-সম্প্রদায় নির্বিশেষে সকল ভারতবাসীকে আহ্বান জানান হয়, ভারতের সমস্ত ভাল-মন্দের শরিক হতে। পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে ২০ জুনকে ওই আলোকেই দেখতে হবে।








